প্রসেনজিৎ চক্রবর্তী

প্রথম থেকেই কেন যেন মনে হচ্ছিল পদ্মাবত ছবিটা নিয়ে কর্নি সেনার নিত্যনতুন নাটক আসলে ছবিটার বিপণন কৌশল। দেখার পর সব রহস্যের সমাধান হয়ে গেল। গোটা সিনেমাটাই সঞ্জয় লীলা বনসলি বানিয়েছেন ‘হিন্দু’ রাজপুত রাজত্বের রক্ষণশীল ও পশ্চাদপদ পিতৃতান্ত্রিক মূল্যবোধের উদ্‌যাপন করতে এবং ‘মুসলমান’ আলাউদ্দিন খলজিকে যতদূর সম্ভব অন্ধকার রঙে রাঙাতে।

পদ্মাবত ছবিটির সবচেয়ে বড়ো দুর্বলতা হল, চিত্রনাট্যে বিন্দুমাত্র নাটকীয়তা নেই। অন্তত প্রথমার্ধে দর্শকের মনে খলজির খোজা সঙ্গী মালিক কাফুর ও সাম্রাজ্যলোভী ভাইপো নিয়ে দর্শকদের মনে কিছু আশা ছিল। মনে হয়েছিল, এরা হয়তো পরবর্তীতে কাহিনিতে কোনো মাত্রা যোগ করবেন। তা তো হয়ইনি, বরং দু’জনকেই ব্যবহার করা হয়েছে খলজিকে আরও নেতিবাচক ভাবে দেখাতে এবং গল্পকে বনসলির উদ্দেশ্যমতো পরিণতির দিকে নিয়ে যেতে। রানা রতন সিং-এর প্রথম রানিকেও ছোটো গণ্ডির মধ্যে বেঁধে রাখা হয়েছে। প্রচুর জাঁকজমক করে, ‘পদ্মাবত’ কাব্য অনুসারে যা হওয়ার ছিল, সে দিকেই ধীরে ধীরে এগিয়েছে ছবিটি। কাহিনিতে কোনো মোড় আনার এজেন্ডা পরিচালকের ছিলই না।

ভয়ঙ্কর দস্যু চরিত্রের মোঙ্গলদের আক্রমণ থেকে তৎকালীন ভারতকে রক্ষা করেছিলেন আলাউদ্দিন খলজি। নিজের সাম্রাজ্য বিস্তারের জন্য করলেও এ থেকে খলজিদের বীরত্ব এবং যুদ্ধ পারদর্শিতা বোঝা যায়। সঙ্গে তাদের ছিল সে সময়ের প্রেক্ষিতে আধুনিক গোলন্দাজ বাহিনীও। সেখানে মেওয়ারের মহারানা রতন সিং-এর হাতে ছিল পেন্সিলের মতোই কেবল বীরত্ব ও নীতিপরায়ণতার তলোয়ার এবং বর্শা। নিজেদের ছোটো রাজ্যে খুশিতে দিনযাপনের জন্য প্রতিবেশী রাজ্যগুলির সঙ্গেও সম্পর্ক ভালো রাখতে পারেননি তাঁরা। ফলে খলজির দ্বারা আক্রান্ত হয়ে যখন জোট গঠনের উদ্যোগ নিলেন শাহিদ কাপুর(মহারানা রতন সিং) তখন তাতে কেউ সাড়া দিলেন না। হিন্দুদের জোটবদ্ধ হওয়ার গুরুত্ব বোঝাতে এই সবই দেখিয়েছেন বনসলি। পাশাপাশি জানিয়েছেন ক্ষিপ্রবুদ্ধি, গুণী ও মেধাবী ব্রাহ্মণদের ওপর বেশি ভরসা রেখে চলাটা ঠিক নয়। তাঁরা নানা স্বার্থদ্বারা চালিত হয়ে শত্রু শিবিরে নাম লেখাতেই পারেন। সব মিলিয়ে ব্যক্তি ব্রাহ্মণকে গুরুত্ব দেওয়ার বদলে ব্রাহ্মণ্যবাদী সোশাল ইঞ্জিনিয়ারিং-কে(আরএসএস-এর লাইন যেমন) চ্যাম্পিয়ন করতে চেষ্টার কসুর করেননি বনসলি। আরএসএস-ও তাঁর প্রাপ্য মিটিয়েছে কর্নি সেনাকে লেলিয়ে দিয়ে।

