chhotonছোটন দত্ত গুপ্ত

ভোগ সর্বস্ব যুগে প্রাপ্তির দাড়িপাল্লা কি সম্পর্কের অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে! মস্তিষ্কের মধ্যে কি সব সময় আত্মপ্রাপ্তির ভিত মজবুত হচ্ছে! সেই থেকেই কি দ্বন্দ্বের শুরু! প্রকৃত দ্বন্দ্ব কিন্তু মানুষের সম্পর্কের দৃঢ়তা আনে, সুস্থতা তৈরি করে। প্রাপ্তির দ্বন্দ্ব বিভেদ তৈরি করবেই – এই বিচ্ছিন্ন সম্পর্কের টানা-পোড়েন নিয়েই ‘বেহালা বাতায়ন’-এর নতুন প্রযোজনা ‘অবয়ব’। নাটকে শৌনক (সাহেব ভট্টাচার্য) ও অনুভার (সোহিনী সরকার) সম্পর্ক শুরুর দিকে প্রাকৃতিক নিয়মেই জমে উঠেছিল। ‘আলাপের আদিতে থাকে নাম’ তার পর যুগলের পারস্পরিক প্রেরণার স্থানে (মিলনের সময়) নেতিবাচক কিছুই থাকে না – প্রথমদিকে শুধু হ্যাঁ হ্যাঁ হ্যাঁ আর হ্যাঁ, এটা চলে প্রতিষ্ঠান শুরুর আগে পর্যন্ত। সংসার একটা প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠান হলেই তার কিছু নিয়মানুবর্তিতা তৈরি হয়। তা মানতেও হয়। নিয়মের রীতি মনে হতে থাকে নেতিবাচক। আর এইখান থেকেই গণ্ডগোলটা শুরু। ‘অবয়ব’ নাটকে শৌনক (সাহেব ভট্টাচার্য) ও অনুভার (সোহিনী সরকার) সম্পর্কের জটিল কিছু প্রশ্ন পরিচালক নবকুমার ব্যানার্জি নতুন আঙ্গিকে তুলে ধরেছেন। নাট্যকার কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায় এই নাটকে মূল্যবোধকে নতুন করে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়েছেন।

abayab-pix-2

শহুরে দাম্পত্য ভাঙনে এখানে শৌনকের শিল্পবোধ চাপা পড়ে যায় প্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতির জন্য। শৌনক সততার কথা, দর্শনের কথা বলেছে, বাহ্যিক চাটুকার ও অসৎ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করছে কিন্তু মনের মধ্যে নিজের অজান্তেই সেই প্রতিষ্ঠানের কাছে নিজের শিল্প মূল্যায়নের জন্য প্রতীক্ষায় বসে থেকেছে। শিল্পী কাজ করেন নিজের ভাবনার জ্বালা থেকে, প্রকৃতির সঙ্গে মিলতে নাইবা নাম বেরোলো বাজারি পত্রিকায়, কোম্পানি লাথি মারল তাতে শিল্পীর কি এসে যায়! খাজুরাহো বা কোনারকের শিল্পীদের কি কেউ নাম জানে! কিন্তু তা হাজার বছর বেঁচে আছে – বেঁচে থাকবে। এই সুস্থ চর্চা করতে না পারলেই চারদিক অন্ধকার লাগে, ভেঙ্গে যায়। অনুভাও তাঁর নিজের জগতে বিচরণ করে – সেও চলমান সমাজ ভাবনায় চলে আবার সংসার গড়তেও চায়। তাই নিয়েই এই নাটক। সাহেব ও সোহিনী বুঝিয়ে দিয়েছেন মঞ্চেও তাঁরা সমান দক্ষ। তাঁরা শুধু ভালো ছবির চরিত্রেই সীমাবদ্ধ নয়, থিয়েটারেও চলচ্চিত্রের মতো সমান পারদর্শী।

শৌনকের বন্ধু মনীষ (অভিজিৎ লাহিড়ী) চরিত্রের সঙ্গে বেশ সাবলীল। লেখকের চরিত্রে অগ্নিভ (শ্রীদীপ চট্টোপাধ্যায়) ও লেখকের স্ত্রী ইষার (প্রিয়াঙ্কা মণ্ডল) মাধ্যমে নাটককে মঞ্চ থেকে বাস্তবের দরজায় নিয়ে আসার ভাবনার জন্য নির্দেশককে স্যালুট করতে হবে, প্রসেনিয়াম থিয়েটরের দেওয়াল কোথাও ভেঙে যায়।

অন্য মানুষের চরিত্রে পরিচালকের অভিনয় বেশ। তবে লেখকের স্ত্রী ইষার অভিনয়ের মধ্যে একটু জড়তা আছে। সংলাপ বলা ও শোনার সময়ে হাতের অভিনয় অসাড়, কোথায় রাখবেন বুঝতে পারেন না। নাটকের প্রথম দিকে স্পিরিটের একটু অভাব। নাটক আরেকটু টাইট হলে ভালো। আলো এবং দৃশ্য পরিবর্তনের সময় নিয়েও ভাবা উচিত, সম্পর্ক কী, কেন ঠুনকো কারণে সম্পর্ক ভাঙে – এ সব দেখতে ‘অবয়ব’ নাটক দেখা প্রয়োজন। এই সময়ে দাঁড়িয়ে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক এই প্রযোজনা।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here