মধুমন্তী চট্টোপাধ্যায়

‘আমি পাইনা ছুঁতে তোমায়, আমার একলা লাগে ভারী’, এভাবেই কত কত দূরত্ব বাড়ে রোজ, যোগাযোগও নিভে যায়, সম্পর্ক হয়তো থাকে অথবা থাকে না। কিন্তু সম্পর্কের প্রজাপতি বিস্কুটগুলো স্বাদ হারিয়ে ফেলে বেশির ভাগ মধ্যবিত্ত বেঁচে থাকায়। অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায়ের দ্বিতীয় ছবি প্রজাপতি বিস্কুট এই মধ্যবিত্ত যাপনেরই কথা বলে। একটু পুরনো হলেই ধুলো পড়ে যাওয়া ছাপোষা দাম্পত্যগুলোর কথা বলে।
অন্তর আর শাওনের আটপৌরে জীবনে নতুন-নতুন গন্ধ ফুরিয়েছে বিয়ের বছর দুয়েকের মধ্যেই। এখন শুধু মেনে নেওয়া আর মানিয়ে নেওয়ার খেলা। নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে শাওন বাড়ির বউ হয়ে থাকতে থাকতে, অন্যের সাজিয়ে দেওয়া একটা জীবন বাঁচতে গিয়ে ভুলতে বসেছে বাবা-মায়ের দেওয়া নামটাও (শ্রাবণী)। অন্তরের জাঁদরেল মায়ের কঠোর অনুশাসনে দমবন্ধ দুই জীবন-শাওন আর অন্তর। শখ নেই, আহ্লাদ নেই, পছন্দ মতো পেশা বাছাই-এর অধিকার নেই। ‘সংস্কৃতিবান’ এবং বনেদি পরিবারে বিয়ে হওয়ার বাইপ্রোডাক্ট হিসেবে এসবের পাশাপাশি আরও অনেক ‘নেই’ এসে ভিড় করে একসময়কার খামখেয়ালি, আদুরে মেয়েটার জীবনে। আর অন্তর? আজন্ম সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগা অন্তর কোনোদিন জানতেই পারেনি সে কি চায়! বই কেনার সময় ‘বাংলার ব্রতকথা’ অথবা লেনিনের আত্মজীবনী, দুটোর যেকোনো একটা হলেই তার চলে যায়। অফিস ফেরতা চাওমিন না চিড়ের পোলাও, সেটুকুও একবারে ভেবে বলতে পারে না সে। আসলে অন্তর তো কোনোদিন পছন্দ করেনি, বাছাই করে এসেছে শুধু।
ছবির চলন খুব সরল এবং সাবলীল। ক্যামেরাও বেশ পরিণত। আর গান যে এ ছবির সম্পদ হতে চলেছে, টের পাওয়া গিয়েছিল ছবি মুক্তির ঢের আগেই। ‘তোমাকে বুঝিনা প্রিয়’-র বিষণ্ণতা জড়িয়ে থেকেছে সারা ছবিটাকেই। মন খারাপ করা গান ‘আহারে মন’ অনুপম গেয়েছেন চমৎকার। ‘প্রজাপতি বিস্কুট’-এর চিত্রনাট্য বড়ো সাধারণ। এটাই বোধ হয় ছবির ইউএসপি। চোখা চোখা সংলাপ নেই, চরিত্রদের মুখ দিয়ে অহেতুক কবিতা আওড়ানো নেই। ভীষণ কোনো লড়াইয়ের গল্প নেই, ক্রাইসিস নেই। ছোট ছোট চাওয়া-পাওয়া আর না-পাওয়া নিয়ে তৈরি হওয়া একটা অভিমানী গল্প। অন্তরের মতো করে বললে, যে অভিমান ভাঙালেও হয় আবার না ভাঙালেও। তবে না ভাঙালে, ওই যে,সম্পর্কের প্রজাপতি বিস্কুটগুলো একেবারে গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে যায়।

তবু বলি, বাস্তবে এমন হয় কি? যথেষ্ট আর্থিক সচ্ছলতা না থাকলে শুধু আলগা হয়ে আসা ভালোবাসা ফিরে পেতে মাসের পর মাস ‘আলাদা’ থাকাটুকু অ্যাফর্ড করতে পারে বাংলার ঘরে ঘরে গুমরে মরা শাওনেরা? আর ‘অবসর’-এ সিরিয়ালের সংলাপ লিখে ততটা সচ্ছল কি হওয়া যায়? পরিচালক নিজেও বোধ হয় উত্তরটা জানেন। ওটুকু স্বপ্ন-বিলাস তুলে রেখেছেন রুপোলী পর্দার জন্যই।

