anirban chaudhury
অনির্বাণ চৌধুরী

“এই মঞ্চের পিছন দিকে রবীন্দ্র সদন নামে একটা জায়গা আছে, সেখানে বিচিত্র অনুষ্ঠান হয়! তার মঞ্চটা খুব অন্য রকম। আমরা যেমন মঞ্চ দেখে থাকি, ঠিক তার সমান পরিমাণ জায়গা রয়েছে ওই মঞ্চের ডানে আর বামে। যখন জানতে পারি, সতু সেন ওটা ওয়াগন স্টেজ হিসেবে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন, আমার ভীষণ কষ্ট হয়েছিল!” কেন, সে কারণটাও ব্যাখ্যা করে বলেছেন নাট্যকার দেবেশ চট্টোপাধ্যায়, ২৬ সেপ্টেম্বর শিশির মঞ্চে দাঁড়িয়ে। উপলক্ষ্য পশ্চিমবঙ্গ নাট্য আকাদেমি আয়োজিত সতু সেন স্মারক বক্তৃতা। সেই কারণ আদতে সেনের আপোসহীন স্বভাব, “পিডব্লিউডি-র এক কর্তার সঙ্গে কিছু একটা হওয়ায় সব কাগজপত্র ছিঁড়ে ফেলে চলে এসেছিলেন তিনি, বলেছিলেন- আমি কাজ না করে টাকা নিই না!”

satu sen

ভারতীয়, বিশেষ করে বাংলা নাট্যশিল্পের কারিগরি পথিকৃৎ সতু সেনের নাম আত্মঘাতী বাঙালির আপাতত মনে রাখার প্রয়োজন ফুরিয়েছে। কিন্তু তিনি না থাকলে যে বাংলা নাটক আজকের জায়গায় আসত না, পেত না তিন ঘণ্টার মাপা অবয়ব, মঞ্চে রইত না মুড লাইট বলে কোনো কিছুর অস্তিত্ব- সে কথা স্বীকার না করলেই নয়! “আমরা যে এক্সপেরিমেন্টগুলো করি নাটক নিয়ে, অন্তত করার চেষ্টা করি আর কী, তার সঙ্গেও জুড়ে রয়েছেন সতু সেন”, নির্দ্বিধায় ঋণস্বীকার করেছেন বক্তব্যে এই প্রজন্মের নাট্যকার পূর্বসূরীর কাছে, সেনের পুত্র পার্থ সেন এবং অন্য পরিজনদের উপস্থিতিতে।

satu sen

সংক্ষেপে বললে, সতু সেন (৭ই জুন ১৯০২ সাল – ৭ই অগস্ট ১৯৭১ সাল) বিংশ শতাব্দীর তিনের দশকে বাংলা রঙ্গালয়ে মঞ্চ নির্মাণ ও আলোক প্রয়োগকলার ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের পুরোধা। সুদীর্ঘ ৫৯ বছর ধরে বঙ্গ রঙ্গমঞ্চের মঞ্চরীতি ও আলোক সম্পাতের যে ব্যবস্থা ছিল, বিদেশ থেকে শিক্ষালাভ করে দেশে ফিরে এসে সতু সেন তার আমূল পরিবর্তন করেন। এর পাশাপাশি নাট্য নির্দেশক এবং চলচ্চিত্র পরিচালক হিসেবেও তিনি খ্যাতি লাভ করেন। তাঁর পরিচালিত নাটকগুলোর মধ্যে ‘পথের সাথী’, ‘দুই পুরুষ ’, ‘কামাল আতাতুর্ক’, ‘পথের দাবী’ বিশেষ প্রশংসিত হয়েছিল। ১৯৩৩ সালে ‘রঙমহল’ থিয়েটারে ভারতের প্রথম ঘূর্ণায়মান মঞ্চ নির্মাণ করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। এবং ‘মহানিশা’ নাটকটি পরিচালনার মধ্য দিয়ে বাংলা তথা ভারতীয় নাটকের ইতিহাসে এক মাইলফলক প্রতিষ্ঠা করেন। চলচ্চিত্র পরিচালক হিসেবে ১৯৩৬ সালে ‘পন্ডিত মশাই’, ১৯৩৮-এ ‘চোখের বালি’ উল্লেখযোগ্যতার দাবি রাখে। ১৯৩১ থেকে ১৯৫৭ সালের মধ্যে তিনি রঙমহল, নাট্যনিকেতন, নাট্যভারতী, মিনার্ভা, স্টার, নিউ এম্পায়ার, করিন্থিয়ান প্রভৃতি রঙ্গমঞ্চে ধারাবাহিকভাবে সুনামের সঙ্গে কাজ করে যান। এরপর ১৯৫৬ থেকে ১৯৫৮ তিনি পশ্চিমবঙ্গ সঙ্গীত নৃত্য নাটক আকাদেমির অধ্যাপক ছিলেন। ১৯৫৮ থেকে ১৯৬০ পর্যন্ত তিনি ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামা ও এশিয়ান থিয়েটারের ডিরেক্টর হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন।

