কলকাতা: সঙ্গীতের কোন ধর্ম নেই। আজানের হোক বা কীর্তনের সুর, আদতে তা আত্মনিবেদনের আর্তি। সুরের নেই সীমানা, নেই ধর্মাচরণের দায়। বহুশ্রুত এই কথাগুলির পুনরাবৃত্তির প্রয়োজনীয়তা শেষ হয় না। যেমন ভারতের হিন্দুস্তানি সঙ্গীত অর্থাত উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের চর্চার মধ্যে শুধু হিন্দু ওস্তাদরা নেই বরং মুসলমান ওস্তাদরাই এর মূল ধারকবাহক। ওস্তাদ, পৃষ্ঠপোষক, সমঝদারদের মিলমিশেই বহমান ভারতীয় উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের নিয়ত সৃজনশীল বিপুল ভাণ্ডার।

আগামী ৬ ডিসেম্বর থেকে সেন্টার ফর স্টাডিস ইন সোশ্যাল সায়েন্স- কলকাতা, ইন্ডিয়া ফাউন্ডেশন ফর দ্য আর্টস – বেঙ্গালুরুর উদ্যোগে এবং ভারতের সংষ্কৃতি মন্ত্রকের সহযোগিতায় একটি প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছে। ‘দ্য স্কলার মিউজিশিয়ান অ্যন্ড দ্য সেনি উস্তাদস: এক্সপ্লোরিং এন্ড এক্সহিবিটিং দ্য বীরেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী কালেকশন’ শীর্ষক প্রদর্শনীটি হবে যদুনাথ ভবন মিউজিয়াম অ্যান্ড রিসোর্স সেন্টারে (১০ লেক টেরেস, কলকাতা)। ৭ ডিসেম্বর থেকে প্রদর্শনীটি সাধারণের জন্য খুলে দেওয়া হবে। চলবে ২০ তারিখ পর্যন্ত।

তানসেন ঘরানার ওস্তাদরা (সেনি ওস্তাদ) অবিভক্ত বাংলার উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের চর্চা এবং বিকাশের ক্ষেত্রে বিশেষ প্রভাব বিস্তার করেন। ১৮৫৭ সালের পর ভারতে যে রাজনৈতিক টানাপোড়েন শুরু হয় তাতে দিল্লি-লখনউ কেন্দ্রিক সঙ্গীতচর্চায় ছেদ পড়ে। ওস্তাদরা ভারতের নানা অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েন। অবিভক্ত বাংলার ময়মনসিংহ জেলার গৌরীপুরের জমিদার ব্রজেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী সেনি ঘরানার ওস্তাদদের বিশেষ পৃষ্ঠপোষকতা দেন। নিজের ছেলে বীরেন্দ্রকিশোর ছাড়াও সম্ভাবনাময় ছাত্রদের সঙ্গীত শিক্ষার ব্যবস্থা করেন তিনি।

তানসেনের পুত্রকুলের শেষ বংশধর রবাবিয়া মহম্মদ আলি খান বৃদ্ধ বয়সে গৌরীপুরে আসেন, তাঁর কাছে সরাসরি তালিম নেওয়ার সুযোগ হয়েছিল জমিদারপুত্র বীরেন্দ্রকিশোরের। এছাড়া ওস্তাদ ইমদাদ খানের পুত্র এনায়েত খান (বিলায়েতের পিতা)ছিলেন গৌরীপুর সঙ্গীতসভার উজ্জ্বলতম নক্ষত্র। ব্রজেন্দ্রকিশোরের নাতি বিমলাকান্ত রায়চৌধুরী দীর্ঘদিন এনায়েত খানের কাছে সেতারবাদনের তালিম পান। গৌরীপুর সংস্পর্শে আসেন সরোদিয়া হাফিজ আলি খান এবং আলাউদ্দিন খানের মত কিংবদন্তীরা।

বীরেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী

বীরেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর হাতে লেখা নোটস, স্বরলিপি, বই, পত্রিকা, রেডিও রেকর্ডিং (আকাশবাণীতে প্রচারিত) ইত্যাদিতে ধরা আছে অবিভক্ত বাংলায় হিন্দুস্তানি সঙ্গীত চর্চার বিবর্তনের নানা দিক। এই সংগ্রহ-সম্ভার নিয়েই মাল্টিমিডিয়ার ব্যবহারে তৈরি হয়েছে ‘দ্য স্কলার মিউজিশিয়ান অ্যন্ড দ্য সেনি উস্তাদস: এক্সপ্লোরিং এন্ড এক্সহিবিটিং দ্য বীরেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী কালেকশন’ শীর্ষক প্রদর্শনীটি। বীরেন্দ্রকিশোরের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার স্মরণকথা ও নথিগুলির পাঠ, ভারতীয় সঙ্গীত তথা সংষ্কৃতি চর্চা বহুত্ববাদী স্রোতস্বিনী ধারাটির বিবর্তন ও গভীরতাকে উন্মোচন করবে বলে আশা করছেন উদ্যোক্তারা। বাংলার নবজাগরণের সময় ও তার পরবর্তীতে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতচর্চা কীভাবে বঙ্গ নাগরিক পরিসরে জায়গা করে নেয় তার আভাস পাওয়া যায় এই ফিরে দেখার মধ্যে।

পণ্ডিত রবিশঙ্কর তাঁর রাগ-অনুরাগ বইতে উল্লেখ করেছেন, অবিভক্ত বাংলায় ময়মনসিংহ-র জমিদাররা ভারতীয় উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের বিশেষ ‘সেবা’ করেছেন। ওস্তাদরা মুসলমান না হিন্দু সে বিচার না করেই তাঁরা হিন্দুস্তানি সঙ্গীতের প্রসারে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছেন। উদ্যোক্তারা আশাবাদী, বীরেন্দ্রকিশোর ও গৌরীপুরের স্মৃতিচারণের মধ্যে দিয়ে ভারতীয় সংস্কৃতি চর্চার ধর্মনিরপেক্ষ ধারাটির বর্ণময় ইতিহাসের স্পর্শ পাবেন প্রদর্শনী দেখতে আসা মানুষ।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here