anirban chaudhury
অনির্বাণ চৌধুরী

‘সঞ্জু’ ছবিটা যাঁরা দেখতে যাবেন বলে ঠিক করেছেন, তাঁদের একটা কথা সবার আগে জানিয়ে রাখা ভালো! এই ছবিতে টিনা মুনিমের চরিত্রে সোনম কে আহুজা, কুমার গৌরবের চরিত্রে ভিকি কৌশল, সলমন খানের চরিত্রে জিম সর্ভ, মাধুরী দীক্ষিতের চরিত্রে করিশ্মা তন্না নেই! মানে, তাঁরা ছবিতে আছেন ঠিকই, কিন্তু এই চরিত্রগুলোয় নয়!

sanju

তা হলে ছবির প্রচারের সময়ে নির্মাতারা এঁদের এই চরিত্রগুলোয় অভিনয়ের কথা বলেছেন কেন?

sanju

ছবিতে রাজকুমার হিরানি সাংবাদিকদের এক হাত নিয়েছেন! বেশ স্পষ্ট করে বলতে দ্বিধা করেননি, যখনই সঞ্জয় দত্তকে নিয়ে বিস্ফোরক সব খবর তৈরি হয়েছে, তখনই সাংবাদিকরা ঝুড়ি ঝুড়ি মিথ্যে লিখে ভরাট করেছেন খবরের কাগজের পাতা! আর পাছে কেউ কিছু বলতে না পারেন, সেই জন্য খবরের শিরোনামে এবং বক্তব্যে তাঁরা ব্যবহার করেছেন একাধিক প্রশ্নচিহ্ন! তা হলেই আর সেটাকে বয়ান বলা যাবে না!

sanju

কিছু মনে করবেন না রাজকুমার হিরানি, আপনার সাম্প্রতিক এই কাজটি নিয়ে লিখতে বসে আমিও কিছু প্রশ্নচিহ্ন লেখায় রাখতে বাধ্য হলাম!

 

আসলে ছবিটা দেখতে বসে অনেকগুলো প্রশ্ন পর পর জন্ম নিতে থাকে মাথার ভিতরে! যে ভাবে চিত্রনাট্যে উপস্থিত করা হল দত্তকে, বাস্তব জীবনে তিনি কি এতটাই অপরিণত একজন মানুষ? বা, প্রায় মানসিক ভাবে কিছুটা পিছিয়ে থাকা একজন?

 

এটা ঠিক যে, জেল খেটে বেরিয়ে আসার পরে সঞ্জয় দত্ত যে সাক্ষাৎকারগুলো দিয়েছেন, যে সাংবাদিক বৈঠকগুলো করেছেন, সেখানে তিনি বার বার বলেছেন কেবল একটাই কথা- “আমি আসলে মাথা দিয়ে ভাবি না! মন দিয়ে ভাবি- ম্যায় দিলওয়ালা আদমি হুঁ!”

 

কিন্তু মন দিয়ে ভাবা একজন মানুষ আর চূড়ান্ত অপরিণত মানুষ- এই দুইয়ের মধ্যে কি কোনো পার্থক্যই নেই?

 

ছবি দেখলে মনে হবে নেই! এই জায়গাটা সবার প্রথমে ছবি দেখতে গিয়ে বিরক্তি তৈরি করবে। যে সঞ্জয় দত্ত জেলে যাওয়ার পরে প্যারোলে বেরিয়ে এসে নিজের প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাওয়া নেতিবাচক ভাবমূর্তি নিয়ে ‘খলনায়ক’-এর মতো ছবি বলিউডকে উপহার দেন, তিনি কি অপরিণত হতে পারেন?

 

না কি যাঁকে বলিউড তো বটেই, পাশাপাশি সারা মুম্বই বাবা বলে মাথায় করে রাখে আন্তরিকতা এবং পরোপকারের জন্যে, তাঁকে অপরিণত তকমা দেওয়া যায়?

