সুমিত্র বন্দ্যোপাধ্যায়

নাটক সম্পর্কে একটা পরিচিত মত আছে যে যদি নাটকের বিষয়টা আকর্ষণীয় হয় এবং অভিনয় হয় সুন্দর, তাহলে দর্শকের তা ভালো লাগবে। একই সঙ্গে যদি উপস্থাপনাও হয় রুচিসম্মত এবং মার্জিত, তাহলে তো কথাই নেই। এই মতের স্বপক্ষে বাংলা নাট্যজগতে একটি সাম্প্রতিক উদাহরণ- গণকৃষ্টি নাট্যদল প্রযোজিত নাটক, তোমার আমি।

স্লোভেনিয়াক নাট্যকার ইভাল্ড ফ্লিসার-এর ‘টেক মি ইন ইওর হ্যান্ডস’ থেকে অমিতাভ দত্ত-র বঙ্গায়ন ‘তোমার আমি’। নাটকের প্রেক্ষাপট বই ও বই-এর জগৎ, আরও নির্দিষ্ট করে বললে কলকাতার কলেজ স্ট্রিটের বইপাড়ার অন্তরজগৎ। কিছুদিন আগেও, এই আশি কিংবা নব্বই-এর দশকের গোড়ার দিকে যখন সরকারি দূরদর্শনের দৈনিক কয়েক ঘণ্টার সম্প্রচারকেই লোকে টেলিভিশন বলে জানত, তখনও পাড়ায় পাড়ায় লাইব্রেরিগুলো উপচে পড়ত সদস্যদের ভিড়ে। পছন্দের লেখকদের বই পড়বার জন্য ‘রিজার্ভ’ করে রাখতে হত কয়েক সপ্তাহ আগে। সেই সময়েও অনুষ্ঠান-উৎসবে অনেকের মধ্যেই বই দেওয়ার প্রচলন ছিল। আজ যা বিরল। বিয়েবাড়িতে উপহার হিসেবে এখন কেউ বই নিয়ে গেলে, তাঁকে হয়তো ‘আঁতেল’ আখ্যা দেবে লোকে। চেনা পৃথিবীটা খুব দ্রুত পুরোনো হয়ে যাচ্ছে। বৈদ্যুতিন তথ্যের ভাণ্ডারে খুব দ্রুত চাপা পড়ে যাচ্ছে জ্ঞানের বিশ্ব, প্রজ্ঞার ভুবন। এই রকম একটা সময়ে দাঁড়িয়ে মুখোমুখি হচ্ছে নাটকের দুই চরিত্র, দুই প্রজন্মের প্রতিনিধি।

দেবশংকর হালদারকে মঞ্চে এ নাটকে দেখতে দেখতে একসময় মনে হবে যেন অভিনয় নয়, বাস্তবকে প্রত্যক্ষ করছি।… মায়া চরিত্রে সোমা দত্ত-র কাজটা ছিল খুবই কঠিন।… বলতে দ্বিধা নেই, সোমা দর্শককে মুগ্ধ করেছেন। শরীরের ভাষা প্রয়োগে, সংলাপ উচ্চারণের তীক্ষ্ণতায় মায়া চরিত্রের অভিনয়ে খুব উঁচু মানের নিদর্শন সৃষ্টি করেছেন তিনি।… দুই অভিনেতার উচ্চ পর্যায়ের অভিনয় চরিত্রের বাইরের বাস্তবতাই শুধু নয়, উপস্থাপিত করে তাঁদের অন্তরজগতের বিবর্তনকেও।

কলেজ স্ট্রিটে তিন পুরুষের দোকান, পুরোনো বইয়ের ব্যবসায়ী, জীবন সায়াহ্নে পৌঁছে যাওয়া অজিত, যার ব্যবসার হাল মন্দা। অনেক চেনা হয়ে গেছে, সে বইপত্রকে ঘিরে গড়ে তোলা নিজস্ব ভূবনে নিজেকে গুটিয়ে নিচ্ছে ক্রমশ। নাটকে এই রকম একজনের বিপ্রতীপে রয়েছে সদ্য যৌবনের উচ্ছলতায় পরিপূর্ণ মায়া। নিম্নবিত্ত, অস্বচ্ছল জীবনের থেকে উঠে আসা মায়া, তাঁর নিজস্ব পারিবারিক-সামাজিক অবস্থানের বিপ্রতীপে ভালোবাসে বইয়ের দুনিয়াকে।এক-একটা বই বিশ্বের এক-একটা দিগন্ত উন্মোচিত করে মায়ার সামনে। মায়া-অজিত পরস্পরের সান্নিধ্যে আশ্রয় পেতে শুরু করে। দু’জনের বৈপরীত্যকে অতিক্রম করে গড়ে উঠতে থাকে পারস্পরিক আস্থা, নির্ভরতা। অস্তিত্বের সঙ্কটে থাকা দু’জন একলা মানুষ একে অপরের মাঝে অবলম্বন খুঁজে পায়। যদিও দু’জনের প্রকাশভঙ্গি একেবারে উল্টো।দু’জনের এই ছুঁতে চাওয়ার, নিকটে আসার সংযোগসেতু হয়ে ওঠে বই ও বইয়ের দোকান। নতুন যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ব্যবসার নানাবিধ রূপান্তরের আইডিয়া আসে অজিতের দোকানের কর্মী মায়ার মাথায় এবং বেশিরভাগই প্রত্যাখ্যান করে অজিত। তবুও কাছে আসে, নিবিড় বন্ধনে বাঁধা পড়ে দুটি মানুষ।

