anirban chaudhury
অনির্বাণ চৌধুরী

ত্রয়োদশ শতক। জাপানের সাধক নিচিরেন আবিষ্কার করেছিলেন, অশান্ত বিশ্বের কালো মেঘে ছেয়ে গিয়েছে বুদ্ধের শান্তির আর মৈত্রীর বাণীর আলো। কিন্তু হতাশ হয়ে হাল ছেড়ে দেননি তিনি। বরং, করুণাবতারের পাথেয়কে সম্বল করে ব্রতী হয়েছিলেন মানবমোক্ষের প্রচেষ্টায়।

পরবর্তী কালে সেই নিচিরেনের উদ্যোগকে সামনে রেখেই জন্ম নেয় শান্তিকামী সংগঠন ‘সোকা গাকাই’। তিন প্রাণপুরুষ- সুনেসাবুরো মাকিগুচি, জোসেই তোদা এবং দাইসাকু ইকেদার অক্লান্ত শ্রমে যা বিশ্বশান্তির লক্ষ্যে প্রাণপাত করে চলেছে। শুধু তাই নয়, প্রতিষ্ঠানের প্রেসিডেন্ট ইকেদা প্রতি বছর শান্তি ও মানবজীবনের নিরাপত্তার লক্ষ্যে একটি করে শান্তিপ্রস্তাব পেশ করে চলেছেন রাষ্ট্রপুঞ্জের কাছে। শিক্ষার যথাযথ প্রসার, পরমাণু অস্ত্রমুক্ত পৃথিবী এবং যুবসমাজের সহযোগিতাই যে এই দুরূহ কাজ সমাধা করতে পারে, সে কথা প্রতি মুহূর্তে বিশ্বকে মনে করিয়ে দিতে চান ইকেদা।

সব মিলিয়ে মোট ৩৬টি শান্তিপ্রস্তাব এ যাবৎ পেশ করেছেন ইকেদা। কেন না, বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার কাজটি মোটেই সহজ নয়। প্রতি বছর নতুন করে যে সব সমস্যার সম্মুখীন হয়ে অশান্ত হয়ে ওঠে পৃথিবী, তার সঙ্গে তাল রেখেই বদলে নিতে হয় দৃষ্টিভঙ্গীও। প্রেসিডেন্ট ইকেদার সেই মানসিকতার দিকে লক্ষ্য রেখেই এ বছর কলকাতার সায়েন্স সিটি প্রেক্ষাগৃহে একটি মনোজ্ঞ সভার আয়োজন করেছিল সংগঠনের ভারতীয় শাখা ‘ভারত সোকা গাকাই’।

bharat soka gakkai

কী ভাবে শান্তির পথে পা রাখা যায়, শুক্রবারের সান্ধ্যসভায় সে কথাই জানালেন ‘ভারত সোকা গাকাই’-এর চেয়ারপার্সন বিশেষ গুপ্তা, চলচ্চিত্র পরিচালক সুমন মুখোপাধ্যায়, নৃত্যশিল্পী ও সমাজসেবী অলকনন্দা রায়, অ্যাডিশনাল ডিরেক্টর জেনারেল এবং ইন্সপেক্টর অব পুলিশ ড. বি এন রমেশ, ভারত সরকারের প্রাক্তন সাংস্কৃতিক সচিব জহর সরকার এবং সংগঠনের ডিরেক্টর ও বহির্সম্পর্কীয় বিভাগীয় প্রধান রাশি আহুজা।

