sumitraসুমিত্র বন্দ্যোপাধ্যায়

বাঙালি দর্শকের পছন্দের তালিকায় জনপ্রিয় নাট্যকারদের যদি খোঁজ করা হয় তা হলে তালিকার শীর্ষে থাকবেন যিনি, তিনি শেক্সপিয়ার। সাম্প্রতিককালে তাঁর জনপ্রিয়তা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই সাগরের পারের শেক্সপিয়ার অনুবাদে-রূপান্তরে হয়ে উঠেছেন বাঙালির ঘরের মানুষ, আপনজন শেক্ষপির। অনেক সময় দেখা যাচ্ছে তাঁর একই নাটকের একাধিক বঙ্গায়ন প্রযোজনা করেছেন বিভিন্ন নাট্যদল। এই সমস্ত নাট্যকর্মগুলোর সবকটিই সমান আকর্ষণীয় হয়ত নয় কিন্তু প্রযোজনা সংবাদ পাওয়া মাত্র দর্শকের আগ্রহ সৃষ্টিতে সক্ষম। সম্প্রতি ‘ব্যাঙ্ক-ভার্স’ নাট্যদল রাজা ভট্টাচার্য দ্বারা রূপান্তরিত নির্দেশিত শেক্সপিয়ারের ‘এ মিড সামার নাইটস ড্রিম’ বাংলায় করলেন ‘বসন্ত এসে গেছে’ নাম দিয়ে । প্রযোজনাটি ভিড়ের মাঝে হারিয়ে যাওয়া আরও একটি শেক্সপিয়ার নাট্য নয় বরং নিজস্ব মহিমায় উজ্জ্বল।

শিশুরা বা কিশোর অভিনেতারা শেক্সপিয়ারের নাটক করেছেন এমন ঘটনা দেখা যায় না তা নয়। বিশেষ করে ইংরাজি মাধ্যম স্কুলগুলোর অনুষ্ঠানে মাঝে মাঝেই এই দৃশ্য দেখা যায়। কিন্তু নিয়মিত গ্রুপ থিয়েটারে বড়োদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সমান তালে বিভিন্ন চরিত্রে বিশেষ দক্ষতার সঙ্গে নাচগান-সহ ছোটোরা অভিনয় করেছ এ ঘটনা নিতান্তই বিরল। কলকাতার শেক্সপিয়ার চর্চায় এ দৃষ্টান্ত আছে বলে জানা নেই। সেই দিক থেকে এই নাটক বিশেষ ভাবেই উল্লেখযোগ্য। প্রযোজনাটি অভিনয়ের সময় মূল নাটকের থেকে অনেক কাটছাঁট করে এক ঘণ্টার সামান্য কিছু বেশি করা হয়েছে। তবে তাতে নাট্যরস বিশেষ ক্ষুণ্ণ হয়নি। গযারিকের মতো বিশ্বখ্যাত নাট্যজনও তাঁর প্রযোজনায় শুধু পরীস্থানের গল্পে অভিনয় করতেন বলে পণ্ডিতদের লেখা থেকে জানা যায়। নাটকের সংলাপে যুক্ত হয়েছে বিজ্ঞাপনের ভাষা। চলনে জনপ্রিয় হিন্দি চলচ্চিত্রের প্রভাব। আবার কোথাও কোথাও প্যারোডি ধাঁচের চেনা গান। তবে রাজার জনপ্রিয় প্রযোজনাগুলো যাঁরা দেখেছেন তাঁরা এ সবের সঙ্গে পরিচিত। ধ্রুপদী ভাবনার সঙ্গে বাজার চলতি উপাদানের মেলবন্ধন ঘটানো ও তাঁকে উপভোগ্য করে তোলার কাজটি চমৎকার করেছেন পরিচালক এবং করেছেন শিল্পগুণ অক্ষুণ্ণ রেখেই।