সঞ্জয় লীলা বনসলির তাঁর নারীবাদী দৃষ্টিকোণের জন্য সুপ্রসিদ্ধ। নিজের নামের সঙ্গে নিজের মায়ের নাম, ‘লীলা’ যোগ করে তিনি প্রথম থেকেই প্রচার কেড়েছিলেন। তো, পদ্মাবতে সেই নারীবাদের পরিচয় রাখতে গিয়ে তিনি জহর ব্রতের মতো রক্ষণশীল-পিতৃতান্ত্রিক প্রথাকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরেছেন। তাও আবার, সেই প্রথা পালন করার জন্য দীপিকা পাডুকোন(রানি পদ্মাবতী), শাহিদের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে রাখেন।

রাজপুত রমণীদের যুদ্ধ কৌশলের শুণগান করতে কেতন মেহতার বিখ্যাত মির্চ মশালা ছবির অনুকরণে একটি দৃশ্য রচনা করেছেন বনসলি। এক্ষেত্রে অবশ্য লঙ্কাগুঁড়োর বদলে কাঠকয়লা ছোঁড়া হল। সেটাও আবার খিলজদির সেনাদের মারতে নয়, তাঁদের আটকে রাখতে। যাতে রাজপুত রমণীরা বিনা বাধায় আগুনে ঝাঁপ দিয়ে মরতে পারেন।

নির্মম, নিষ্ঠুর, নীতিহীন, ব্যাভিচারী, উভকামী- যত রকম ভাবে সম্ভব আলাউদ্দিনকে নেতিবাচক ভাবে দেখিয়েছেন বনসলি। ভিন্ন যৌন পছন্দের মানুষদের প্রতি সহমর্মী বার্তা দেওয়ার সুযোগ তৈরি করেও তা স্বেচ্ছায় নষ্ট করেছেন। বরং জিম সর্ভের(মালিক কাফুর)আলাউদ্দিনের প্রতি প্রেমকে ব্যবহার করে ওই তৃতীয় লিঙ্গের চরিত্রটিকে দিয়ে নীতিহীন কাজ করিয়েছেন। নিজের সৌভাগ্যের জন্য রানি পদ্মাবতীকে জয় করে আনার লক্ষ্য থেকে সরে গিয়ে কী ভাবে এই লড়াই আলাউদ্দিনের ইগোর ইস্যুতে পরিণত হল, সেটাও চিত্রনাট্যে স্পষ্ট করা হয়নি। ফলে চরিত্রটি আরও একপেশে হয়ে গেছে।

শোনা যায়, রতন সিং-এর চরিত্রটি বলিউডের কোনো নায়ক করতে রাজি হননি। চিত্রনাট্যে নানা পরিবর্তন করে এবং প্রচুর টাকা দিয়ে শাহিদ কাপুরকে চরিত্রটিতে অভিনয় করতে রাজি করানো হয়। কিন্তু যা হওয়ার তাই হয়েছে। শাহিদকে মোটেই মানায়নি। চেহারাটাই খাপ খায়নি। দীপিকা সাধ্যমতো করেছেন এবং ফাটিয়ে অভিনয় করেছেন রণবীর সিং। এত শক্তিশালী অভিনেতাকে বলিউড আগামী দিনে আরও ভালো ভাবে ব্যবহার করবে এই আশা রইল। যদিও একার দায়িত্বে ছবিকে টেনে নেওয়ার মতো ব্যক্তিত্ব তাঁর এখনও তৈরি হয়নি।

জিম সর্ভ এবং অদিতি রাও হায়দারি বেশ ভালো।

ছবির গানে সুর দিয়েছেন বনসলি নিজেই। তবে তাঁর আগের ছবিগুলোর মতো এই ছবিতে সঙ্গীত দাগ কাটতে পারেনি।

খবরে প্রকাশ, পদ্মাবত বলিউডের প্রথম ছবি, যা বানাতে ২০০ কোটির বেশি টাকা খরচ হয়েছে। তা, সেটা ছবি দেখলে প্রতিটি দৃশ্যেই মালুম হয়। সেট, শিল্প নির্দেশনা, যুদ্ধের দৃশ্য- সব দিক থেকেই হলিউডের যে কোনো পিরিয়ড ড্রামার সঙ্গে পাল্লা দিয়েছে পদ্মাবত।

কিন্তু ওটুকুই। একবিংশ শতকের ভারতে সাত মণ তেল পুড়িয়ে রাধাকে নাচানোর যে ন্যক্করজনক প্রয়াস বনসলি করলেন, তা তাঁর যাবতীয় অতীত গৌরবকে ধূলিসাৎ করতে যথেষ্ট।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here