প্রসেনজিৎ চক্রবর্তী

শুরুতে দুটি তথ্য দেওয়া যাক। প্রথমত, উমা ছবিটি সম্পর্কে বলতে গিয়ে পরিচালক সৃজিত মুখার্জি বারবার বলেছেন এটি সত্য ঘটনা থেকে অনুপ্রাণিত সিনেমা। ২০১৫ সালের অক্টোবরে কানাডার ওন্টারিওর সেন্ট জর্জের বাসিন্দারা সাত বছরের বালক ইভানের জন্য অকাল বড়োদিন পালন করেছিল। তাতে যুক্ত হয়েছিল প্রশাসনও। সেলেব্রিটিরাও তাঁকে শুভেচ্ছা পাঠিয়েছিলেন। অসময়ের তুষারপাতেরও বন্দোবস্ত হয়েছিল। কারণ তাঁর বিরল ধরনের ব্রেন ক্যান্সার হয়েছিল। ছোটোদের ক্যান্সার নিয়ে গবেষণার জন্য একটি ফাউন্ডেশনও সে সময় তৈরি হয় সেন্ট জর্জে। ইভান চেয়েছিল বড়োদিন দেখতে। ডাক্তাররা বলেছিলেন অতদিন সে বাঁচবে না। তাই নেওয়া হয়েছিল ওই উদ্যোগ। শেষ পর্যন্ত ক্রিসমাস দেখে ক্রিসমাসের আগেই মারা যায় ইভান। সেই ঘটনার উপর ভিত্তি করেই উমা বানিয়েছেন পরিচালক।

আরও একটি তথ্য। ২০১০ সালে হলমার্ক চ্যানেলে একটি ক্রিসমাস মুভি সম্প্রচারিত হয়েছিল। নাম ‘নভেম্বর ক্রিসমাস’(উৎসাহীরা ইউটিউবে দেড় ঘণ্টার গোটা সিনেমাটি দেখে নিতে পারেন)। সেখানে ছিল মারণ রোগে আক্রান্ত এক বালিকার কথা। যার জন্য তাড়াতাড়ি ক্রিসমাস পালন করার পরিকল্পনা শুরু করেন তাঁর বাবা-মা। কিন্তু নানা ভাবে এক এক করে গ্রামের লোকেরা বিষয়টি জানতে পেরে যায়। এবং সকলে মিলে গ্রামে অগ্রিম ক্রিসমাসের মহাকাব্য রচনা করে। অর্থাৎ বলা যেতেই পারে, এই টেলিছবির পাঁচ বছর পর কানাডায় শিল্পকে অনুকরণ করেছিল জীবন। সেটা কখনও কখনও এ পোড়া বিশ্বে ঘটে যায়। কিন্তু বাংলা সিনেমার ফার্স্ট বয় অন্য কোনো শিল্পকর্ম থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে নিজে শিল্পকর্ম করবেন, এ কথা ভাবা যায় না। জীবনই তাঁর একমাত্র রিসোর্স নিশ্চয়।

আরও পড়ুন: গুরুতর অসুস্থ বিপাশা বসু, শ্বাসকষ্টের সমস্যায় ভর্তি হাসপাতালে

তবে জীবন বা শিল্প, যেটাই তাঁকে অনুপ্রাণিত করে থাকুক, দুই ক্ষেত্রেই যেটা ঘটনার মূল, সেটা সৃজিত নিজস্ব সীমাবদ্ধতায় ছুঁতে পারেননি। অথবা হয়তো পেরে উঠবেন না বলে ছোঁয়ার চেষ্টাই করেননি। তা হল, সাধারণ মানুষের মধ্যে বহমান অফুরান মানবিক বোধ ও সৃজনশীলতা। সেটা বাদ দিয়ে সৃজিত তুলে নিয়েছেন ‘২ মাস পরে মরতে যাওয়া বালিকার শেষ ইচ্ছাপূরণের জন্য বাবার প্রাণান্তকর প্রয়াসের’ সুবিধাজনক অংশটুকু। আর জনগণের মানবিকতাকে প্রতিস্থাপন করেছেন ফিল্ম তৈরির টিম দিয়ে। যাদেরকে স্রেফ টাকার বিনিময়েই কাজে লাগাতে সক্ষম হন উমার বিশাল ধনী বাবা যিশু সেনগুপ্ত। কাজ করতে করতে শেষে তাঁরা যে ট্র্যাজেডির সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে পড়ে, সেটা তো না হলেই নয়। এমনকি গোটা গল্পটাই সৃজিত এমন জনবিচ্ছিন্ন ভাবে তৈরি করেছেন যে, শেষে যখন বাবুঘাটের ভাসান উদ্‌যাপন করার জন্য জুনিয়র শিল্পীদের পাওয়া গেল না, তখন দোরে দোরে গিয়ে অনুরোধ সত্ত্বেও আসতে রাজি হননি কোনো আবাসনবাসী। বদলে নিজে পয়সা ও প্রভাব খাটিয়ে একপাল লোক নিয়ে আসেন এক মানবিক হয়ে পড়া ‘বিহারি গুন্ডা’ বাবুল সুপ্রিয়। প্রকৃতপক্ষে, যে আবাসনে উমার জন্য অকাল দুর্গাপূজার আয়োজন করা হয়, সেখানকার বাসিন্দাদেরও বিষয়টা জানতে দেননি পরিচালক। তাই তাঁরা এক বছরে দুবার পুজোর আনন্দে মেতে উঠলেও উমার বা তাঁর বাবার সহমর্মী হওয়ার সুযোগ পাননি।

