প্রসেনজিৎ চক্রবর্তী

আমাদের এই অ্যাক নতুন। ওয়েব সিরিজ। অতএব নবমী নিশিতে অন্য সব হাতছানি এড়িয়ে নামিয়ে ফেলা গেল বহুল বিজ্ঞাপিত অ্যাপখানি। তারপর মা দুর্গার বিদায়পর্ব থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে ধাপে ধাপে দেখে ফেলা গেল রাইমা সেন, প্রিয়াঙ্কা সরকার, জয় সেনগুপ্ত অভিনীত ওয়েব সিরিজ ‘হ্যালো’।

বিছানায় শুয়ে হাতের মোবাইলে যা দেখে ফেলা যায়, তার রিভিউ হয় না। তবু যেহেতু এ সব বাঙালির কাছে নতুন, তাই আগামী ক’দিন খানিক আলোচনা করতে মন চায়। যতই হোক, নতুন বিনোদন মাধ্যমের ধীর শুরুয়াদ কি না। ধীরই বটে। প্রতিটি এপিসোড শুরুর আগে ডিসক্লেমার লেখা আসছে, এই ছবিতে ‘স্ট্রং’ সংলাপ, ভায়োলেন্স এবং ‘ম্যাচ্যুয়র’ দৃশ্যাবলী রয়েছে। কাকে, কেন সতর্ক করা হচ্ছে জানি না। হয়তো ওই খুদে খুদে ফন্টে লেখা বিশাল বিজ্ঞপ্তি পুরোটা পড়তে পারলে ইঙ্গিত পাওয়া যেত। কিন্তু চাপ নিলাম না।

এখন ব্যাপার হচ্ছে, জয় সেনগুপ্তর পরিবারের বাকিদের বয়স দেখে মনে হল, ওনার অভিনীত চরিত্রটির বয়স চল্লিশ-বিয়াল্লিশ মতো। সেক্ষেত্রে তাঁর মায়ের বয়স সাধারণ ভাবে ৬৫-র ধারেকাছে থাকার কথা (অন্তত যেমন বনেদি রক্ষণশীল পরিবার দেখানো হয়েছে)। কিন্তু এখানে যিনি অভিনয় করছেন, তাঁকে অনেক বেশি বয়সি মনে হয়েছে। ধরে নিতে হবে বিধবা চরিত্রটি একটু তাড়াতাড়ি বুড়িয়ে গেছেন। তা হোক, তা বলে চারটে ছেলেমেয়ে! মা দুর্গার মতন!! সরকারগুলোর পরিবার পরিকল্পনার প্রচার উত্তর কলকাতার পুরোনো পরিবারগুলোয় গত শতকের সত্তরের দশকের মাঝামাঝিতেও কোনো ছাপ ফেলতে পারেনি কি? জনগণ তাঁদের নিজের নিজের অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলিয়ে নেবেন।

আসলে এ সবই বাড়িতে পুজোর পরিবেশটা জমজমাট করার জন্য। এবং গল্পকে একমাত্রিক করার জন্য। যৌথ পরিবারের পুজো হলে সহজেই চরিত্র বাড়ানো যেত। সেটা বাস্তবসম্মতও হত। নানারকম গল্প তৈরির সুযোগ থাকত, প্রয়োজনও পড়ত। কিন্তু যিনি ভেবেছেন এবং যিনি পরিচালনা করেছেন, কেউই অত জটিলতার মধ্যে যেতে চাননি। ষষ্ঠী থেকে দশমীর মধ্যে গল্প শেষ। কিন্তু পুজোটা এই কাহিনিতে স্রেফ একটা প্রপ। পুজো না হলেও গল্পটা দিব্যি হতে পারত। তবে কি না, ২ ঘণ্টা ১৫ মিনিট ধরে টানা যেত না। হ্যাঁ, ৮টি এপিসোডে ছড়ানো এই ওয়েব সিরিজটির দৈর্ঘ্য এমনই।

