পায়েল সামন্ত

আমাদের বাংলার মাটি বাংলার জল এখন কর্পোরেটশাসিত। অনলাইন কেনাবেচা আর শপিং মল সংস্কৃতির থাবায় জর্জরিত আমাদের নিজস্ব কৃষ্টি ও সংস্কৃতি। মধ্যবিত্তের ড্রয়িংরুম আলো করে থাকা সস্তার চিনা খেলনা আর ফাইবার-প্লাস্টিকের হরেক সামগ্রী তারই সাক্ষী। তবে কি ছিন্নমূল বাঙালির পাশ্চাত্য অনুকরণ আর চুঁইয়ে পড়া অর্থনীতি থেকে বেরোনোর উপায় নেই?

বাঙালির মুখে সে প্রশ্নে্র উত্তর জোগাতেই শনিবার থেকে কলকাতায় শুরু হয়েছে গ্রাম কৃষ্টি উৎসব। বঙ্গবাসী কলেজে ‘উইভার্স আর্টিজান অ্যান্ড পারফর্মিং আর্টিস্টস গিল্ড’ বা সংক্ষেপে ‘ওয়াপাগ’-এর বার্ষিক সম্মেলন উপলক্ষে তিন দিনব্যাপী এই উৎসব তথা মেলার আয়োজন। এই মেলাতে এসে ফের মনে হতেই পারে নিজেদের ফেলে আসা সাবেক দিনগুলোর কথা, যখন আজকের হারিয়ে যাওয়া সুতোর শাড়ি, বাংলার নিজস্ব কাঠের মুখোশ বা মাটির পুতুলই ছিল আমাদের একান্ত পরিচায়ক।

আর পাঁচটা মেলার থেকে এই মেলাটা আদ্যন্ত আলাদা বললে খুব একটা দোষের হবে না। বিকিকিনির এই পসরাতে এসে ফেলে আসা সেই স্বদেশি আমলের কথা মনে পড়তেই পারে। হৃদয়ের রিংটোনে বেজে উঠতেই পারে, “মায়ের দেওয়া মোটা কাপড় মাথায় তুলে নেরে ভাই” কিংবা “আমার সোনার বাংলা।” মেলার তরফে বিশ্বেন্দু নন্দ খবর অনলাইনকে জানালেন, “কলেজে কলেজে এ রকম মেলার আয়োজন করা উচিত। এত দিন গ্রামের টাকা শহরে আসত। গ্রামে এক পাতা শ্যাম্পু কিনলেও সেটা শহরেই আসত। এ বার গ্রামীণ মানুষের অর্থনৈতিক অধিকার চাঙ্গা করে শহরের টাকা গ্রামে যাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। গ্রামীণ মানুষের অর্থনৈতিক অধিকার রক্ষার আন্দোলন তবেই সার্থক হবে।” রবিবার সকালেই পদযাত্রা সহকারে সে দাবির কথা বলা হয়েছে।

ইতিহাসটাও তো তাই। কর্পোরেট উৎপাদন ব্যবস্থা তখন কোথায়? গ্রামের উৎপাদকেরাই নিজেদের প্রযুক্তিতে আর নিজেদের উদ্ভাবনী ক্ষমতায় এক সময় বাংলার বাজার শাসন করত। শুধু তা-ই নয়, বহির্বিশ্বের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্কও বজায় রাখত।

বাংলার রেশম বা তসরের জগৎজোড়া নামের কথা আমরা শুনেছি। কিন্তু ক’জন জানি, দেশি তুলোর চরকায় কাটা সুতোর কথা বা প্রাকৃতিক রঙে ছোপানো তাঁতের লিনেনের কাপড়ের কথা? অথচ এ সবই আমাদের বাংলার ঐতিহ্য ও কৃষ্টি। হারিয়ে যাওয়া কারুশিল্পকে ফিরিয়ে আনার এই উদ্যোগে আজ শহর কলকাতার বুকে হাজির হয়েছেন হরিপদ বসাক। সঙ্গে সেই সব শাড়ি, কত নাম তাদের — নীলাম্বরী, পীতাম্বরী, শ্বেতাম্বরী, রক্তাম্বরী।

কৃষ্ণনগর রাজবাড়ির ঢেঁকিছাঁটা হেতুমারী চাল, বা কালোভাত চাল যাঁরা এক বার খেয়েছেন, তাঁরা জানেন সে কী অনির্বচনীয় স্বাদ! এমন অনেক কিছুর সন্ধানই মিলবে মেলাপ্রাঙ্গণে। বেহালা চৌরাস্তার প্রান্তিক বাগচী খোঁজ করছিলেন বাংলার হারিয়ে যাওয়া খাবার-দাবারের। তিনিই জানালেন, “পিৎজা, চাউমিনের ককটেলে খুব একঘেয়ে লাগছে। তাই তুলাইপাঞ্জি চাল কিনলাম। শুনেছিলাম এই চালের কথা। এ বার কিনলাম।”

পোস্টারে লেখা রয়েছে, এই মেলা নাকি গ্রাম শহরের আদানপ্রদান। সত্যিই কি তাই? কাতরী দেবশর্মার পাটজাত দ্রব্যের সম্ভার — রকমারি ব্যাগ থেকে বিভিন্ন অলংকারের চোখজুড়োনো অসাধারণ সব সংগ্রহ আপনার শহুরে পছন্দকেও চমৎকৃত করবে! শিল্পের মাপকাঠিতে বিচার করে দেখবেন পোড়ামাটির তুলসীমঞ্চ, মায়াবী টেরাকোটা বা উত্তরবঙ্গের মাটির কাজ! নেপাল সূত্রধরের ছৌ বা সাঞ্জুলাল সরকারের কাঠের মুখোশ আপনার ড্রয়িংরুমের বর্তমান আর ভবিষ্যৎ পালটে দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট। সে জন্য আর দামি পেন্ট করার দরকার পড়বে না! প্লাস্টিকের সস্তার সামগ্রী ব্যবহারের বদলে বাঁশ বা শোলার জিনিস ব্যবহার শুধু রুচির পরিচয় নয়, আপনার বুদ্ধিরও পরিচয় দেয়। তাই নজরে রাখুন এগুলোও।

এই মেলা পুজো-উদ্যোক্তাদের জন্য সুবর্ণ সুযোগ তো বটেই। এই সব শিল্পকলা নিয়ে একটি বার মণ্ডপসজ্জায় হাত দিলেই সেরার প্রাইজ বাঁধা। মধুমঙ্গল মালাকারের শোলার মুখোশ, পিনাক টুডুর বাঁশের কাজ দিয়ে আগামী পুজো মণ্ডপে সবাইকে চমকে দেওয়া যেতেই পারে! প্রখ্যাত ভেষজ চিকিৎসক নারায়ণ মাহাতোর গ্রামচিকিৎসা শিবিরে পাবেন নানা টোটকার সুলুকসন্ধান।

পশ্চিমবঙ্গের নানা জেলার এমন নানা কৃষ্টির সম্ভার এক ছাদের তলায় দেখতে পাওয়াটা কম কথা নয়। তবে নিছক মেলা দেখার থেকেও বড় আনন্দ পাবেন এখানে। হারিয়ে যাওয়া জিনিস ফিরে পেলে যেমন আনন্দ হয়, তেমনই আনন্দ। গ্রাম বাংলার কৃষ্টি আর সংস্কৃতি বাঁচিয়ে রাখার এই আন্দোলনকে কুর্নিশ আর এই উদ্যোগকে স্বাগত জানানোর আনন্দ নিতে এক্ষুণি চলে আসুন।

উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য দিন !
আপনার নাম লিখুন