পাপিয়া মিত্র

কিশোরী রানুকে লেখা চিঠি দিয়ে মূল অনুষ্ঠান শুরু। উপনয়নের পরে মাসখানেকের জন্য ডালহৌসি পাহাড়ে গিয়েছিলেন বালক রবি, পিতা দেবেন্দ্রনাথের সঙ্গে। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে অনুভূত হয় অতি উচ্চ, অতি বিস্তৃত পাহাড়ের কাছে সে দিনের রবির কল্পনার পাখা মেলে ছিল সীমাহীন চরাচরে। রানুর প্রথম পাহাড়ে যাওয়ার আনন্দে তাকে শুভেচ্ছা জানিয়ে চিঠির মধ্যে ব্যক্ত করেছেন উপদেশও। সুউচ্চ হিমালয় প্রতি ক্ষণে বুঝিয়ে দিয়েছিল তাকে অতিক্রম করে যে কেউ যাক না কেন পাহাড় কিন্তু তাকে আপন করে নিয়ে এক সঙ্গে পথ চলতে চায়। বালক রবির মনের যে আলোড়ন ছিল তা বুঝি রানুর মনেও অনুরণিত হয়। প্রথম দর্শনের অনুভব চিঠির প্রতি লাইনেই দিয়েছিলেন।

আবার সাহিত্যিক প্রমথ চৌধুরীর কাছে লেখা চিঠিতে জানিয়েছিলেন বর্ষার আগমনে মনের মাধুরী দিয়ে বরণ করে নেওয়া বারিরানিকে। তাতে প্রকাশ পেয়েছে ঝড়ের ভ্রূকুটি, সহবত শিক্ষা না শিখে গৃহস্থের আশ্রয় তছনছ করার অভিলাষ, মাঠের মধ্যে দিয়ে হু হু শব্দে কী ভাবে তীব্র বেগ ঝাঁপিয়ে পড়ছে বাগানে। চিঠির পাতা উলটিয়ে প্রকৃতির রূপ সেখানে কথা কয়। সেই কথাই কখন গান হয়ে যায়। বিশ্বপ্রকৃতির নানা পর্যায় ঘুরে ঘুরে আসে। আর প্রকৃতি পর্যায়ের হাত ধরে আমাদের গতি পর্যবেক্ষণ করা। বাঁশির সুরে সৌমিত্র-কন্ঠে শোনা যায় যে পাঠ তা রচনা করেছেন সোহিনী সোম। ধরণী যখন তপ্ত, প্রাণ যখন অতিষ্ট, তখন কথায়-গানে ঘণ্টা-দুই বসিয়ে রাখতে যাঁরা পারেন তাঁরা হলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ও সৌমিত রায়। সম্প্রতি মঞ্চস্থ হল চিত্র পরিচালক রাতুল গঙ্গোপাধ্যায়ের ভাবনা ও পরিচালনায় স্টার থিয়েটারে ‘এক সন্ধ্যায় ৬ ঋতু’।

পাঠে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়।

মঞ্চের প্রধান আকর্ষণ আলাদা করে ‘দাদাসাহেব ফালকে’ সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার অপেক্ষা রাখে না। তবুও অপূর্বকুমার রায়, প্রদোষ মিত্র, উদয়ন পণ্ডিত, ক্ষীদদা-সহ নানা নামের মধ্য দিয়ে জীবনের খেলাঘরের কথা মনে করিয়েছেন সঞ্চালক ‘রায়’।

