প্রসেনজিৎ চক্রবর্তী

হল থেকে বরোনোর সময় শুনলাম, পেছনে এক তরুণী তাঁর বান্ধবীকে বলছেন, “বেগমজান কি এর চেয়েও খারাপ”। বুঝলাম রবিবার বিকেলটা মোটেই ভালো কাটলো না ওদের। বুঝলাম, সেরা বাংলা ছবির জাতীয় পুরস্কারের ভরসায় তাঁরা এদিন সৃজিতের বদলে কৌশিককে বেছে নিয়েছিলেন। তবে বোঝা সম্ভব ছিল না, জাতীয় পুরস্কারের তকমা দেখে টিকিট কেটে ছবি দেখার ব্যাপারে এরপর তাঁরা কী সিদ্ধান্ত নেবেন।

আমার অবশ্য তেমন কোনো চাপ ছিল না। জাতীয় পুরস্কার না পেলে আমি ছবিটি দেখতাম না। রিভিউ লেখারও প্রশ্ন থাকতো না। এই খারাপ কথাটা সেক্ষেত্রে আমায় জানাতে হত না যে, ২-৩টি ছবি বাদে কৌশিক গাঙ্গুলির কোনো ছবিই আমার ভালো লাগেনি, সেগুলোও লোকমুখে শুনে পরে দেখেছি। এতগুলো ছবি বানানো, এতগুলো জাতীয় পুরস্কারের পরও ওর সমস্যাটা একই জায়গায় থেকে গেছে। উনি টেলিফিল্ম বানানোর দিনগুলো থেকে বেরোতে পারেননি।

একটা চমকপ্রদ কনসেপ্ট। যা দিয়ে মেরেকেটে এক ঘণ্টার টেলিফিল্ম হতে পারে, তা দিয়ে পূর্ণ দৈর্ঘ্যের ছবি বানানো যে দর্শকদের ওপর অত্যাচারের সামিল, তা কৌশিকের পক্ষে বোঝা সম্ভব নয়, কারণ তিনি বছরে ২-৩টি ছবি বানানোর প্রোডিউসার সহজেই পেয়ে যান।

জয়া আহসান নিজের চেনা জগৎ পেয়ে চুটিয়ে অভিনয় করেছেন। আর কৌশিক গাঙ্গুলি যে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙালি অভিনেতাদের মধ্যে পড়েন, তা আরও একবার প্রমাণ দিয়েছেন। তবে চমকে দিয়েছেন আবির। তিনি যে যথেষ্ট খারাপ অভিনেতা বা অভিনেতাই নয়, সেটা কমবেশি আমরা সকলেই জানতাম। কিন্তু সেটা যে কত বড়ো আকারের সত্য, তার প্রমাণ বিসর্জন। এই ছবিতে আবির বুঝতেই পারেননি, তাঁকে কী করতে নেওয়া হয়েছে। সংলাপ কম দিয়ে তাঁকে বাঁচানোর চেষ্টা কৌশিক করেছিলেন বটে, কিন্তু সারাক্ষণ ভ্রূ কুঁচকে গম্ভীর এক্সপ্রেশন দিয়ে আবির সেই চেষ্টাটুকুকেও বিসর্জন দিয়ে দিয়েছেন।

বিসর্জনের ব্যাপারটা অবশ্য খানিক আলাদা। এপার বাংলা-ওপার বাংলা, হিন্দু-মুসলিম, সংখ্যালঘু মানস, সীমান্ত অঞ্চলের বিশেষ চরিত্র ইত্যাদি নানা ছকে  ফেলে বড়ো দাঁও মারতে গিয়ে(তাতে অবশ্য কৌশিক সফল) তিনি আধা-আজগুবি একটা গল্প নামিয়েছেন। যেখানে আহত-অচৈতন্য এক যুবককে উদ্ধার করে সুস্থ করে তুলতে গিয়ে, রাত পোহাতে না পোহাতেই তাঁর মধ্যে অতিরিক্ত মদ খেয়ে মরে যাওয়া স্বামীর ছায়া দেখতে পায় বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের এক যুবতী হিন্দু বিধবা। এবং নানা সামাজিক চাপের সঙ্গে কৌশলে লড়তে লড়তে সেই ভারতীয় মুসলিম যুবককে সুস্থ করে তোলার চেষ্টা করে সে। এমনকি, তাঁর সিগারেট কিনে দেওয়া, ভারতে আইএসডি করে তাঁর বাড়িতে খবর দেওয়া- সবই চলতে থাকে।