 

আক্ষেপের বিষয়, রাজকুমার হিরানি ছবিটা তৈরি করতে গিয়ে সে সব মাথাতেই রাখেননি! বলতে দ্বিধা নেই, তিনি কেবল ব্যবহার করে গিয়েছেন সঞ্জয় দত্তকে ঘিরে তৈরি হওয়া একাধিক বিতর্ককে। খুব সম্ভবত সে কারণেই যে দিন দত্ত জেল খেটে বেরোলেন, প্রণাম করলেন মাটি আর জাতীয় পতাকাকে, আর তার কিছু পরেই মুখোমুখি হলেন উত্তেজিত সাংবাদিকদের, সেই দিনেই তিনি শুটিং শুরু করেছিলেন ছবির!

সত্যি বলতে কী, হাতে একটু সময় নিয়ে ঠিক উপরের এই ভিডিওটা দেখুন! এটা এই জেল থেকে বেরিয়ে আসার পরে দত্তের সাংবাদিক বৈঠকের ফুটেজ! এখানে একজন সাংবাদিক প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছেন নায়কের দিকে- বায়োপিক তো তৈরি হচ্ছে, এর পরে কি বায়োগ্রাফির পালা? দত্ত সবিনয়ে জানাচ্ছেন, না এ রকম কোনো ইচ্ছা তাঁর নেই!

sanjay dutt

শুধু তাই নয়, চলতি বছরেই ইয়াসির উসমান নামে একজন একটি বায়োগ্রাফি লিখেছিলেন নায়কের। বইটির নাম দেওয়া হয়েছিল- সঞ্জয় দত্ত: দ্য ক্রেজি আনটোল্ড স্টোরি অব বলিউড’স ব্যাড বয়! যে নায়ক নিজের বায়োগ্রাফি প্রকাশের কোনো ইচ্ছাই রাখেন না, তিনি একটি মামলাও ঠুকবেন বলে মনস্থ করেছিলেন উসমানের বিরুদ্ধে। কারণ হিসাবে ঘনিষ্ঠ মহল জানিয়েছিল- বইটি নায়কের সঙ্গে কথা বলে এবং তাঁর অনুমতি নিয়ে লেখা হয়নি!

 

অথচ, হিরানির ছবির কেন্দ্রীয় বিষয় একটাই! শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বায়োগ্রাফি লেখানোর জন্য সঞ্জুর হ্যাংলামি! ছবি শুরুও হয় সে ভাবেই! বাথরুমে নিজের একটি বায়োগ্রাফির প্রথম কয়েক লাইন পড়ে মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে নায়কের! লেখা অযৌক্তিক বলে! যখন এ নিয়ে নায়ক রাগ করছেন, বই পুড়িয়ে দিচ্ছেন, তখন স্ত্রীকে বলতে শোনা যাচ্ছে- “এঁদের মতো লেখকদের কাছে যাচ্ছ কেন? ভালো কাউকে খোঁজো!” অত‌ঃ পর, সঞ্জু গেলেন ভিনদেশি লেখিকা উইনি ডিয়াজের কাছে! এবং প্রথমে টেররিস্ট ভেবে নিয়ে তাঁর বায়োগ্রাফি লিখতে অস্বীকার করলেও পরে রাজি হলেন উইনি! গল্প এগোতে থাকল, শেষে উইনির লেখা বায়োগ্রাফি হাতে নিয়ে জেল থেকে বেরনোর পর সঞ্জু যেন চাঁদ পেলেন!

 

এটার কি সত্যি খুব দরকার ছিল?

sanju

পাশাপাশি, আরেকটা প্রশ্নও না তুললেই নয়! এ কার বায়োপিক- সঞ্জয় দত্তের না সুনীল দত্তের?