গানে সৌমিত রায়।

‘এক সন্ধ্যায় ৬ ঋতু’কে ধরা মুখের কথা নয়, যখন শহর কলকাতা-সহ আশপাশের তাপমাত্রা ৩৮-৩৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ঘরে। বিশ্বপ্রকৃতির কোলকে সম্মান জানিয়ে ২৩টি গানের ডালির প্রথম নিবেদন ‘আকাশভরা সূর্যতারা বিশ্বভরা প্রাণ’ গানটি। গ্রীষ্মের ৪টি গান পেয়েছি। কবির কথা টেনে সৌমিত্র বললেন, সূর্যকে বলেছেন তপন, একমাত্র রবিঠাকুরই পারেন তপ্ত মাটিকে এক লহমায় সিক্ত করতে। এক ঘেয়ে সিক্ত প্রকৃতিকে মানবমনে রোমাঞ্চিত করার জাদুকাঠি যেমন কবির হাতে আছে তেমনই আছে সৌমিতের কন্ঠস্বরে। ‘নীল অঞ্জনঘন পুঞ্জছায়ায়’, ‘একি গভীর বাণী’, ‘তিমির অবগুণ্ঠনে’, ‘আজি তোমায় আবার চাই শুনাবারে’ সহ ৬টি গানে বর্ষাঋতুকে বরণ করে নিয়েছেন। গানের সুরে এসেছে সম্মিলিত সুর, আবহে বাঁশির ধ্বনি, বাদ্যের দ্রুততা – সব মিলিয়ে শ্রোতাদের মন ভিজিয়ে দিয়েছেন ‘রাগরঞ্জনী উত্তরপাড়া’র এই কর্ণধার। অমল ধবল পালে মন্দমধুর হাওয়ায় এসেছে শরত। ৩টি গানের উপস্থাপনায় মঞ্চে সাদা মেঘ উড়ে গিয়েছে। সময় গড়িয়েছে, হেমন্ত ও শীতের উপহার ২টি করে গান। পৌষকে পেয়েছি আমরা অসাধারণ এক লোকসুরের আবহে, বাঁশিতে সৌম্যজ্যোতি ঘোষ আমাদের নিয়ে গিয়েছিলেন লালমাটির দেশে। বসন্তকে পেতে দেরি হয়নি। ‘অনেক দিনের মনের মানুষ’ এসেছে আরও পাঁচটি গান নিয়ে। শেষ নিবেদন ছিল ‘বিশ্ববীণা রবে’।

বামহাতী সঙ্গীতশিল্পী সৌমিত রায় শুধু গানে সীমাবদ্ধ নন। পাশাপাশি ছিল ছবি আঁকার নেশা। শ্রীমতী মায়া সেন ও দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়ের সুযোগ্য ছাত্র বৃত্তিগত ভাবে ইঞ্জিনিয়ার হলেও সুরের প্রতি অনুরাগ তাঁর শৈশব থেকে। কলকাতায় জন্ম এই শিল্পীর সঙ্গীতজগতে আসা বাড়ির পরিবেশ থেকে। সাফল্যলাভ করেছেন নানা সম্মানজনক প্রতিযোগিতায় – রাজ্য সঙ্গীত অ্যাকাডেমি, ইন্টার কলিজিয়েট যুব উৎসব ইত্যাদি। শ্রীমতী মায়া সেন পরিচালিত গীতিনাট্য ‘মায়ার খেলা’ ও ‘চণ্ডালিকা’য় প্রধান পুরুষকন্ঠে শ্রীসৌমিত প্রশংসনীয়। উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত ও আধুনিক গানে তালিম নিয়েছেন শ্রীসুনির্মল ভট্টাচার্য ও জটিলেশ্বর মুখোপাধ্যায়ের কাছে। প্রচারবিমুখ এই শিল্পী ‘মুক্তধারা’ আয়োজিত কলকাতায় নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়ামে ও দিল্লির ‘ওয়ার্ল্ড কালচারাল ফেস্টিভ্যাল’ এর ‘হাজার কন্ঠে রবীন্দ্র সঙ্গীত’ অনুষ্ঠানে মুখ্য প্রশিক্ষক হিসেবে প্রশংসার দাবী রাখেন। একক অ্যালবাম ‘আমার একটি কথা’, ‘সূর্য সখা’, ‘রাগে অনুরাগে’, ‘গানের ভেলা’।

সমগ্র অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন রাতুল গঙ্গোপাধ্যায়।

সমগ্র অনুষ্ঠানটিকে শ্রুতিমধুর করে তুলেছিলেন তবলায় বিপ্লব মণ্ডল, সরোদে প্রসেনজিৎ সেনগুপ্ত, পারকাশনে অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় ও সিন্থেসাইজারে সুব্রত মুখোপাধ্যায় (বাবু)। আয়োজক কালীবাড়ি ইয়ং স্টার অ্যাসোসিয়েশন। উপস্থিত ছিলেন সভাপতি শঙ্কর দে ভৌমিক, বেদান্ত মঠের অধ্যক্ষ স্বামী সুদর্শনানন্দ মহারাজ, মেয়র পারিষদ দেবাশিস কুমার, স্থানীয় বিধায়ক স্মিতা বক্সি ও চিত্র পরিচালক রাতুল গঙ্গোপাধ্যায়।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here