madhumantiমধুমন্তী চট্টোপাধ্যায়

ছবির নাম ‘দ্য বংস এগেন’। অতএব বোঝাই যাচ্ছে ‘বংস’রা আগেও এসেছিলেন। অঞ্জন দত্তের হাত ধরেই এসেছিলেন বছর দশেক আগে। তবে মুক্তি পাওয়ার আগেই পরিচালক জানিয়েছেন, তাঁর নতুন ছবি ‘দ্য বং কানেকশন’-এর সিকোয়েল নয়।  তাই মিল কিংবা অমিল খুঁজে সময় নষ্ট করবেন না। তবে দশ বছরে কতটা পালটাল ‘বংস’ নামের এই আধা-বাঙালি-আধা-বহুজাতিক সম্প্রদায় ? ইংরেজি বলার ফ্রিকোয়েন্সি বেড়েছে নিঃসন্দেহে। আর বেড়েছে যখনতখন নিজের শেকড় খোঁজার একটা ওপর-ওপর ইচ্ছে।

কলকাতার মেয়ে ওলি তার না-দেখা বাবার খোঁজে যখন পাড়ি দিচ্ছে বিলেত, সে দেশ থেকে তিন মাসের ভিসা নিয়ে সারা আসছে কলকাতায় তার আসল মাকে দেখতে। কিন্তু অস্তিত্বের এই সংকট তো শুধু বাঙালির নয়, সমস্যাটা এই প্রজন্মের। ভার্চুয়াল দুনিয়া যাদের ঠেলে দিয়েছে একটা ‘মেক-বিলিফ’ জগতে।

সে যা-ই হোক, ওলি না হয় বিলেত গেল। বিয়ের আগেই প্রেমিক অনির লন্ডনের বাড়িতেও না হয় উঠল। কিন্তু তাই বলে বলা নেই, কওয়া নেই, এক দিনের আলাপে ওই আধবুড়ো জেরির সঙ্গে দিন তিনেকের জন্য হাওয়া হয়ে গেল বাবাকে খুঁজতে? না, সমস্যাটা এখানে নয়, যে অলি ওর হবু স্বামীর অমত সত্ত্বেও নিজের সিদ্ধান্ত থেকে নড়েনি একফোঁটাও। ওলির জেদ আর সাহসকে সম্মান জানিয়েই বলছি, এটা একটু বাড়াবাড়ি হয়ে গেল না? যে কারণে দেশ থেকে বিলেত আসা, তার জন্য আরেকটু পরিকল্পনামাফিক এগোনোটাই স্বাভাবিক নয় কি? অবশ্য প্ল্যান করে এগোলে সমুদ্রসৈকতে বিলিতি ঝিনুকে কান পেতে ‘তোমায় গান শোনাব’ হত না।

বাংলা ছবির উঠতি পরিচালকদের জানিয়ে রাখা ভালো, ছবিতে রবীন্দ্রসঙ্গীতের একটা রিপ্রাইসড ভার্সন না থাকলে সেন্সর বোর্ডের ছাড়পত্র মিলছে না আজকাল। অতএব দেড় দিনের আলাপে জেরির পাকিস্তানি সফরসঙ্গীকেই হতে হল ওলির ‘দুখ জাগানিয়া’। বিদেশি নিসর্গের মাঝে ওরকম এক হ্যান্ডসামের জন্য দুঃখবিলাস করেও সুখ।

ও দিকে কলকাতায় বাড়ি ভাড়া করে সারা। এক বছর বয়সে যে মা তাকে রেখে গেছিল অনাথ আশ্রমে, তাঁর টানেই এত বছর বাদে আবার দেশে ফেরা। তবে সারাদের জন্য আমাদের কলকাতা, আমাদের দেশ কি সত্যি এতটা আন্তরিক? অমন মায়ের মতো বাড়িওয়ালি, রাতবিরেতে ফোন করলেও মুহূর্তের মধ্যে দোরগোড়ায় এসে হাজির হওয়া জিশুর মতো বন্ধুরা শহরে সত্যি আছেন তো ? থাকলেও তারা  সংখ্যায় মোটামুটি হাতে গোনা বলেই আমির খানকে ‘অতিথি দেবো ভব’-এর তাৎপর্য বোঝানোর দায়িত্ব নিতে হয়।

২ ঘণ্টার ছবির সব চেয়ে সুন্দর অংশের নাম নেহা পাণ্ডা। সারার চরিত্রে নেহা বড্ড সাবলীল। ওর অভিনয় দেখে বলিউডের কাল্কি কোয়েচলিনের সঙ্গে তুলনা করার লোভটা সামলাতে পারলাম না। পার্নোও মন্দ নয়। চোখ কপালে তুলে কথা বলার অভ্যেসটা একটু কমিয়েছেন বলেই মনে হল। মিষ্টি লেগেছে জিশুকে। গৌরবের তেমন কিছু করার ছিল না ছবিতে, যেটুকু ছিলেন, অভিনয় তেমন দাগ কাটতে পারেনি। আলাদা করে প্রশংসা করতে হয় লুই-এর। নিতাইয়ের ভূমিকায় লুইকে মানিয়েছে চমৎকার। রইল পড়ে এক, না না দুই। দত্ত ভার্সাস দত্ত। কে জিতলেন, কে পারলেন না, প্রশ্ন সেটা নয়। পরিচালক অঞ্জন ঠিক যে ধরনের চরিত্রে অভিনেতা অঞ্জনকে দেখতে পছন্দ করেন, ঠিক সেই রকম ভাবেই তৈরি করেছেন জেরিকে। আর পরিচালক অঞ্জন সম্পর্কে বলার একটাই, ব্যোমকেশ সিরিজে নিজেকে আর না জড়ালেই বোধহয় ভালো করবেন। ভালো হোক, মন্দ হোক, ‘দ্য বংস এগেন’-এর মতো ছবির পরিচালনায় তাঁর একটা ট্রেডমার্ক স্টাইল আছে।

ছবির প্রায় অর্ধেকটাই হয়েছে দেশের বাইরে। তাই আলাদা করে আনতেই হয় সিনেমাটোগ্রাফির প্রসঙ্গ। ক্যামেরার খুঁটিনাটি না বুঝলেও এটা বুঝি, চিত্র পরিচালকের পাকা হাত। নীল দত্তের সুর বরং হতাশ করেছে এ বার। আগে বেশ কিছু ভালো সুর পাওয়ার ফলে নীলের থেকে প্রত্যাশা ছিল অনেক বেশি। মেট্রো স্টেশনের টিভিগুলো দিনরাত নিরলস প্রচেষ্টা চালালেও একমাত্র ‘এই শহর’ গানটি বাদ দিয়ে আর কোনোটাই গুনগুন করার ইচ্ছেটুকুও হচ্ছে না।

ছবির গল্প কিন্তু শুনিয়ে দিয়েছি অনেকটা। বাকিটা ‘বলা বারণ’। ‘টুইস্ট’ আছে ছবির শেষ দিকে। আছে কিছু ‘পড়ে পাওয়া চোদ্দো আনা’। আর বাকি দু’ আনা? ওটুকু থাক। সারা জীবন হন্যে হয়ে ঘুরব সেই দু’ আনার খোঁজে, তবেই না বেঁচে থাকা!

1 মন্তব্য

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here