প্রসেনজিৎ চক্রবর্তী

‘নিউটন’ এ বারের অস্কারে বিদেশি ছবির প্রতিযোগিতায় ভারতের প্রতিনিধিত্ব করবে জানার পর পরিচালক অমিত মাসুরকর বলেছেন, “বলিউডে যে গল্পগুলো বলা হয়, সেগুলো লোকে কমবেশি জানে। তেমন ভাবে বলা হয় না, এমন একটা গল্পই বলা হয়েছে ‘নিউটন’ ছবিতে”’। এ তো গেল সিনেমার গল্পের কথা। আর সিনেমা দেখার গল্প? তৃতীয়ার দুপুরে দক্ষিণ কলকাতার মাল্টিপ্লেক্সে জাতীয় সঙ্গীত থামার পর কে যেন বলে উঠলেন, ‘ভারত মাতা কি’, কিন্তু কেউ ‘জয়’ বললেন না। যদিও হলটি প্রায় হাউসফুল ছিল। প্রশ্ন জাগল, বিজেপি কি সব হলে, সব শোয়েই লোক পাঠাচ্ছে, নাকি ‘নিউটন’-এর মতো ততটা না বলা গল্পে?

‘নিউটন’ ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্র নূতন কুমার ওরফে নিউটন অত কিছু ভাবতে চান না। তিনি সৎ এবং দায়িত্ববান সরকারি কর্মচারী। নিয়ম মেনে কাজ করেন। দেশের আইনের বিরুদ্ধে কিছু করার কথা ভাবতেও পারেন না। নিজে পদার্থবিদ্যায় এমএসসি, সেই জন্যই হয়তো গ্র্যাজুয়েটের কম কোনো মেয়েকে বিয়ে করতে রাজি নন।

তো এ হেন নিউটন লোকসভা ভোটের ডিউটি করতে যান মাওবাদী অধ্যুষিত দণ্ডকারণ্যে। সেই ঘটনা নিয়েই গোটা সিনেমাটি তৈরি। মূলত মাওবাদী বিষয়ক এই ছবিতে শুরুর একটি ছোট্টো অংশ বাদে একজন মাওবাদীকেও দেখানো হয়নি। তা-ও সেটা প্লটকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য। এবং ওই অংশটি বাদ দিয়ে একটি তথাকথিত হিংসাত্মক ঘটনাও দেখানো হয়নি। জোর করে ভোট দিতে নিয়ে আসার জন্য আদিবাসীদের যদি আধাসেনারা দু-চারটে চড়-থাপ্পড় মারে, তাকে কি আর ভায়োলেন্স বলা চলে! এই ব্ল্যাক কমেডিতে এক ঢিলে অনেক পাখিই মারতে সক্ষম হয়েছেন পরিচালক।

পাঠক নিশ্চয় ছবির কাহিনির আঁচ পেয়ে গিয়েছেন। ছবিটি দেশের মধ্যে গড়ে ওঠা ‘পাকিস্তান’-এ বৃহত্তম গণতন্ত্রের রূপ নিয়ে তৈরি। যেখানে বই পড়া বিদ্যায় পারদর্শী সরকারি কর্মচারী দণ্ডকারণ্যে ভোটের ডিউটি দেওয়ার নাম শুনেই মেডিক্যাল সার্টিফিকেট দিয়ে পালিয়ে যায়। যেখানে স্রেফ ঠিক সময়ে অফিসে আসার জন্যই সরকার বাহাদুর তাঁর কর্মচারীকে পুরস্কার দেয়। এবং আদিবাসী শিশুদের পড়ানোর চাকরি পাওয়া আদিবাসী শিক্ষিকা জানায়, মুখে মুখেই যেটুকু পারেন শেখান তিনি। কারণ বইগুলো সব হিন্দিতে লেখা। আদিবাসীরা তা বোঝে না, তাঁদের ভাষা গোন্দ, তাতে কোনো লেখার হরফ এখনও তৈরি হয়নি। মালকো নামে আদিবাসী শিক্ষিকার ভূমিকায় চমৎকার অভিনয় করেছেন অঞ্জলি পাতিল। তিনি নিরাশাবাদী কি না, এই প্রশ্নের উত্তরে প্রিসাইডিং অফিসারকে এক কথায় উত্তর দিয়েছেন, তিনি ‘আদিবাসী’।

আধা সেনাদের সমস্যা, তাঁদের মধ্যবিত্ত চাকরিজীবী চরিত্রকেও যত্ন করে ফুটিয়েছেন পরিচালক। বড়ো পুলিশ অফিসারের এলিটিজমও তাঁর নজর এড়ায়নি। আর বিদেশি মিডিয়ার সামনে ভোটের নাটককে তুলে ধরে হয়তো সমকালীন বলিউডকেই মহিমান্বিত করলেন পরিচালক অমিত মাসুরকর। আর্ট ফিল্ম আর কমার্শিয়াল ফিল্মের পৃথক ঘরানা বলিউড ‘তুলে দেওয়ার’ পর আমরা কত না নতুন স্রোতের ছবি নিয়ে মাতামাতি করেছি। রাজকুমার রাওয়ের পিটপিট করতে থাকা অনবদ্য চোখের তারায় (অসাধারণ অভিনয় করেছেন তিনি)) ভারতীয় গণতন্ত্রকে দেখার পর পিছু ফিরে লজ্জায় অধোবদন হতেই মন চায়। তবু আমাদের নাগরিক শিল্পবোধ এবং বাগাড়ম্বর এত সহজে কি আর হার মানবে। সত্য দর্শনের জন্য আরও কিছু আঘাত হয়তো প্রয়োজন। সেগুলোর জন্য বলিউডের দিকে তাকিয়ে থাকাই কি ভারতীয় ফিল্ম দর্শকদের নিয়তি হিসেবে ঠিক হয়ে গেল?

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here