রূপান্তরের ক্ষেত্রে অমিতাভ দত্ত মৌলিক নাটকের স্বাদ নিয়ে এসেছেন ‘তোমার আমি’-তে।যদিও সংলাপের মধ্যে কবিতাগুলো আর একটু কম পরিচিত হলে বা কবিতা একেবারে না থাকলেই হয়তো ভালো হতো। তবে শর্মিষ্ঠা ঘোষের রূপান্তরিত কবিতার অংশটি ভালো লাগে। আসলে এ নাটকের সংলাপে-অভিনয়ে এমন সব কাব্য মুহূর্তের জন্ম হয় যে অতিরিক্ত কবিতা না হলেও চলে।

বাস্তবধর্মী অভিনয়ের উচ্চ পর্যায়ের নিদর্শন এই নাটক। এই সময়ের বাংলা থিয়েটারের সর্বাধিক জনপ্রিয় অভিনেতা দেবশংকর হালদারকে মঞ্চে এ নাটকে দেখতে দেখতে একসময় মনে হবে যেন অভিনয় নয়, বাস্তবকে প্রত্যক্ষ করছি। বিরতির ঠিক আগে তাঁর সংলাপ প্রক্ষেপণ, গর্ভধারণের প্রতীকের মতো বইগুলোকে আঁকড়ে ধরে বসে পড়া, যে নাট্যমুহূর্তের জন্ম দেয়, তা একবার দেখলে সারাজীবনের স্মৃতি হয়ে থাকে। মায়া চরিত্রে সোমা দত্ত-র কাজটা ছিল খুবই কঠিন। প্রথমত, উল্টোদিকের অভিনেতার সঙ্গে যথাযথ সঙ্গত করা, দ্বিতীয়ত সদ্য যৌবনের প্রাণোচ্ছল মায়াকে সশরীরে ধারণ করা। ১০ বছর আগে গণকৃষ্টি প্রযোজিত ‘ঝরা সময়ের কাব্য’ নাটকে মির্জা গালিবের স্ত্রী উমরাও বেগমের প্রৌঢা় বয়স চমৎকার ধারণ করতে দেখেছিলাম তাঁকে। কিন্তু এবারে ছিল বয়স কমানোর খেলা, আরও কঠিন কাজ। বলতে দ্বিধা নেই, সোমা দর্শককে মুগ্ধ করেছেন। শরীরের ভাষা প্রয়োগে, সংলাপ উচ্চারণের তীক্ষ্ণতায় মায়া চরিত্রের অভিনয়ে খুব উঁচু মানের নিদর্শন সৃষ্টি করেছেন তিনি। যথেষ্ট প্রচারের আলো না পাওয়া এই সময়ের গুণী শিল্পীদের অন্যতম সোমা দত্ত। দুই অভিনেতার উচ্চ পর্যায়ের অভিনয় চরিত্রের বাইরের বাস্তবতাই শুধু নয়, উপস্থাপিত করে তাঁদের অন্তরজগতের বিবর্তনকেও।

পরিচালনার পরিমিতে অক্ষুণ্ণ রাখতে সাহায্য করে তাপস মিল-এর মঞ্চ ভাবনা, জয়ন্ত মুখোপাধ্যায়ের আলো, গৌতম ঘোষের সঙ্গীত। সারি সারি বইয়ের তাকের সঙ্গে পুরোনো আসবাবপত্র অজিতের দোকানের প্রাচীনতার আভাস দেয়। যদিও দু’একটা তাকে কাঁচ ও তালাচাবি থাকলে আরও ভালো হতো। ট্রামগাড়ির চলে যাওয়ার শব্দ, কোলাহল- উত্তর ও মধ্য কলকাতার মেজাজটাকে চমৎকার প্রকাশ করে কিন্তু নাটকের গভীর মুহূর্তগুলোয় বারবার পাশ্চাত্য সঙ্গীত একটু দূরত্ব তৈরি করে। অজিতের পোশাকে পাঞ্জাবি কখনও কখনও বেশি আধুনিক লাগে। ঠিক যেমন মায়াকে কখনও ভারতীয় পোশাকে দেখা গেলে মন্দ লাগবে না হয়তো, বিশেষত নাটকের দ্বিতীয় অর্ধে। পোশাক পরিকল্পক দীপক দাসকে ভেবে দেখতে অনুরোধ করব।

পরিশেষ একটি চমৎকার, উপভোগ্য, হৃদয়স্পর্শী প্রযোজনার জন্য অমিতাভ দত্ত ও গণকৃষ্টিকে অজস্র ধন্যবাদ। আক্ষেপ একটাই, এত চেনা দেশজ জীবনকে প্রকাশ করতেও আমাদের বিদেশের কাছে ঋণ করতে হয়। মৌলিক প্রচেষ্টা হয় না!

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here