সুঅঙ্গনা বসু

আমাদের স্বাধীনতা বাজি ধরা আছে লাস ভেগাসের ক্যাসিনোয়। সিমরান নিজের জীবন নিজের মতো করে বেছে নিতে পারে, এসে যেতে পারে নায়ক রাজ-ও, কিন্তু জীবন বাজি ধরা আছে স্টক মার্কেটের লেনদেনে। সর্বহারা প্রফুল সিমরান প্যাটেল তাই জীবন বাজি রাখার বদ অভ্যাস বদলাতে পারে না।

এ ছবির প্রমোশনে কঙ্গনা রানাওয়াত যদি তাঁর বিছানার নোংরা চাদর কাচার জন্য খোলা বাজারকে বেছে না নিতেন তাহলে কী বৃত্ত সম্পূর্ণ হত? আমার ব্যক্তিগত মতামত – না, হত না। কারণ কঙ্গনা ছাড়া এ ছবি অসম্পূর্ণ। ছবির নায়িকার নাম প্রফুল, সিমরন নয়। কেন ছবির নাম সিমরন, তা নিয়ে আলোচনা দরকারি নয়। প্রফুল ‘দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে যায়েঙ্গের’ সিমরান নয়, বেঁচে থাকার জন্য বাবুজির অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন মনে করে না। তাঁর একমাত্র স্বপ্ন স্বাধীনতা। সিমরান শুধুমাত্র কোনো মেয়ের গল্প নয়। সিমরান স্বাধীনতার জন্য জীবন বাজি রাখতে পারে, ব্যাঙ্ক ডাকাতি করতে পারে, আবার দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে বাবাকে ম্যানুপুলেট করার চেষ্টা করতে পারে। আর এসব করতে করতেই যখন তখন পেরিয়ে যেতে পারে বিপদসীমা। অবশ্যই শখ করে নয়। কঙ্গনা কয়েকদিন আগে ইন্টারভিউতে বলেছেন, ‘বাড়ি যখন রেনোভেশন হচ্ছিল দাদাদের ঘর হল, আমাকে বলা হল তুমি তো পরের বাড়ি চলে যাবে, ওখানে ঘর হবে’। এ কথা শুনেই অবশ্য সবাই তেড়েফুড়ে বিগ ব্যাড ওয়ার্ল্ডে নিজের ভাগ্য পরীক্ষা করতে পাড়ি দেয়না। কেউ কেউ দেয়। কঙ্গনা দিয়েছিল। দিয়েছে সিমরান ছবির নায়িকা প্রফুল। সবাই অবশ্যই কঙ্গনার মতো জিতে যায় না। এক্ষেত্রে প্রফুল-ও কোথাও পৌঁছতে পারেনি। স্বাধীনতার ধারে কাছে পৌঁছন দূরে থাক, পৌঁছে গেছে জেলে। আর কী অনায়াস সেই সিনেম্যাটিক জার্নি।

টিভি-র পর্দায় অমরিশ পুরী বলে ওঠেন, ‘যা  সিমরান যা, জি লে আপনি জিন্দেগি’। কাজল ছুটতে থাকেন ট্রেন থেকে হাত বাড়িয়ে থাকা শাহরুখের দিকে, আর প্রফুল ছুটে যায় ব্যাঙ্ক লুঠ করতে।

হয়তো মেয়ে বলে সিমরানের বিপদের সম্ভাবনা বেশি, কিন্তু এক্ষেত্রে প্রফুলকে সামগ্রিকে একজন প্রান্তিক মানুষ হিসেবেই দেখতে হবে। ঠিক যেমন তাঁর বাবা। ছবির প্রথমেই প্রফুল বাবাকে বলে দেয় গুজরাতি সমাজের শ্রেণি বিন্যাসের তৃণমূল স্তরে রয়েছে তাঁদের পরিবার। সমাজ নিয়ে তাই বেশি ভেবে লাভ নেই। প্রফুল বাবা মার সঙ্গে আমেরিকায় থাকে। সে হাউসকিপিং-এর কাজ করে আর মাইনরিটি হাউসিং-এ বাড়ি কিনে আলাদা থাকতে চায়। কারণ খুব সিম্পল – ‘পাপা মুঝে সিঙ্গল রহনে দো’। বাবা চায়না সে বাড়ি কিনে পয়সা নষ্ট করুক। বছর তিরিশের ডিভোর্সি প্রফুলের দ্বিতীয় বিয়ে দেওয়ার জন্য হন্যে হয়ে উঠেছেন তাঁর বাবা। প্রথমবার বিয়ে নিজের ইচ্ছেতেই করেছিল, কিন্তু সে বিয়ে টেকেনি। সুতরাং প্রেম নিয়ে কোন হ্যাংওভার প্রফুলের নেই।

