চাপা পড়া স্বপ্নের গল্প – ‘শমীবৃক্ষ’

0
520

sumitraসুমিত্র বন্দ্যোপাধ্যায়

প্রত্যেক মানুষের বুকের গভীরে মনের মধ্যে একটা স্বপ্ন থাকে। অসম্ভবের স্বপ্ন, বড়ো কিছু করার, অনতিক্রমণীয়কে অতিক্রমের। সবাই চায় মনের ইচ্ছেডানাকে মেলে ধরতে, কিন্তু যা মানুষ হতে চায় জীবনে এবং শেষ পর্যন্ত সে যা হতে পারে এই দু’য়ের মধ্যে ব্যবধানটা ক্রমশ দীর্ঘ হতে হতে এক সময় চলে যায় পরস্পরের দৃষ্টি সীমানার বাইরে। দৈনন্দিন গেরস্থালি ও রুটি-রুজির সংস্থান করতে করতে, নিজের অজান্তেই ছাই চাপা পড়তে শুরু করে শৈশব থেকে লালিত স্বপ্নদের শরীরে। নিভে যায় তাদের অনলপ্রভা। যদি এই নিভে যাওয়াটাকে কেউ স্বীকার করতে না চায়, অমলকান্তির মতো রোদ্দুর হয়ে ওঠার স্বপ্নই দেখে যায়, তখনই সেই মানুষটা আর তার পারিপার্শ্বিককে ঘিরে দেখা দেয় সঙ্কট। এই সঙ্কটকে ঘিরেই মোহিত চট্টোপাধ্যায় রচনা করেছিলেন তাঁর নাটক ‘শমীবৃক্ষ’। সম্প্রতি যার প্রযোজনা করেছেন ‘কলকাতা প্লেমেকার্স’ নাট্যদল, রাম মুখোপাধ্যায়ের নির্দেশনায়।

shami-2

‘শমীবৃক্ষ’ নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্র, তরুণ ত্রিষ্টুপ। সে সাহিত্য ভালোবাসে, কাব্য সাধনায় জীবন উৎসর্গ করতে চায়। কিন্তু তাঁর বাবা অবিনাশের ছাপোষা গেরস্থ জীবন ত্রিষ্টুপের মা কামিনীকে নিয়ে। তাঁদের মেয়ে প্রভা, নাতনি রানু এবং জামাই রমেশও একই সংসারে আশ্রিত, রমেশের রুটি-রুজির বিশেষ সংস্থান না থাকায়। অবিনাশের কর্মজীবনও শেষ, নিজের সুনাম থাকায় সেখানেই ত্রিষ্টুপের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছেন অবিনাশ। অথচ ত্রিষ্টুপের মধ্যে এই কাজে যোগ দেওয়ার কোনো আগ্রহই নেই। আটপৌরে ছকে বাঁধা জীবনে চাকরি করে গতানুগতিকতায় বন্দি হতে চায় না ত্রিষ্টুপ। নামের মতোই ব্যতিক্রমী সে। অথচ বড়ো সংসারের দায়িত্ব আছে। সকলে তাঁর মুখাপেক্ষী। বন্ধুসম অগ্রজ মনীশের বোন কুন্তলাকে ভালোবাসে ত্রিষ্টুপ। কিন্তু সম্পর্কের দায়িত্বের জন্য যে দায়িত্বগ্রহণের প্রয়োজন, তা থেকে পালাতে চায় ত্রিষ্টুপ। এই রকম স্বপ্নসন্ধানী এবং বাস্তববিমুখ যুবার জীবনযন্ত্রণা ও মনোবেদনাকে নিয়ে গড়ে উঠেছে মোহিত চট্টোপাধ্যায়ের নাটক। নাট্যকার স্বয়ং কবি ছিলেন, তাই আপাত সরল সাদামাটা চেনা বাস্তব জীবনের চেনা নাটকের পরতে পরতে জন্ম নিয়েছে কবিতার মতো মুহূর্ত।

shami-4

লিখিত নাটকের কবিতার আভাস, সংলাপে প্রযোজনায় ও অভিনয়ে প্রকাশ করা মোটেই সহজ কাজ নয়। সেই কঠিন কাজটার প্রচেষ্টা চালিয়েছেন কুশীলব ও শিল্পকর্মীরা। বেশ কয়েকটি দৃশ্যে নাটকের ভেতরের গভীরতাকে স্পর্শ করে প্রযোজনা, যেমন – ত্রিষ্টুপের অফিসের অভিজ্ঞ সহকর্মীরা যখন তাঁকে দেখায় যত বেশি অভিজ্ঞতা হবে, বয়স বাড়বে, ত্রিষ্টুপের পরিণতি কী রকম হবে – এই দৃশ্যটা মনে থাকবে বহুদিন। প্রযোজনায় কিছু কিছু ক্ষেত্রে আরও একটু ভারসাম্য দরকার। নীল-কৌশিকের মঞ্চ ভাবনায় ত্রিষ্টুপদের বাড়ির ঘর ও ভেতরের অংশ বোঝাতে যে ধরনের আসবাবের আয়োজন করা হয় তার সঙ্গে ইঙ্গিতপূর্ণ ভাবে কাপড়ের গাছ (যার মধ্যে দিয়ে চরিত্ররা প্রবেশ-প্রস্থানও করেন) সম্পৃক্ত হতে পারেনি। সৌমেন চক্রবর্তীর আলোর প্রয়োগের ক্ষেত্রেও আরও মহড়ার প্রয়োজন। না হলে সময় মতো আলোর প্রক্ষেপণ হচ্ছে না। কখনও চরিত্ররা অন্ধকারেই থেকে যাচ্ছেন। নাটকের অভিনেতারা তাঁদের চরিত্র পরিস্ফুটনে আন্তরিক থেকেছেন। রাম মুখোপাধ্যায়ের মতো প্রবীণ নাট্য অভিনেতার এখনও চমৎকার কণ্ঠস্বর। সুদর্শন এই প্রবীণকে দেখে অনেক নবীন ঈর্ষা করতে পারেন তাঁর সক্ষমতার জন্য। মেয়েরা প্রত্যেকেই সাবলীল। এই নাটকের দীর্ঘদিনের অভিনেত্রী পাপড়ি বসু (কামিনী), শিশু শিল্পী শ্রীয়াদিতা (রানু) অথবা সোমা দাস (প্রভা) সবাই নাট্য ঘটনার অঙ্গ হয়ে ওঠেন। সৃজিতা মুখোপাধ্যায় (কুন্তলা)কে দেখে ভবিষ্যতে আরও বড়ো অভিনয়ের প্রত্যাশা তৈরি হয়। ত্রিষ্টুপ চরিত্রে শেখর সরকার বিশ্বাসযোগ্য থাকার চেষ্টা করেছেন। তবে বিরতির আগের দৃশ্যে অসুস্থ হওয়ার সময়ে আরও একটু আগে থেকে শরীর আর মনোকষ্টের পূর্বাভাস থাকলে ভালো হয়। ভালো লেগেছে নিমাই চক্রবর্তী (রমেশ), ছত্রধর দাস (মনীশ) ও স্বল্পপরিসরে সৌমেন্দু বসু (পদ্মলোচন)কে। প্রযোজনায় গতি আনতে কিছুটা সম্পাদনা করা যেতে পারে।

ছবি: কলকাতা প্লেমেকার্স

এক ক্লিকে মনের মানুষ,খবর অনলাইন পাত্রপাত্রীর খোঁজ

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here