 

সঞ্জয়ের জীবনে যে ভাবে শেষ দিন পর্যন্ত জড়িয়ে ছিলেন সুনীল দত্ত, তা উপেক্ষা করতে পারবেন না কেউই! কিন্তু একটা সময়ের পরে এ ছবি সুনীল দত্তেরই হয়ে গিয়েছে, সঞ্জয় দত্তের আর থাকেনি!

 

কারণটা একেবারেই খুব খারাপ লেখা একটা চিত্রনাট্য! হিরানি ঠিক করে উঠতে পারেননি সম্ভবত- তিনি ফোকাসে কী রাখবেন, কাকে রাখবেন আর কতটুকু রাখবেন! ফলে সঞ্জু দেখতে গিয়ে প্রথমে অস্বস্তি হবে, তার পর বিরক্ত লাগবে!

বিরক্তি বাড়বে, যখন মিলিয়ে নিয়ে দেখবেন, বিবিসি-র সঞ্জয় দত্তকে নিয়ে তৈরি তথ্যচিত্র, ‘টু হেল অ্যান্ড ব্যাক- ১৯৯৬’ থেকে বেশ কিছু দৃশ্য মোটা ভাবে টুকে দিয়েছেন পরিচালক! উপরের ভিডিওটা ওই তথ্যচিত্রেরই! পারলে সময় করে দেখবেন! হিরানির কাজের চেয়ে ঢের ভালো! আর পরে যদি ‘সঞ্জু’ দেখেন, দেখবেন, এই তথ্যচিত্রে যে ভাবে নায়কের বাসস্থান তুলে ধরা হয়েছে একেবারে শুরুতে, ঠিক সে ভাবেই ছবি শুরু করছেন হিরানিও! এমনকি, তথ্যচিত্রে যে ভাবে নায়ককে জিমে শরীরচর্চা করতে দেখা যাচ্ছে, হিরানিও ছবিতে ঠিক সেটাই অনুসরণ করেছেন!

কেন বলুন তো?

 

পাশাপাশি, যাঁরা নায়কের জীবনে খুব গুরুত্বপূর্ণ, সেই দুই বোনকেও স্রেফ পুতুল সাজিয়ে রেখে দিয়েছেন হিরানি। থাকতে হয়, তাই আছে! একজনের কোনো সংলাপই নেই, অন্যজনের স্রেফ একটিই সংলাপ! কেন এই ব্যাপারগুলো নিয়ে একটু ভাবলেন না আপনি হিরানি?

sanju

তার পর যেমন ধরুন, ‘রকি’-র শট দেওয়ার দৃশ্যটা! ওখানে এক জায়গায় দেখা যাচ্ছে, সঞ্জু ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে ভালোবাসার অভিনয় করতে পারছে না, তখন এক স্পটবয় একটা ফিল্ম ম্যাগাজিনের পাতা খুলে ধরল! সেখানে দেখা গেল হেমা মালিনীকে। তার পর একবার হাত ফসকে যাওয়ায় সে খেয়ালও করল না, যে ছবিটা ধরে রয়েছে, সেটা ‘শোলে’-র গব্বর সিংয়ের! কিন্তু, রকি যে সময়ে তৈরি হচ্ছে, তখনও কি ফিল্ম ম্যাগাজিনের পাতা জুড়ে এঁরা রয়েছেন? থাকলে সেটা কি ম্যাগাজিনের ‘শোলে’ স্পেশ্যাল সংখ্যা? তাই যদি হবে, তা হলে হেমা মালিনীর ছবিটা ‘ড্রিমগার্ল’-এর কেন?