লাস ভেগাসের ক্যাসিনোয় প্রথম দিন ২০০০ ডলার জিতে যায় প্রফুল। সুন্দরপানা দেখতে একটি ছেলের সঙ্গে হোটেল রুমে চলে যায়। গোলগাল গুজরাতিকে জুয়ার দানে হারিয়ে দেয়। বারবার আমরা ভাবি এই বুঝি বিপদে পড়ল, কিন্তু খাদের কিনার দিয়ে হাঁটতে থাকলেও, সে পড়েনা। আমাদের প্রেডিকশন বা অ্যাপ্রিহেনশন ভুল প্রমাণ করে দেয়। জুয়ার দানের ওঠা পড়ার মত এগোয় প্রফুলের জীবন। ওঁত পেতে থাকে বিপদেরা, কখনো বেরিয়ে আসে, কখনো খাপে ঢুকে যায় ভিডিও গেমসের মতো। যে স্বাধীনতা প্রজাপতির ডানার মত, খোলা বাতাসের মতোই ফ্রি-তে পাওয়ার কথা, শুধু সেটুকু বুঝে নিতে গিয়েই বন্ধক রেখে দিতে হয় জীবন। টিভি-র পর্দায় অমরিশ পুরী বলে ওঠেন, ‘যা  সিমরান যা, জি লে আপনি জিন্দেগি’। কাজল ছুটতে থাকেন ট্রেন থেকে হাত বাড়িয়ে থাকা শাহরুখের দিকে, আর প্রফুল ছুটে যায় ব্যাঙ্ক লুঠ করতে। বড় মিষ্টি আমাদের কঙ্গনা। এত মিষ্টি ব্যাঙ্ক ডাকাতি আগে দেখিনি, নিরস্ত্র। তবে শেষবার ডাকাতির আগে তাঁর হাতে বন্দুক ধরিয়ে দিয়ে, তাঁর সাহসকে কুর্নিশ করে গেছেন লাস ভেগাসের মহাজনরা। ভারী মজার দৃশ্য কিছু, চার্লিকে মনে পড়ায় কখনো কখনো। কঙ্গনা যেমন অভিনয় করেন, তেমনই করেছেন যথাযথ। এ ছবিতে হিরো চিত্রনাট্য। বিশ্বমানের এবং অবশ্যই দেহমনে ভারতীয়। তবে ২২ বছর আগের সিমরানের মতো ভার্জিনিটি নিয়ে ছুঁতমার্গ নেই। আমেরিকান পুলিশ যখন ভারী অবাক হয়ে জিগ্যের করে ধরাই যখন দেবে তখন পালাতে গেলে কেন? একরাশ ইনোসেন্স নিয়ে প্রফুল জবাব দেয় – ওটা ভারতীয় লোক্যালিটি, ওখানে ধরা পড়লে সবাই জানতে পারবে, বাবা বকবে। প্রফুলের বাবার অবশ্য অমরিশ পুরীর মত পার্সোনালিটি নেই। শেষ দৃশ্যে জেলে বসে মেয়েকে ধোকলা খাওয়াতে খাওয়াতে তিনি বলেন এবার বিজনেসে তিনি মেয়েকে পার্টনার করে নেবেন, আর প্রফুল সাফ জানিয়ে দেয় সে এবার স্টক মার্কেটে টাকা লাগাবে, জেলে বসে এসব শিখছে সে। বাবার প্রতিক্রিয়া যাই হোক, প্রফুলের বলা কথাটুকুও কি কিছু কম গুরুত্বপূর্ণ? ভারতীয় বাবাদের পুরুষতান্ত্রিকতার দুই দশকের যাত্রাপথের ধুলো কি লেগে গেল বলিউডের লেন্সে?

প্রফুলের কিন্তু দ্বিতীয় বিয়েটা প্রায় হয়ে গেছিল। পাত্র আমাদের পছন্দ হয়েছিল। পাত্রেরও স্বাধীন প্রফুলকেই পছন্দ হয়েছিল। কিন্তু ততক্ষণে দর্শক জেনে গেছেন স্বাধীন প্রফুল ঠিক ততটা স্বাধীন নয়।

২২ বছর আগে কাজলকে দেখিয়ে কেউ নেপোটিজমের বিতর্ক তোলেননি, তাছাড়া সেই সিমরনকে মুক্তি দিতে একজন শাহরুখ খান ছিলেন। আজকের কঙ্গনার লড়াই কিন্তু আরশিনগরকে প্রতিষ্ঠা করার।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here