আরও পড়ুন: মা হতে চলেছেন শুভশ্রী, জিৎ টুইটারে শুভেচ্ছা জানালেন রাজকে

আর এমনটা করতে গিয়ে একটি কাঁচা কাজও করে ফেলছেন বাংলা সিনেমার ফার্স্ট বয়। অকালে দুর্গাপুজোর জন্য ক্ষুব্ধ হিন্দুত্ববাদী মহীতোষ সুরকে(অনির্বাণ ভট্টাচার্য)প্রায় কার্টুনের মতো চরিত্রায়িত করেছেন। অথচ চরিত্রটি শেষে যখন জানতে পারে, উমার আয়ু আর মাত্র দু’মাস, তখন সে ভেঙে পড়ে। শুরুতেই এটা তাঁকে জানানো গেলে হয়তো চারটি ফালতু ঝামেলা পোয়াতে হত না ফিল্ম ইউনিটকে। তাঁকে ভিলেনও বানানো যেত না। ফলে পরিচালকের বিজেপি-বিরোধিতার এজেন্ডাটাও সিনেম্যাটিক্যালি দাঁড়ায়নি। অবশ্য এই গণ্ডগোলে একটা লাভ হয়েছে। দর্শক অভিনেতা হিসেবে পেয়েছেন গায়ক-সাংসদ বাবুল সুপ্রিয়কে। চমৎকার অভিনয় করেছেন বাবুল।

এবং অঞ্জন দত্ত। উমাকে নিয়ে ছবি বানাতে গিয়ে ফোকাসটা ঘেঁটে ফেলে আসলে এক ব্যর্থ চিত্র পরিচালক ও পুত্রবিচ্ছিন্ন মানুষের ছবি বানিয়ে ফেলেছেন সৃজিত। প্রবীণ পরিচালক ব্রহ্মানন্দ চক্রবর্তীর স্বপ্নপূরণের গল্প বলেছেন। যিনি স্রেফ টাকার জন্য নয়, এমনকি উমার জন্যও নয়- নিজের জন্যই মার্চ-এপ্রিলে কলকাতায় শারোদৎসব রিক্রিয়েট করার চ্যালেঞ্জটা নিয়ে ফেলেন। এবং ক্যামেরার অস্তিত্বহীন সেই সিনেমার শেষ দৃশ্যের টেনশনের অঙ্গ হয়ে যান। নিজে গিয়ে অনুরোধ করে প্রসেনজিত, দেব, মিমির মতো নামজাদা স্টারদের বাবুঘাটের ভাসানে হাজির করে এক দুরন্ত উদ্‌যাপনের জন্ম দেন। যদিও সুজারল্যান্ডবাসী সাত বছরের বালিকা এদের চিনতে পারল কিনা দর্শক জানে না। যেহেতু দর্শক এদের চেনেন, তাই ভাসানের দৃশ্যে পৌঁছে গোটা সিনেমাটা দেখার ধকল কাটানোর ব্যর্থ চেষ্টা করার সুযোগ পান তাঁরা। যাই হোক না কেন, অঞ্জন দত্ত প্রত্যাশিত ভাবেই ফাটিয়ে দিয়েছেন। অঞ্জনকে এই চরিত্রটা দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ অবশ্যই প্রাপ্য সৃজিতের। আশা করা যাক, অঞ্জন যতদিন অভিনয় করবেন, তাঁকে বাংলা চলচ্চিত্র জগৎ এভাবেই কাজে লাগিয়ে যাবে।

উমার ভূমিকায় খুব স্বাভাবিক অভিনয় করেছেন যিশুর মেয়ে সারা। যিশু যথাযথ।এছাড়া রুদ্রনীল দারুণ। নীল, নিবেদিতা, অম্বরীশ, অভিজিত গুহ, অনির্বাণ, বাবুল সুপ্রিয় সকলেই ভাল অভিনয় করেছেন। একটি দৃশ্যে অভিনয় করে মন কেড়ে নিয়েছেন মনোজ মিত্র। অবশ্য তিনি যে সেটা করবেন, এটাই তো স্বাভাবিক।

পুনশ্চ: কাকাবাবুর পর অঞ্জনকে দিয়েও সোশাল মিডিয়াকে গালাগাল করিয়েছেন সৃজিত। সঙ্গে একহাত নিয়েছেন- দু লাইন লিখেই যারা নিজেদের সিনেমা বোদ্ধা ভাবেন, তাঁদেরকেও।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here