basanta-ese-gachhe-2

বিচিত্র সব ঘটনায় উদ্ভট রসে পরিপূর্ণ। এই নাটককে অভিনয়ের মধ্যে দিয়ে সার্থক নাট্য ভাষায় রূপান্তরিত করতে হলে দরকার পড়ে সহযোগী উপাদান সমূহের সাহায্য। সেক্ষেত্রে এই নাটকের মঞ্চসামগ্রী (অরুণ মণ্ডল), আলো (সুদীপ সান্যাল), পোশাক (সুদেষ্ণা চক্রবর্তী) ও নৃত্য পরিকল্পনা (রেশমি চাকি) বিশেষ সহায়ক হয়েছে নাটকের জমাটি ভাবটাকে প্রকাশ করতে। বর্ণময় পোশাক, কমেডির উজ্জ্বল আবহাওয়াকে পরিস্ফূট করে। বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ এই নাটকের সংগীত, যা প্রায় গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হয়ে উঠেছে। শিশু অভিনেতারা ‘লাইভ’ যন্ত্রের সঙ্গে নাচ-গান-অভিনয়ের যে বিশেষ প্রশিক্ষণ নিয়েছেন তা বোঝা যায়, যেমন বোঝা যায় যন্ত্রীদের দক্ষতাও। নীলাঞ্জন রায়চৌধুরীর হারমোনিয়াম যেন কথা বলে, বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রে অজয় ভট্টাচার্য ও প্রদীপ সাহাও খুব জীবন্ত। শুধু অভিনেতাদের সঙ্গে কথোপকথনে যন্ত্রীরা আরও বলিষ্ঠ হতে পারেন। কিছু কিছু ক্ষেত্রে গানের ও যন্ত্রের ‘ভল্যুম’ সামান্য কম লাগে।

basanta-ese-gachhe-1

নাট্যের সব আয়োজন অপূর্ণ থেকে যায় অভিনয় স্পর্শ না করলে কিন্তু এই নাটকের কুশীলবরা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রবল ভাবে সচেষ্ট থেকেছেন বসন্ত আগমনের বার্তা দিতে। রানি মায়ার চরিত্রে মন্দিরা বন্দ্যোপাধ্যায় চমৎকার অভিনয় ক্ষমতার প্রদর্শন করেছেন। বাঙলা নাটকে তিনি আরও অনেক বেশি ও গুরুত্বপূর্ণ অভিনয় করার শক্তি রাখেন, ভ্রাম্যমান যাত্রাদলের অধিকারীর চরিত্রে ভালো লাগে কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে। রাজা ফড়িং-এর চরিত্রে অভিষেক লাহিড়ির শারীরিক অভিনয়, অঙ্গ সঞ্চালনা চমৎকার। বাচিক অভিনয়টা আরও আয়ত্ত্বে এলে অচিরেই আকর্ষণের কেন্দ্রে চলে আসবেন তিনি। চমকে দিয়েছেন পটাশ চরিত্রে ক্ষুদে অভিনেতা শ্যামন্তক সেন ও বসন্ত চরিত্রে সৌরিশ ধর। অভিনয় চর্চার সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারলে দু’ জনেরই ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল। তবে নাটকের শুরুর আগে অর্থাৎ মূল গল্পে প্রবেশের আগে ভ্রাম্যমান অভিনয় দলের অংশটা আরও সংক্ষিপ্ত হলে হয়ত আকর্ষণীয় লাগবে। গ্রন্থনা (এলো), শ্রীতমা (মেলো), ঋদ্ধিমান (হাপুস), আদিত্য (হুপুস), মোহক (মাকর), স্মরণ্য (পুঁটি), ঋত্ত্বিক (ঝিঁঝিঁ), সমৃদ্ধ (গুবরে)-র মতো এক ঝাঁক কচিকাঁচাদের মঞ্চময় দাপিয়ে বেড়ানো নাটকে আলাদা প্রাণসঞ্চার করে। নির্দেশক রাজা ভট্টাচার্য সূত্রধরের সামান্য পরিসরে নিজেকে আটকে না রেখে আরও বড় অভিনয়ের কথা ভাবতে পারেন।

নাটকের সংলাপ অনেকসময়েই ছন্দ নির্ভর। দীর্ঘ ছন্দময় সংলাপ বলে দর্শককে আকর্ষণ করা অত্যন্ত দুরূহ কাজ। অভিনেতারা খেটেছেন। কিন্তু পরিচালক কোথাও কোথাও সরল কথ্যভাষা প্রয়োগ করলে শ্রুতিমধুর হয়। কিছু কিছু চরিত্রে জনপ্রিয় অভিনেতার ম্যানারিজম ‘গিমিকের’ মতো লাগে। শিশু অভিনেতাদের ক্ষেত্রে তা না হলে কেমন হতো? শেষে অভিমান বাঙলা নাটকের দর্শকদের প্রতি, বাচ্চা-বড়োয় মিলে বসন্তের এমন আহ্বানে তারা সাড়া দিচ্ছেন না কেন? তবে কি স্টার ভ্যালুই দর্শক সংখ্যা বাড়ায়? প্রযোজনা নয়?

ছবি: ব্ল্যাঙ্ক ভার্সের সৌজন্যে

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here