অনুষ্ঠানের শুরুতে একটি স্বল্পদৈর্ঘ্যের তথ্যচিত্র পরিবেশনের পর বিশেষ গুপ্তা সংগঠনের লক্ষ্য এবং তা পূর্তির জন্য কী ভাবে কাজ করে চলেছে ‘ভারত সোকা গাকাই’, তা স্পষ্ট করে দিলেন। তার পরেই সুমন মুখোপাধ্যায় জানালেন, শিল্প কী ভাবে শান্তির পথটি তৈরি করে দেয় একক ব্যক্তির অন্ত‌ঃকরণে। আসলে শিল্পই সেই আলো যার রূপায়ণ মনে এক অপার্থিব আনন্দ নিয়ে আসে। সেই আনন্দের কাছে তুচ্ছ হয়ে যায় ব্যক্তিগত ক্ষুদ্র স্বার্থ। আর তার থেকেই উৎসারিত হয় পরম শান্তি। সুমন জানালেন, এ ভাবেই তিনি বিশ্বের শান্তির লক্ষ্যে নিজের কাজ করে চলেছেন ছায়াছবিতে, নাটকে; এবং সেই লক্ষ্যে তিনি অবিচল থাকবেন আজীবন।

এর পরেই অলকনন্দা রায় জানাতে ভুললেন না, শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য ক্ষমাশীল হওয়াও কতটা প্রয়োজন! তিনি অনেক বছর ধরে কাজ করে চলেছেন সংশোধনাগারের বন্দিদের নিয়ে। তাই ক্ষমা করতে পারলে দাতা এবং গ্রহীতা- উভয় পক্ষই কী ভাবে উপকৃত হয়, খুঁজে পায় শান্তি, তা স্পষ্ট জানালেন তিনি। পাশাপাশি জানাতে ভুললেন না, লিঙ্গবৈষম্য যদি মুছে দেওয়া না যায়, তা হলে শান্তির লক্ষ্যে অবিচল থাকা সম্ভব নয়। অন্যথায়, প্রতি মুহূর্তে, সমাজে, পরিবারে বিঘ্নিত হতেই থাকবে শান্তির সুরটি!

bharat soka gakkai

অলকনন্দার বক্তব্যেরই প্রতিধ্বনি ধরা দিল ড. বি এন রমেশের কণ্ঠেও। স্পষ্ট জানালেন তিনি কাশ্মীর সমস্যাকে সামনে রেখে- রাষ্ট্র প্রতি মুহূর্তে কী ভাবে শান্তিস্থাপনে ব্রতী রয়েছে! তাঁর বক্তব্য আমাদের জানাল- কাশ্মীরের সন্ত্রাসবাদীদের কী ভাবে শান্তির পথে এনে দেশের প্রতি কর্তব্যশীল করে তোলা হচ্ছে! জানাতে ভুললেন না, সেনাদের উপরে পাথর ছোড়া ছেলেদের কী ভাবে প্রশিক্ষণ দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে সেনাবাহিনীর সদস্যে। পরিণামে যা শান্তিস্থাপনের পথটি প্রসারিত করছে প্রতি নিয়তই!

অন্য দিকে, জহর সরকার নানা উদাহরণের মধ্যে দিয়ে স্পষ্ট করে দিলেন- যে কোনো সময়ে, পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তে, অসুখী এবং অশান্ত পরিবেশে বাস করতে চান না কেউই! মানুষের উপরে যে তাঁর আস্থা হারায়নি, মানুষের বিবেকের কাছে তিনি যে ঋণী, সে কথা স্বীকার করে নিলেন সোচ্চারে।

সব শেষে, রাশি আহুজার ধন্যবাদজ্ঞাপন ‘ভারত সোকা গাকাই’-এর আন্তরিকতাকেই আরও স্পষ্ট করে তুলল। যে সংগঠনের স্বেচ্ছাসেবীরা প্রেক্ষাগৃহে প্রবেশের সময়ে অক্লান্ত এবং স্বতস্ফূর্ত করতালিতে অভিবাদন জানান আগন্তুকদের, পাশাপাশি অনুষ্ঠান শেষ হলে জনে জনে জ্ঞাপন করেন ধন্যবাদ, তার মূল সুরটিই ধ্বনিত হল রাশির কথায়।

যা বুঝিয়ে দিল, মানুষকে আপন করে নিতে পারলেই শান্তি আপসে প্রতিষ্ঠা হয় ঘরে এবং বাইরে!

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here