মধুমন্তী চট্টোপাধ্যায়

নামী প্রযোজনার লোভ সামলে বহুদিন পর এমন নাটক দেখতে যাওয়া, যার নাম ছাপার অক্ষরে দেখিনি। শুনেছিলাম মাত্র একজন পরিচিতের কাছেই। নামটা মনে ছিল,মনে রাখার মতো বলেই। সৈয়দ শামসুল হকের উপন্যাস অবলম্বনে একই নামে একুশ শতকের প্রযোজনা ‘বুকঝিম এক ভালোবাসা’। নির্দেশনায় শ্রমণ চট্টোপাধ্যায়। অভিনয়েও শ্রমণই এবং প্রায় একক অভিনয়। নাটক চলাকালীন ভাবতে বারবার লজ্জা হয়েছে, গত একবছর ধরে শহরে এমন একটা নাটক মঞ্চস্থ হয়েছে, অথচ আমরা জানিনা, জানার তাড়নাটাও বড়ো কম। আবার প্রচারের আলোয় থাকা নাটক নিয়ে এই আমাদেরই কত মাতামাতি।
বুক ভরা গান আর ভালবাসা দিয়ে তৈরি মনসুর বয়াতির জীবনের কথাই বলেছে এই নাটক। ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে তার বয়াতি যাপন। জীবনটাও নদীর মতোই। মনসুরের গলা স্বাধীন, গান স্বাধীন, তাঁর পথ স্বাধীন। মন, গলা, আর প্রাণের চেয়েও প্রিয় সারিন্দা এক সুরে না বাজলে গাইবে কী ভাবে মনসুর? সুরের ওপর কারো হুকুম চলেনি কোনোদিন। চাঁদ সুলতানা আর মনসুর বয়াতির ভালবাসাবাসি মানতে পারেনি চাঁদের জমিদার ভাই মহব্বত জঙ্গ। মৃত্যু বরং মিলিয়ে দিয়েছে ওদের।
৫০০ বছর আগের, ব্রহ্মপুত্রকে যখন যমুনা বলে ডাকেনি কেউ, সেই সময়কার কোনও এক মনসুর বয়াতির জীবনগাথা শুনতে গিয়ে মনে হল, সেই কবে থেকে চিনি তাঁকে, তাঁর সুরকে, শিল্পীমনকে। এ জীবন তো চিরকালীন। বিষয়ের গভীরে সমকাল খোঁজার প্রাণপণ চেষ্টা তো কই, করতে হল না একবারও। ২ ঘণ্টার নাটকের চলন ভারী সহজ। এক একটা গান যেন নাটকের এক একটা চরিত্র। যন্ত্র নয়, মনসুরের যন্ত্রণা থেকে উঠে আসা সুর মন ভারী করেছে প্রতিবার। দরদ ঢেলে বড়ো আদর করে আবহ রচনা করেছেন শুভদীপ গুহ।


বুকঝিম এক ভালোবাসা এমন এক উপস্থাপনা, যেখানে সংলাপ, অভিনয়, সুর, আলো মঞ্চ কেউ কারোর থেকে আলাদা নয়। একসাথে সবাই মিলে যেন বেধে রেখেছে বয়াতির আপসহীন বেঁচে থাকার কাহিনীকে। আর শ্রমণ? টানা ১০০ মিনিট মঞ্চের ওপর মনসুরের বয়াতি জীবন ফুটিয়ে তুলতে যা যা করলেন শ্রমণ, তাকে অভিনয় বলে না। ওটা একটা লড়াই। যে লড়াই লড়েছে মনসুর। লড়েছেন শামসুল হক। এবং আজকের সময়ে দাঁড়িয়ে লড়ছেন শ্রমণ আর তাঁর দল। প্রতি সংলাপ উচ্চারণে, অভিব্যাক্তিতে, মঞ্চ উপস্থিতিতে তরুণ পরিচালক-অভিনেতা মনে করিয়ে দিলেন ভুলতে বসা সেই কথাটা- থিয়েটার একটা বিশ্বাসের নাম।
চাঁদ আর তাঁর ভালোবাসার মনসুর ভেসে যাচ্ছে ব্রহ্মপুত্রের জলে। দূর থেকে ভেসে আসে, “…এই পানি যায়, ভেসে যায়…ডুবে যায় দরিয়ায়”। কী করুণ সে সুর। “… স্রোতের টানে ভাসে গান ও গায়ক, প্রেম ও বিচ্ছেদ, মৃত্যু ও মিলন ভাসে, ভেসে যায়, খরস্রোতে সকলই তো দরিয়ার দিকে ভেসে যায়।” মঞ্চের এদিকে তখন বুকঝিম করা সারি সারি মন।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here