অনিন্দ্যর পরিচালনার হাত বেশ পোক্ত। ‘ওপেন টি বায়স্কোপ’-এর পর এখানেও তাঁর নিজস্বতা নজর কেড়েছে। ‘প্রজাপতি বিস্কুট’-এর সারা গায়েই যেন লেগে আছে চন্দ্রবিন্দুর মন কেমন করা সেই গানগুলোর সুর। বিকেল বেলা যেসব মনে পড়লে কোনো এক অজানা কারণে কষ্ট কষ্ট হয়।
অভিনয় নিয়ে আলাদা করে বলবার কিচ্ছুটি নেই। অপরাজিতা আঢ্য, শান্তিলাল, রজতাভ যে যার চরিত্রে সাবলীল। গোবেচারা হাবে ভাবে, জীবনভর ডিলেমায় থাকা অন্তরের চরিত্রে আদিত্য বেশ মানানসই। আর ইশা? শাওন চরিত্রটার জন্য ঠিক এরকমই একটা নতুন মুখের দরকার ছিল। শুধু মা-এর কথা বলার এক বিশেষ টান শাওন একটুও পেল না কেন বোঝা গেল না। নাকি সেন বাড়ির ‘কালচার’-এর ঠেলায় তা মুছে গেছে? মাত্র দু-আড়াই বছরে কি তা সম্ভব? শাওনের বন্ধু পারিজাতের চরিত্রে খেয়া চট্টোপাধ্যায় অনবদ্য। প্রজাপতি বিস্কুটের প্রোমো দেখে একটা ব্যাপার বেমানান লেগেছিল বেশ। বড়ো বেশি সাজানো সেট। পরে অবশ্য ছবিটা দেখতে গিয়ে বোঝা যায় পরিচালক ইচ্ছে করেই দেখিয়েছেন এমনটা। ঝকঝকে পরিপাটি ঘর, যত্ন করে সাজানো ‘দামি’ সংসার। পুতুল-পুতুল ওই সংসারে হাঁপিয়ে ওঠা দুটো মন।
ছবির প্রথমার্ধ একটু বেশি টানা হয়েছে বলে মনে হতে পারে দর্শকের। দ্বিতীয়ার্ধের গতি অনেক মসৃণ। শাওন সেখানে বেশ পরিণত। সে বোঝে, তাঁদের মাঝে এক আলোকলতা এলেই সমস্যার সমাধান হবে না। পালটে যাবে না তাঁর দমচাপা জীবন। বরং একটু যত্ন, আর আদর-আশা-ভালোবাসা দিয়ে তাঁর আর অন্তরের মাঝে তৈরি হোক স্বপ্নের এক আলোকলতা।

3 মন্তব্য

  1. এইরকম একটা বি-গ্রেড মুভিকে অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে ভালো বলার চেষ্টা করেছেন। বিস্কুট কোম্পানি পয়সা দিয়েছে বুঝি?

    • ধরে নিচ্ছি,আপনি চিত্র পরিচালক কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায়। আর সেটা ধরে নিলে, জেনে ফেলা যায়, একই ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করা পরিচালকের ছবিকে সরাসরি ‘বিগ্রেড’ বলে দেওয়ার সৎ সাহস আপনার আছে। এই আকালে এমন হিম্মৎ আশা জোগায় বইকি!!
      আর রইল বাকি খবর অনলাইনের কথা। খুবই ছোটো প্রতিষ্ঠান আমাদের। খব কম দিনেরও। মানব এবং/অথবা আর্থিক সম্পদের অভাবে সব ছবির রিভিউ করা সম্ভব হয় না। সম্পাদকীয় বাছাই কিছু করতেই হয়। সেই বাছাইয়ের কোনো কোনো ছবি সমালোচকের ভালো লাগে। তার মধ্যে বাংলা ছবিও আছে/থাকে। সিনেমা রিভিউর পাতাতে ঢুকলে সেগুলি সবই পরপর দেখতে পাবেন। হয়তো দেখেওছেন। তো, যেসব সিনেমাগুলো ভালো সমালোচনা পেয়েছে, সেগুলোর কোনটির জন্য কোন সংস্থা পয়সা দিয়েছে, সেগুলি যদি চিহ্নিত করে দেন, তাহলে পাঠকদের সুবিধা হবে। রিভিউ ভালো পাওয়ার নানা টিটবিটস সম্পর্কে যেহেতু আপনি অবহিত, তাই একটা অথেনটিক মতামতই পাবেন পাঠকরা। আর আমাদের সুবিধা হবে, পরবর্তী কালে আমরা সেই সব সংস্থার থেকে পয়সা চাইতে পারব বা পয়সা চাওয়ার গাইড লাইন পেয়ে যাব। কে বলতে পারে, হয়তো তার মধ্যে কোনো বিমান পরিষেবা সংস্থাও থাকবে।

  2. কমলেশ্বর বাবু আপনি দুটো তকমা একসাথে নিতে চাইছেন। শি…… আর বাজারি ছবির পরিচালক হিসাবে। হয় না। ‘ককপিট’ বানান না… । অন্য ছবি বি-গ্রেড বলছেন / বলতে পারেন। কিন্তু আপনার ছবি কোন গ্রেড! সেটা দিয়ে বলুন। আপনিও তো একই রাস্তায় আছেন……………………

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here