sumitraসুমিত্র বন্দ্যোপাধ্যায়

জীবনে ও সমাজে যা যা ঘটে চলেছে, তা যদি কোনও মানুষের পক্ষে মেনে নিতে কষ্ট হয়, তাহলে সে কী করবে ? হয় চারপাশটা বদলাতে চাইবে নয়তো নিজেকে বদলাবে। নিজেকে বদলানো মানে আরও বেশি না বদলের কথা ভাবা, আরও বেশি মেনে ও মানিয়ে নিতে শেখা। বশ্যতা স্বীকার করা। চারপাশের পৃথিবীর পরিবর্তনের ঝুঁকি নেওয়ার চেয়ে নিরাপত্তার জীবনের ‘সেফ’ ফাটকে নিজেই নিজেকে আটকে ফেলা অনেক সহজ। সেটাই করে বেশির ভাগ মানুষ। কারণ, ‘নিজের ভালো পাগলেও বোঝে’। সামাজিক ক্ষমতাকে প্রশ্ন করার ঝুঁকি নিতে পারে যে ‘পাগলামি’গুলো, সেগুলোই হয়ে ওঠে খবর। যেমন এই মুহূর্তে ‘কলকাতা রঙ্গিলা’ নাট্যদল প্রযোজিত, কৌশিক কর রচিত, নির্দেশিত ও মুখ্য চরিত্রে অভিনীত নাট্য- ‘নাটক-ফাটক’ একটা খবর।

গত শতকের ষাটের দশকের গোড়ায় প্রকাশিত কেন কেসে-র বিখ্যাত উপন্যাস ‘ওয়ান ফ্লিউ ওভার কাকুস নেস্ট’-কে সুপরিচিত টাইম ম্যাগাজিন তাদের এক সমীক্ষায় চিহ্নিত করেছিল সেরা একশো উপন্যাসের মধ্যে। পরবর্তীকালে যা থেকে সৃষ্টি হয়েছে একাধিক মঞ্চসফল নাটক ও চলচ্চিত্র। উপন্যাসের আখ্যানে মানসিক হাসপাতালে নবাগত এক রোগী সেখানকার চিকিৎসাব্যবস্থা ও পরিচালনাপদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তুলছে, অস্বীকার করছে। ক্ষমতার প্রতিভূ ওই হাসপাতালের অনুভূতিশূন্য নার্স ও চিকিৎসকরা বেকায়দায় পড়ে যাচ্ছেন নতুন রোগীর কর্মকাণ্ডে, নানাবিধ অন্তর্ঘাতের পরিকল্পনা ও সে সবের বাস্তবায়নে। হাসপাতালের অন্য রোগীরাও অনুপ্রাণিত হচ্ছে এই সব ঘটনায়। দুর্বল হয়ে পড়ছে ‘পাগলখানা’র কঠিন ফাটক। মনে রাখতে হবে, এই উপন্যাসের রচনা সময়ে আমেরিকায় নাগরিক অধিকারের আন্দোলন চলছে। পরিবর্তন হচ্ছে, মনোবিজ্ঞান ও মনোচিকিৎসার প্রচলিত ধ্যান-ধারণাতেও।

2

কৌশিক উপন্যাসের কাঠামোটাকে ব্যবহার করে সমকালীন বঙ্গ সমাজ-সংস্কৃতি সম্পর্কে নিজের চিন্তা-ভাবনা প্রকাশ করেছেন। যা প্রায় মৌলিকতার স্বাদ দেয়। কখনও ধারালো, বুদ্ধিদীপ্ত, প্রতিবাদে মুখর আবার মাঝে মাঝে একটু ছেলেমানুষিও। নাটকের মুখ্য চরিত্রটি যেহেতু একজন নাট্যশিল্পী তাই নাট্যকার-পরিচালকের ব্যক্তিগত আবেগও মিশে যায় নাট্যে। একই সঙ্গে বাংলা থিয়েটারের নব প্রজন্মের চিন্তা-ভাবনারও বয়ান হয়ে উঠেছে নাটক-ফাটক।

