মৌসুমী বিলকিস

শিল্পীর স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ; জাতপাত, লিঙ্গ, যৌনতা, সম্প্রদায়, জনজাতি ভিত্তিতে বিভাজন;   নিজের অধিকার বুঝে নিতে চাওয়া মানুষদের কোণঠাসা করে রাখার প্রবণতা  এখন প্রতিদিনের ঘটনা। সেইসব উল্টোদিকের খবরগুলো বিস্তারিত  পৌঁছয় না  মূল স্রোতের কাছে। মূল স্রোত জানে না এইসব মানুষদের প্রতিদিনের সংগ্রাম। মূল ধারার সাহিত্যেও এই মানুষদের সুখ দুঃখ প্রায় অধরাই থেকে যায়।  তাই যে সব সাহিত্যিক  ব্রাত্য মানুষ ও বিষয় নিয়ে লেখেন তাঁরাই ছিলেন জনতার সাহিত্য উৎসবের সম্মানিত অতিথি।  আয়োজক বস্তার সলিডারিটি নেটওয়ার্ক (কলকাতা চ্যাপ্টার) জনতার সাহিত্য উৎসবের  এই উদ্দেশ্য  স্পষ্ট করে বুঝিয়ে দিতে চেয়েছে। এমনকি তাঁরা ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে গবেষকের নিষ্ঠায় খোঁজ খবর নিয়ে  আমন্ত্রণ করেছেন   কলকাতায় প্রায়  অপরিচিত বা স্বল্প  পরিচিত সাহিত্য  যোদ্ধাদের।  আরও একটি মনে রাখার বিষয় কোনো স্পনসর ছাড়াই জনতার   উৎসব  জনতার চাঁদায় সম্পন্ন হল, আয়োজকদের পক্ষে এই দাবি করা হল এবং দু’দিনের উৎসবে চোখে   পড়েনি  কোনো  কোম্পানির  বিপণন ব্যানার।

উৎসবের দ্বিতীয় তথা শেষ দিনের প্রথম আলোচনার বিষয় ছিলো ফ্যাসিবাদ বিরোধী শিল্প ও সাহিত্য।  ভারভারা রাও, গজালা জামিল,  স্কাইবাবা এ বিষয়ে তাঁদের দীর্ঘ দিনের অভিজ্ঞতা  শ্রোতাদের কাছে তুলে ধরেন। তাঁদের বক্তব্যে  বঞ্চনার  দৈনন্দিনের পাশাপাশি লড়াইয়ের সংকল্প ধ্বনিত হয়।

যদিও এদিন পারফর্ম করার কথা ছিল না রেলা গ্রুপের। কেননা  প্রথম দিনেই  দলটির জন্য নির্দিষ্ট সময় সূচি  ছিল।কিন্তু  প্রথা ভেঙ্গে উদ্যোক্তারা দলটির সদস্যদের  সদিচ্ছা এবং শ্রোতাদের আগ্রহকে গুরুত্ব দিয়ে  কিছুক্ষণের  জন্য তাঁদের  মঞ্চ ছেড়ে  দেয়। তাঁরা প্রথম দিনের মতোই মাতিয়ে  দেন দর্শকদের।

মাল্টিমিডিয়া পোয়েট্রি, অডিও ভিজুয়াল মিশ্র মাধ্যমে গোর্খাল্যান্ডের কথা উপস্থাপন করেন পল্লব সিংগক ও মনোজ বোগাতি।  নেপালি ভাষার কবি ও গল্পকার মনোজের লেখায় ঠিকরে পড়ে আগুন। তাঁর গ্রন্থের নাম তাই  ‘ক্ষোভের বর্ণমালা’ বা ‘ঘেমো চামড়া’।  তাঁর কবিতায় শ্রমিক খিদে মেটায় পোড়া রুটিতে, তাও ভয় পায় আমেরিকা।