 

তবে সব কিছুরই তো ভালো-খারাপ দুই দিকই থাকে! ‘সঞ্জু’-র ভালো বলতে যদি কিছু থেকে থাকে, তা হলে কেবল তা অভিনেতারা! অসম্ভব শক্তিশালী কিছু অভিনেতাদের ছবিতে এক জায়গায় রেখেছেন পরিচালক, শুধু সেটুকুর জোরেই ছবি দেখে নেওয়া যায়! এ ব্যাপারে রণবীর কাপুরের কথা খুব একটা কিছু বলার নেই! মানে, তা বলে বোঝানো যাবে না! গোটা ছবিটা প্রায় উনিই ঘাড়ে করে টেনে নিয়ে গিয়েছেন! দেখতে দেখতে বিভ্রমও হবে- সত্যিই সঞ্জয় দত্তকে দেখছি না তো?

 

আর পরেশ রাওয়ালের কথাও স্বীকার না করলে অন্যায় হবে! সুনীল দত্তের সঙ্গে ওঁর কোনো কিছুই মেলে না, তাও স্রেফ অভিনয়ের জোরে তিনি নিজেকে মন দিয়ে দেখতে বাধ্য করবেন দর্শকদের। এই দুই অভিনেতাই ছবির একমাত্র শক্তিশালী এবং সদর্থক জায়গা!

sanju

যদিও মণীষা কৈরালাকে নিয়ে কিছু বলার আছে! নার্গিসের চরিত্রে তিনি তুলনারহিত, রণবীরকে যেমন দত্তের মতোই দেখতে লেগেছে, মণীষাকেও তেমনই নার্গিসের মতোই! কিন্তু কোন নার্গিস? যাঁকে ছবিতে দেখলাম, তিনি আগাগোড়া ‘শ্রী ৪২০’ ছবির কপালে টিপ, কাঁধের এক পাশে পড়ে থাকা লম্বা বিনুনির নায়িকা! নার্গিসের বাস্তব জীবনে যে ছবিগুলো দেখা যায়, তার কোনোটাতেই তিনি ওই ভাবমূর্তিতে থাকতেন না! ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই শুরু করার অনেক আগে থেকেই চুলও কেটে ফেলেছিলেন ছোটো করে! তা হলে?

sanju

এই প্রশ্নগুলো শেষ হবে না! কিন্তু কমলেশ নামে সঞ্জুর বেস্ট ফ্রেন্ড ভিকি কৌশলকে নিয়ে কোনো প্রশ্নই তোলা যাবে না! বলতে দ্বিধা নেই, তিনি এই সময়ের প্রতিভাবান অভিনেতাদের মধ্যে একজন! ভিকিও সেই একজন, যাঁকে দেখার জন্যই ছবিটা দেখতে ইচ্ছা করবে!

 

 

সোনম, অনুষ্কা- গতানুগতিক! নেহাতই অতিথি-শিল্পী, ফলে ‘সাঁওয়ারিয়া’ বা ‘অ্যায় দিল হ্যায় মুশকিল’-এ রণবীরের সঙ্গে তাঁদের যে রসায়ন তৈরি হয়েছিল, তা মিলিয়ে নেওয়ার সুযোগ নেই, খোঁজাটাও অর্থহীন!

 

পাশাপাশি, দিয়া মির্জার কথা উল্লেখ না করলে অন্যায় হবে! ছোটো উপস্থিতি, কিন্তু দত্তের স্ত্রী মান্যতার চরিত্রে তিনি খুব ঠিকঠাক বাছাই! যদিও তাঁকে দেখানো হল নায়কের জীবনের অন্যতম অবলম্বন হিসাবে, তবুও তাঁর সঙ্গে বিয়ের ব্যাপারটাই ছবিতে এল না!

তা, না-ই বা এল! হিরানির ছবিতে যা আসা উচিত ছিল, তাও তো আর আসেনি! কাজেই এ নিয়ে আর আক্ষেপ বাড়িয়ে কী হবে!

 

আরেকটা প্রশ্নচিহ্নও উঠবে! সঞ্জয় দত্তকে নিয়মানুবর্তিতা শিখিয়েছেন তিনিই, ছবিতে হিরানির এই বক্তব্য সুনীল দত্তের বয়ানে না রাখলেই কি চলছিল না?

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here