বুঝতেই পারছেন, দর্শকদের আগ্রহ ধরে রেখে প্রতিটি এপিসোড শেষ করা এবং অতক্ষণ টেনে নিয়ে যাওয়া সহজ নয়। তার ওপর স্ট্রং সংলাপ, ম্যাচ্যুয়র দৃশ্য ও ভায়োলেন্সের আকর্ষণ যেখানে বিজ্ঞপ্তিতেই শুরু, সেখানেই শেষ। জয় ও প্রিয়াঙ্কার খোলা পিঠ বার কয়েক দেখা যায় বটে। কিন্তু সেটাও চিত্রনাট্যে প্রিয়াঙ্কার পিঠ অন্য কারণে খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলেই। শিরোনামে আধসেদ্ধ যৌনতা লিখলেও, বাস্তবে ততটা যৌনতাও দেখানো হয়নি হ্যালোতে। তবে হ্যাঁ, বিষয়টা যখন পরকীয়া, তখন একটা অ্যাডাল্ট-অ্যাডাল্ট গন্ধ তো থাকবেই।

কিন্তু সমস্যা হল, এই ওয়েব সিরিজটি থ্রিলার। রাইমার স্বামী জয় সেনগুপ্তর সঙ্গে প্রিয়াঙ্কার যৌনপ্রেমের সম্পর্ক ঘিরেই কাহিনির চলন। সেটা ঘিরেই নানা প্রশ্ন। সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গিয়ে গোটা ব্যাপারটা রাইমার কাছে থ্রিলারের মতো ঠেকলেও, দর্শক কিন্তু অনেক আগেই বিষয়টা টের পেয়ে যাবেন। শেষ এপিসোডের জন্য যে টুকু বাকি থাকবে, তার জন্য ২ ঘণ্টা ১৫ মিনিট খুব বেশি লোক হয়তো নষ্ট করতে চাইবেন না। পুজোর ছুটির বাজারে হাতে যতটা সময় থাকে, বাকি ৩৬০ দিন তো তা থাকে না।

চরিত্রগুলো মোটামুটি ঠিকঠাক সাজানো হলেও জয়ের মায়ের চরিত্রটি অসম্ভব একমাত্রিক এবং ভিলেনসদৃশ। তাঁর বোনের চরিত্রটিও তেমনই। এই ধরনের চরিত্র আজকাল মেগা সিরিয়াল ছাড়া সেভাবে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। তাঁদের আরও একটা ঠিকানা জুটে গেল। মূলত শিক্ষিত-নাগরিক দর্শকদের এই বিনোদন মাধ্যমে এমন চরিত্র কাজে আসবে তো?

প্রিয়াঙ্কার এতটাই ভালো অভিনয় করেন যে তাঁর সম্পর্কে বলার কিছুই থাকে না। জয় প্রত্যাশা মতোই দুর্বল। আগে তাঁর অভিনয় সেভাবে গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়নি। সম্প্রতি পরপর বিলু রাক্ষস ও হ্যালো দেখা হল। ‘যখন যেমন তখন তেমন’ টাইপের অভিনয় করেন জয়। মনে হয় চরিত্র, চিত্রনাট্য সম্পর্কে কোনো ধারণা ছাড়াই অভিনয় করছেন তিনি।

রাইমার সমস্যা ও অন্বেষণ নিয়েই এই কাহিনি। তাঁকে ধাওয়া করেই গল্প এগিয়েছে আটটি এপিসোড ধরে। অথচ তাঁর সমস্যা যেমন জটিল, বাড়িতে পুজোর হুলুস্থূলে রাইমাকে সেই পরিমাণে বিচলিত হওয়ার সুযোগ দেয়নি চিত্রনাট্য। চরিত্রটির চলনে ধারাবাহিকতার অভাব রয়েছে। অমন রক্ষণশীল সামন্ততান্ত্রিক পরিবারের বড়বৌ-এর বাপের বাড়িতে এমন জটিলতা থাকাটাও মানতে অসুবিধা হয়। তবু রাইমার অভিনয় এবং ঝলমলে উপস্থাপনা অনেক কিছুই ঢেকে দিয়েছে হ্যালোয়।

কিন্তু ওইটুকুই। ফুলটুস মস্তি বা রোম খাড়া করা বিনোদন, কিছুই জুটলো না হ্যালোয়। আগামীতে দেখা যাক।

উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য দিন !
আপনার নাম লিখুন