অন্যদিকে রয়েছেন গ্রামের ধনী মাছ ব্যবসায়ী কৌশিক গাঙ্গুলি। যিনি পদ্মাকে (জয়া আহসান)বিয়ে করতে চান। সে জন্য প্রায় সর্বস্ব পণ করে বসে আছেন। সঙ্গে গভীর ও সূক্ষ্ণ শয়তানি। জটিল পরিস্থিতিতেও কীভাবে মাছ ধরে ডাঙায় তুলতে হয়, তার কৃৎকৌশল তাঁর নখদর্পণে। যদিও তাঁর প্রস্তাবে রাজি না পদ্মা। পদ্মা চরিত্রটি ছবি জুড়ে এত যে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত নিয়ে গেছে, তার একটাই ব্যাখ্যা মেলে ছবিতে। যখন নাসের আলি তাঁকে বলে, যে তাঁর ‘দম’ আছে।

যাই হোক, পরস্পরবিরোধী দুটো স্বপ্ন কী ভাবে মিলল বা তাকে মেলা বলা যায় কি না, তা জানানোর জন্য ২ ঘণ্টা ১৮ মিনিট নিয়েছেন কৌশিক।

জয়া আহসান নিজের চেনা জগৎ পেয়ে চুটিয়ে অভিনয় করেছেন। আর কৌশিক গাঙ্গুলি যে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙালি অভিনেতাদের মধ্যে পড়েন, তা আরও একবার প্রমাণ দিয়েছেন। তবে চমকে দিয়েছেন আবির। তিনি যে যথেষ্ট খারাপ অভিনেতা বা অভিনেতাই নয়, সেটা কমবেশি আমরা সকলেই জানতাম। কিন্তু সেটা যে কত বড়ো আকারের সত্য, তার প্রমাণ বিসর্জন। এই ছবিতে আবির বুঝতেই পারেননি, তাঁকে কী করতে নেওয়া হয়েছে। সংলাপ কম দিয়ে তাঁকে বাঁচানোর চেষ্টা কৌশিক করেছিলেন বটে, কিন্তু সারাক্ষণ ভ্রূ কুঁচকে গম্ভীর এক্সপ্রেশন দিয়ে আবির সেই চেষ্টাটুকুকেও বিসর্জন দিয়ে দিয়েছেন।

কৃষ্ণ বিনে গীত হয় না। তাই কালিকাপ্রসাদের কথা বলতেই হয়। ছবির সঙ্গে গানের তেমন কোনো অঙ্গাঙ্গি সম্পর্ক নেই। গ্রাম বাংলার ব্যাপার তো, সঙ্গে লোকগীতি মেশালে ছকটা শক্তিশালী হয়, আর সেটা করতে গেলে কালিকাই তো সেরা বাজি ছিলেন এই ক’দিন আগে পর্যন্তও। জাতীয় পুরস্কার কোনো হালকা বিষয় তো নয়।

একথা বহুচর্চিত, জাতীয় পুরস্কার নানা ভাবে জোগাড় করা যায়, এমনকি কেনাও যায়। তবু সেরা ছবির জাতীয় পুরস্কার তো, ধরে নিচ্ছি বিসর্জন এ বছরের প্রথম ২-৩টি বাংলা ছবির মধ্যে পড়ে( ১ নম্বর যদি নাও হয়)। সঙ্গে আশা করছি, বাংলা ছবির এই ঘোর দুর্দিন নিশ্চয় একদিন কাটবে।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here