প্রসেনজিৎ চক্রবর্তী

হিট, সুপারহিট না মেগাহিট? শিবপ্রসাদ-নন্দিতার ফিল্ম রিলিজ করার আগে কিংবা রিলিজের দিন কতক পর, আলোচনা মূলত এই তিনটি প্রশ্ন ঘিরেই আবর্তিত হয়। এ বারও তা-ই হবে। কাজের দিনের ভরদুপুরে দক্ষিণ কলকাতার প্রায় হাউজফুল সিঙ্গল স্ক্রিন থেকে বেরোনোর সময় শুনলাম এক তরুণী বলছেন, “কাঁদতে কাঁদতে মাথা ধরে গেছে”। অতএব পাঠক, নিশ্চয় বুঝতে পারছেন, কতটা আবেগ থরথর ছবি এই ‘পোস্ত’।

তা, সেটা তো কোনো খারাপ কথা নয়। সিনেমা-সিরিয়ালে যদি আবেগ ইত্যাদি না থাকে, তবে কি বাজারওলির সঙ্গে বেগুনের দর কষাকষিতে থাকবে‍! আর এ সব ব্যাপারে শিবু-নন্দিতা জুটি টালিগঞ্জের….না, ফার্স্ট বয় বা তেমন কিছু তো বলা যাবে না, সে তকমা অন্য এক জন নিজেই নিজেকে দিয়ে আপাতত মুম্বই কেটে পড়েছেন। যাক গে, কাজের কথায় আসি। গোটা বাংলা সিরিয়ালের দর্শককুলকে হলে টেনে আনার ঐতিহ্যময় লক্ষ্য নিয়েই ছবিটা বানানো। এমনকি ছবির মধ্যে একটি সিরিয়ালের নাম করে রেফারেন্সও আছে।

দুই প্রজন্মের মূল্যবোধের বিরোধ, আজকের প্রজন্মের কঠোর বাস্তবের পুরোনো মদকে কোর্টরুম ড্রামার ব্র্যান্ড নিউ বোতলে ঢেলে সেজেছেন পরিচালকদ্বয়। একটা সত্যিকারের জরুরি ইস্যুকে বাণিজ্যিক মোড়কে প্রকাশ করতে গিয়ে গল্পের গরুকে এমনই গাছে তুলেছেন, আর গাছে তুলতে গিয়ে এমনই চোখা সংলাপের ধারাপাত বানিয়েছেন যে শেষে গরুকে নামাতে ক্রেন অবধি ডাকতে হয়েছে। একটা সময় আবেগে এতটাই ডুবে গেছিলাম, যে ছবিটা যে কিছুতেই শেষ হচ্ছে না, তা ভুলতে বসেছিলাম।

এই দেখুন, ফিল্ম রিভিউতে গরুর নাম নিয়ে ফেললাম। এমনই হরেক পলিটিক্যালি ইনকারেক্ট কাণ্ড ‘পোস্ত’য় ঘটিয়ে ফেলেছেন দুই পরিচালক। কে না জানে, আমাদের প্রধানমন্ত্রী ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’-র আহ্বান রাখতে রাখতে গলায় রক্ত তুলে ফেলছেন আর মুখ্যমন্ত্রী সেই কবেই কলকাতাকে লন্ডন বানানোর সদিচ্ছা ব্যক্ত করেছেন। ও দিকে সিনেমায় শিবপ্রসাদ-নন্দিতা রীতিমতো বিজেপি সাংসদকে (বাবুল সুপ্রিয়) হ্যামলিনের বাঁশিওয়ালা বানিয়ে নায়ক যিশু সেনগুপ্তকে লন্ডনে রেস্তোরাঁর ব্যবসা করতে টেনে নিয়ে গেলেন। এ দিকে বাবুলকে দিয়ে উদাহরণ হিসেবে যে সফল বাঙালি উদ্যোগের নাম করালেন, সেটি আবার কলকাতা থেকে ভারত-জয়ে বেরিয়েছে। তার আগে আবার শিল্পী-স্বভাব যিশুকে দিয়ে বার ছয়েক চাকরি ছাড়িয়েছেন, অবাঙালি ব্যবসায়ীর রক্তচোষা চরিত্রকে তেড়ে গালাগাল করিয়েছেন। ছবির শুরুতে ও সব দেখে হঠাৎ মনে হচ্ছিল ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’র অরুণ মুখোপাধ্যায় ২০১৭-য় শিবু-নন্দিতার সঙ্গে ঘর করছেন বুঝি।