সমস্ত নাট্য প্রযোজনা জুড়ে অজস্র নাট্যমুহূর্ত দর্শককে ধাক্কা দেয় মনের গভীরে। যেমন, পাগলখানা থেকে পালানোর পর রোগীরা পরস্পরকে এক/দুই/তিন….বলে সম্বোধন না করে ডাকে তাদের নিজস্ব নামে, হাসপাতালের সিলিং-এ লাল-তার কাটা বন্ধ পাখা আবার ঘুরতে শুরু করলে, ভোটাভুটির দৃশ্যে অথবা বিরতির ঠিক আগে কৌশিকের একক সংলাপের সময় – এমন আরও অনেক আছে এই নাটকে। মানসিক হাসপাতালের অন্তর্জগৎ-কে প্রাণ ঢেলে অভিনয়ের মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন পলাশ, গম্ভীরা, রাহুল, সমীরণ, প্রিয়াঙ্কারা। রোবটের মতো যান্ত্রিকতা ও কৃত্রিমতা নার্স চরিত্রে দক্ষতার সঙ্গে ফুটিয়ে তুলেছেন সঙ্গীতা পাল। ছোটো ছোটো পার্শ্বচরিত্রেও যোগ্য সঙ্গত করেছেন নবনীতা, মেহবুব, দেবদাস, আমন, কুয়াশারা। দলগত অভিনয় এই নাটকের সম্পদ তবে বাচিক অভিনয়ের আরও একটু প্রস্তুতি হলে ভালো হয়। এই নাট্যের প্রাণ আছে কৌশিকের অভিনয়ে। মঞ্চ জুড়ে কৌশিকের দাপুটে উপস্থিতি, উচ্ছ্বাস, অসহায়তা, আর্তনাদ দর্শকদের বিস্মিত করে, মুগ্ধ করে। কৌশিক প্রমাণ করে ছাড়েন নতুন প্রজন্মের অভিনেতাদের মধ্যে তিনি অন্যতম শ্রেষ্ঠ।

3    

‘নাটক-ফাটক’-এ পাশ্চাত্যের পূর্ব-প্রযোজনাগুলির ঝলক থাকলেও নিজস্ব গুণও যথেষ্ট আছে। যেমন, সুদীপ সান্যালের আলোক পরিকল্পনা যা বড়ো চিত্রকরদের শিল্পগুণসম্পন্ন। তবে মঞ্চ ও পোশাক পরিকল্পনায় আরও কল্পনাশক্তির দাবি করছে এই নাট্য। সামান্য পরিসরেও বেশ কার্যকর ভাস্কর রাউতের কোরিওগ্রাফি। অভীকের শব্দ প্রক্ষেপণ যথাযথ, বিশেষ করে নেপথ্য থেকে কবিতার প্রক্ষেপণ নাটকে আলাদা মাত্রা যোগ করে।

সব শেষে পরিচালক কৌশিককে ‘কেয়াবাৎ’ বলার আগে কয়েকটি মন্তব্য – মনোবিজ্ঞানের জগতে প্রবেশ করতে হলে চিকিৎসকদের চরিত্রের আরও পরিসর ও দৃঢ়তা বাড়ানোর প্রয়োজন, না হলে চাপান-উতোরগুলো একপেশে হয়ে যায় – বিতর্ক জমে না। বাংলা তথা বিশ্ব নাটকের দর্শকরা যুগে যুগে বহু শিল্পীকে দেখেছেন ক্ষমতা-কেন্দ্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী স্বরে সোচ্চার হতে হতে নিজেদেরই বড়ো ক্ষমতায় বিবর্তিত হতে। কৌশিক কোন দিকে যান, সেটাই দেখার। রঙ্গিলার রসযাত্রার জয় হোক!  

(সমালোচক নাট্যব্যক্তিত্ব)

ছবি: কলকাতা রঙ্গিলা-র সৌজন্যে

( যাঁরা khaboronline.com-এর নাট্য সমালোচনা বিভাগে তাঁদের নাটকের সমালোচনা প্রকাশে আগ্রহী, তাঁরা আমন্ত্রণপত্র পাঠাতে পারেন [email protected] অথবা [email protected]এ মেল করে তবে, নাটক নির্বাচন বা সমালোচনা প্রকাশ সম্পাদকের বিবেচনার ওপর নির্ভর করবে)

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here