payel samanta
পায়েল সামন্ত

বারাসতে লোকগানের একটি জমজমাট অনুষ্ঠানে এসে বিশিষ্ট ভাওয়াইয়া শিল্পী ও গবেষক ডঃ সুখবিলাস বর্মা দেখলেন সেখানে উপস্থিত যন্ত্রবাদকদের মধ্যে একজনের কাছেও দোতারা নেই। শিল্পীর গলায় আক্ষেপ ঝরে পড়ল- দোতারা ছাড়া ভাওয়াইয়া হবে কী করে? লোকসংস্কৃতির যে অবক্ষয় হচ্ছে ক্রমাগত, তা সে দিন শিল্পীর বক্তব্যে উঠে এসেছিল।

হ্যাঁ, সময় ও পরিস্থিতির প্রভাবে এ ভাবেই মাটির সুর হারিয়ে যাচ্ছে। তার জায়গা নিচ্ছে নানা আধুনিক বাদ্যযন্ত্র আর প্রযুক্তি। নিজস্ব কৃষ্টি ভুলে পাশ্চা্ত্যপ্রীতির জোয়ারে বাঙালির গানের খাতা ভরা পপ, রকে। আবাসউদ্দিনের চেয়ে শাকিরার নাম বেশি জানে মহল্লার ছেলেপুলে। গুপি গায়েন-বাঘা বায়েনের বাংলায় আজ বাদ্যযন্ত্র বলতে গিটার, সিন্থেসাইজার!

অথচ লোকগান আর তার অচিন সুর আমাদের শিকড় আর সংস্কৃতির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে। তাই শেকড়ের সুর ফেরাতে এক অভিনব উদ্যোগ নিয়েছেন কয়েকজন তরুণ। যে প্রযুক্তির ঠেলায় দোতারার মতো লোকবাদ্য প্রান্তিক হতে চলেছে, সেই প্রযুক্তিকেই হাতিয়ার করে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সৌমেন্দু দাসের উদ্যোগে এই তরুণরা ফেসবুকে খুলেছেন ‘দোতারা বাজাই’ গ্রুপ। ২০১৫ থেকে যা্ত্রা শুরু করে ৩ হাজারের বেশি সদস্য নিয়ে এই অনলাইন গ্রুপ শুধু এপার নয়, ওপার বাংলাকেও সুরে সুরে জুড়ছে। না, কে্বল দোতারা বাজিয়েই এঁরা ক্ষান্ত হন না। বরং প্রায় হারিয়ে যেতে বসা এই বাদ্যযন্ত্র নিয়ে রীতিমতো চর্চা এবং দস্তুরমতো গবেষণাও করেন তাঁরা।

ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়ার মতো গানে দোতারার প্রয়োগ খুবই প্রয়োজনীয়। দুটি তারের সমন্বয় ছাড়াও দোতারা হয় বৈকি! ক্ষেত্রবিশেষে তারের সংখ্যা বাড়লেও নামটি থেকে যায় এই দোতারা। এই দোতারা কোথায় কিনবেন, কোথায় শিখবেন থেকে শুরু করে যাবতীয় পরামর্শ এই ফেসবুক পেজে দেওয়া হয়। মাঝে মাঝে হাতেকলমে দোতারা শেখানোর কর্মশালার আয়োজন করে এই গ্রুপ। গত ২৬ জানুয়ারি কলেজ স্কোয়ারে হয়ে গেল এমনই এক দোতারা শেখার কর্মশালা। বিশিষ্ট রিয়েলিটি শো সারেগামাপার জনপ্রিয় মুখ তীর্থ এবং বাংলা ব্যান্ড দোহারের অমিত সুর, বাংলাদেশ টিভির সুমন হোসেন ছিলেন এই কর্মশালায়। ইতিমধ্যে ভারতের বাইরে বাংলাদেশেও দুবার হয়েছে দোতারা বাজাইয়ের কর্মশালা।

কখনও এই ফেসবুক পোস্টকে ঘিরে দাঙ্গা বেঁধে যায় তো কখনও উন্মাদনা। এমন পরিস্থিতিতে ফেসবুককে এমন সংস্কৃতির কাজে লাগানো অভিনব উদ্যোগ বলে মনে করেন সৌমেন্দুর দল। সৌমেন্দু খবর অনলাইনকে জানালেন, ‘ঢাকার এফএম প্রচারতরঙ্গে এই গ্রুপের এক সদস্যের সাক্ষাৎকার প্রচারিত হয়েছে। কলকাতার থেকে এবার দোতারার সুর ছড়াতে রানাঘাট এবং সিঙ্গুরে কর্মশালা করার কথা ভাবা হচ্ছে।’

বিশ্বায়নের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে যেখানে সঙ্গীতচর্চা মানে ইউটিউব শোনা বোঝায়, সেখানে দোতারা শেখার জন্য কেন এই ফেসবুক গ্রুপ খোলার কথা মনে হল? সৌমেন্দু জানালেন, “আমি নিজে যখন দোতারা শিখতে এগিয়েছিলাম, তখন প্রচুর সমস্যার মুখে পড়েছিলাম। কোথায় শিখব, কীভাবে শিখব বা কীভাবে বাদ্যযন্ত্রটা কিনব, ঠিকঠাক কিনতে পারব কিনা- এত সব সংশয় পেরোতে গিয়ে বুঝেছি লোকে কেন দোতারা শিখতে আগ্রহ হারাচ্ছে। তাই এই সমস্যা কাটাতেই অনলাইন গ্রুপ খুললাম। এখন তো আমাদের গ্রুপের ৮০শতাংশ সদস্যই বাংলাদেশের। বলতে পারি, ভারত বাংলাদেশ একজোট হয়েছে দোতারার জায়গায়।”

শুধু বাংলাদেশ নয়, অনলাইনে দোতারার সুরের খুঁটিনাটি শিখছেন অস্ট্রেলিয়াবাসী তারিক আহমেদ এবং আমিন রহমানও। ফেসবুকে দোতারা বাজাই সন্ধান করলেই পাবেন সব তথ্য। আপনি চাইলে ঘরে বসে বাদ্যযন্ত্র শিখে যাবেন অনায়াসে। নানারকম দোতারা শেখার ভিডিও দেখে পুরো পরিষ্কার হয়ে যাবে যে কোনও আনাড়ি লোকেরও। হায়দরাবাদ কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ইন্তাজ আলি, বাংলাদেশের গায়ক বিপুল শীল থেকে রানাঘাটের দোতারা প্রস্তুতকারক মিঠুন হালদার সকলেই এখানকার সদস্য। নকশালবাড়ির নির্মল রায় দোতারা তৈরি করেন। ওখানকার কারও দোতারা কেনার ইচ্ছে থাকলে অনায়াসে ফোনে যোগাযোগ করতেই পারেন। সবটাই ফেসবুকে দেওয়া আছে। আবার দোতারা শেখাবার গুরুর সন্ধানও মেলে। একবার খুঁজে দেখুন। পেয়ে যাবেন সুভাষ বর্মণ বা দেবব্রত দের মতো দোতারা বাদককেও।

সেদিন বারাসাতে দোতারা বাদক পাওয়া যায়নি। সুখবিলাস বর্মা শিল্পীদের হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করেছিলেন। কিন্তু আসলে তো শিল্পীরা হারিয়ে যাননি। তাঁরা আছেন। তাঁদের খুঁজে দেওয়ার জন্যই সাধুবাদ ‘দোতারা বাজাই’কে।

1 মন্তব্য

উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য দিন !
আপনার নাম লিখুন