আরও পড়ুন: জনতার সাহিত্যিকদের সমাবেশ কলকাতায়

‘আমার শরীর আমার মন,দূর হঠো রাজশাসন’ শীর্ষক আলোচনায় হরিপ্রিয়া সইবাম, মনিপুরের কবি,  নিজের  শরীরের ওপর নিজের অধিকার নিয়ে বলেন। কবির কাছে নিজের যোনিই নিজের যুদ্ধক্ষেত্র, যে কোনো জাতীয়তাবাদী তাঁর কাছে গেরুয়া।কুট্টি রেবতীও নিজের শরীরের অধিকার বুঝে নিতে চেয়ে রোষের মুখে পড়েন। তামিল ভাষায় মুলইগল (স্তন) নামের কাব্যগ্রন্থ লিখে তিনি প্রচলিত নারী যৌনতার ছক ভেঙে দিতে চান।  তামিল নারীবাদী পাক্ষিক পানিকুড়ম -এর সম্পাদক তিনি।  অন্যদিকে ফিল্মের স্ক্রিপ্ট ও গান রচনায়  তাঁর খ্যাতি।ঈরাভি ছদ্মনামে লেখেন স্মৃতি। তিনি একাধারে চিত্রনাট্যকার, কবি, অ্যাক্টিভিস্ট,  স্ক্রিপ্ট নামের পত্রিকার সম্পাদক।  তিনি যৌনতা ভিত্তিক বিভাজন ও হিংসা নিয়ে কথা বলেন। এই বিভাগের অন্যতম বক্তা হাঁসদা সোভেন্দ্র শেখর মূলত ‘আদিবাসীরা নাচবে না’ গল্পগ্রন্থের এক আদিবাসী পরিযায়ী শ্রমিক মেয়ের কথা বলেন যে বাধ্য হয়ে অর্থ ও দুটো ঠান্ডা বড়ার বিনিময়ে শরীর বিক্রি করে। এই টাকা নিয়ে সে পরবর্তী কাজের খোঁজে এগিয়ে যেতে পারবে। শেখরের কণ্ঠস্বর শক্তিশালী। আদিবাসীদের অচেনা দৈনন্দিন তাঁর লেখায় উঠে আসে।  তিনি শরীরের অধিকার বিষয়ে অন্যদের সঙ্গে গলা মেলালেন।অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করলেন নীলাঞ্জনা সেনগুপ্ত।

চিত্ত প্রসাদের আঁকা ছবির সঙ্গে দর্শকদের বিস্তারিত পরিচয় করিয়ে দিলেন অশোক ভৌমিক।  অরুণ ফেরেইরা জেল জীবন উপস্থাপন করলেন বেশ কিছু পেন্টিং-এর মাধ্যমে। তাতে জেলের অন্দর সম্পর্কে ধারণা পাওয়া গেল।

মানস ঘোষের সঞ্চালনায় বাংলা সাহিত্যে ইতর জনের কথা বিষয়ে বললেন কল্যাণী ঠাকুর চাঁড়াল, আনসারুদ্দিন এবং দীপক কুমার রায়।দীপকবাবুর আলোচনায় তথ্যের গভীরতায় উন্মোচিত হল ইতরজনদের ‘ইতর’ করে রাখার রাজনীতি। আনসারুদ্দিন ও কল্যাণী আবহমান বঞ্চনার ইতিবৃত্ত তুলে ধরলেন।এটিই এদিনের শেষতম আলোচনা।

লাল অন গোষ্ঠীর গান দিয়ে শেষ হল দুদিনের সাহিত্য উৎসব।

শেষ মানে কি সত্যি শেষ?  আসলে শুরু হল। প্রান্তিক জীবনের কথা বলা প্রান্তিক লেখক কবিদের কণ্ঠস্বর, তাঁদের স্পর্ধা যে এই শহরে দীর্ঘ অনুরণন রেখে গেল, কান পাতলেই  টের  পাওয়া যাচ্ছে। সারা দেশের প্রতিবাদী, ‘জনতা’র শিল্পী-সাহিত্যিকদের একজোট করার এই প্রয়াস আরও পল্লবিত হোক, বছর বছর ফিরে আসুক বিকল্প পরিসরের জন্য যুদ্ধের অঙ্গ হিসেবে। সচেতন কলকাতার সংস্কৃতি মনস্কতায় যুক্ত হোক নতুন পালক-উদ্যোক্তাদের কাছে এই দাবিটুকু করাই যায়।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here