satu sen

প্রশ্ন উঠতে পারে, এ হেন মানুষটিকে নিয়ে কথা বলার জায়গায় এই সন্ধ্যা কেন বেছে নিল দেবেশ চট্টোপাধ্যায়ের মতো অনেক পরের প্রজন্মকে? একটা কারণ নিঃসন্দেহে সতু সেনকে নিয়ে দেবেশের দীর্ঘ কাজের অভিজ্ঞতা, তাঁকে এবং তাঁর লেখা নিয়ে পত্রিকা প্রকাশ থেকে শুরু করে তথ্যচিত্র পরিচালনা পর্যন্ত যার বিস্তৃতি। পাশাপাশি, খেইটি অনুষ্টানের শুরুতে ধরিয়ে দিয়েছেন সভামুখ্য নাট্যকার অদ্রিজা দাশগুপ্ত। অদ্রিজার বক্তব্য মতো, যিনি ‘ভরদুপুরের আকাশকে অ্যাম্বার রঙের লেন্স পরিয়ে রহস্যময় করে তোলেন’, যাঁর কাজ ‘সাঁওতালের কালো মসৃণ এবং পেশিবহুল পিঠের মতো’, তিনিই যোগ্য উত্তরসূরী! “তাই আমি অনুরোধ করব দেবেশকে, তিনি যেন তাঁর গবেষণালব্ধ জ্ঞান আমাদের সঙ্গে ভাগ করে নিয়ে যান”, বলেছেন অদ্রিজা।

satu sen

অনুষ্ঠানের শুরুতেই জানিয়ে দিয়েছিলেন পশ্চিমবঙ্গ নাট্য আকাদেমির প্রশাসনিক আধিকারিক বরুণ সাহা- তাঁরা প্রতি বছর নানা স্মারক বক্তৃতার আয়োজন করে থাকেন। এ বছর যার মধ্যে, লেখাই বাহুল্য, বিশিষ্ট জায়গা নিয়ে থাকবে সতু সেন স্মারক বক্তৃতা। “আমি নিজে যখন নাট্য আকাদেমির সদস্য ছিলাম, তখন এমন অনুষ্ঠান হয়নি, চেয়েও পাইনি”, জানিয়েছেন দেবেশ। অনুষ্ঠানের শেষে তাঁর হাতে স্মারক নিয়ে সম্মান লাভ করেন দেবেশ। আমাদের লাভ? দেবেশের সতু সেনকে নিয়ে তথ্যচিত্র আর রাজডাঙা দ্যোতক-এর পিলসুজ নাটকের পাশাপাশি কিছুটা মনখারাপ তো বটেই! এ হেন মানুষটির স্মৃতিধন্য রঙ্গালয় হোক বা ঘূর্ণায়মান মঞ্চ- কিছুই ধরে রাখতে পারেনি এই শহর! তার দায় কে নেবে?

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য দিন !
আপনার নাম লিখুন