না, ওই সব চাপ পরিচালকরা নেননি। বলতে গেলে কাহিনির একটা দৃঢ় ভিত্তি তৈরি করার বিন্দুমাত্র চাপই নেননি তাঁরা। শুধুই আবেগময়, চোখা সংলাপ। নাটকীয়, আরও নাটকীয় চিত্রনাট্য ইত্যাদি। চাকরি সূত্রে বিদেশগামী বাঙালি তরুণ-তরুণীর বাবা-মায়ের সমস্যা দেখাতে গিয়ে কেন যে, বিন্দুমাত্র ব্যবসার সঙ্গে সম্পর্ক না-থাকা, নির্দিষ্ট বিষয়ে কোনো জ্ঞান না-থাকা নায়ককে স্টার্টআপ বিজনেস করতে লন্ডন পাঠাতে হল, এই সমালোচকের বুদ্ধিতে তার উত্তর মেলেনি।

গোটা ছবিতে বাঙালি সংস্কৃতি, অভিভাবকত্বের দেশজ ধারণাকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরার পরও, কেন শিশু পোস্তর মন রাখতে সবে মিলি লন্ডন যাওয়ার প্ল্যান আঁটতে হল, বুঝতে পারিনি তা-ও। এও কি এক ‘বিশ্ববাংলা’? ৭ বছরের শিশুকে শেকড় থেকে সরাতে যে বৃদ্ধ-বৃদ্ধার দৃঢ় আপত্তি ছিল, ছেলে-পুত্রবধূর দেশত্যাগের সিদ্ধান্তে গভীর যন্ত্রণা ছিল, তাঁরা কী ভাবে অমন খুশিখুশি মনে ছেলে গুছিয়ে বসার পর লন্ডনে গিয়ে থাকবেন বলে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন, বোঝা মুশকিল। এই যদি ওদের মনে ছিল, তা হলে তো ২ ঘণ্টা ৩৩ মিনিটের ফিল্মটা বানানোর প্রয়োজনই পড়ত না।

আর হ্যাঁ। নারী চরিত্রদের প্রায়োরিটি নিয়ে এই পরিচালকদের দৃষ্টিভঙ্গি যে প্রবল পুরুষতান্ত্রিক, তার প্রমাণ আমরা পেয়েছিলাম আগের ছবি ‘প্রাক্তন’-এই। সেই পথ ধরে হেঁটে আরও উচ্চতায় উঠেছেন তাঁরা ‘পোস্ত’য়। বাবা-ছেলের দ্বন্দ্বে অংশগ্রহণ করার সুযোগ মিলেছে পুত্রবধূ মিমির (বেশ অভিনয় করেছেন তিনি। শুধু তিনি নন, নামজাদা সব অভিনেতাই নামের সঙ্গে সুবিচার করেছেন। বেশ ভালো করেছে শিশুশিল্পী যিশুর ছেলেও)। তা, সেই সুযোগ পেয়ে, নিজের কথা বলতে গিয়ে তিনি যা বলেছেন, সেটা ভয়ংকর। মিমি জানিয়েছেন, তিনি নিজে সফল প্রফেশনাল হয়েও, যিশুর সুযোগের পথে বাধা হতে চান না বলে, চাকরি ছেড়ে লন্ডন যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। মানে ওই, পতির পুণ্যে যে… ইত্যাদি। ৬ বার চাকরি ছেড়ে দেওয়া স্বামী, বন্ধুর টাকায় বিদেশবিভুঁই-এ অজানা বিষয়ে ব্যবসা করার পণ করেছেন। তবু কী স্যাক্রিফাইস! বাঙালি সংস্কৃতি বলে কথা।

শুধু একটা ব্যাপারেই মনটা খচখচ করছে। যদি কোনো ভাবে সকলকে কলকাতায় রাখা যেত, তা হলে হয়তো এই বাজারে একটা স্টার্টআপ বিজনেস পেত রাজ্য। কিছু কর্মসংস্থান হত। একটা হিট সিনেমার থেকে সেটা কম কিছু হত কি? কে জানে?

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here