ওয়েবডেস্ক: বছরটা ভারত আর ফ্রান্স- এই দুই দেশের মৈত্রী উদযাপনের। তা-ও আবার ৭০ বছরের। প্রায় ৬টি যুগ অশান্ত বিশ্ব-রাজনীতিকে তফাতে রেখেই পরস্পরের সঙ্গে মত আর সংস্কৃতি বিনিময় করে কাটিয়ে দিল এই ছবির আর কবিতার দেশরা। ফলে, ২০১৮ সালে ফ্রান্সের উদ্যোগে এই দেশ যে এক ভ্রাম্যমাণ সাংস্কৃতিক মঞ্চ পাবে বুঁজুর ইন্ডিয়া নামে, তাতেই বা আশ্চর্য কী! আর সেই সূত্র ধরে আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলায় ফ্রান্স যখন তৃতীয় বার ফোকাল থিম কান্ট্রি হিসাবে উপস্থিত হল ডিজিটাল নজরানা নিয়ে, তখন এক দল ফরাসি কবি-সাহিত্যিকও যে বইমেলার ধুলোয় মিশিয়ে দেবেন তাঁদের পায়ের ধুলো- সেও তো জানা কথাই!

কিন্তু হিসাবের বাইরেও থেকে যায় অন্য এক দুনিয়াদারি। সেখানে কোনো নিয়ম-কানুন খাটে না। কেবল অবাক হয়ে শুনতে হয় কান পেতে, হৃদয়ের কলসটি পূর্ণ করে নিতে হয় শব্দের ঝরনাতলার নির্জনে। সেই যোগসূত্রটি যে ভাবে বৃহস্পতিবার কলকাতা বইমেলার প্রধান সভাঘরে তৈরি করে দিল দুই দেশ, সত্যি বলতে কী, সেটাই বইমেলার সেরা পাওনা।

আরও পড়ুন: বইয়ের পাতা উল্টালেই ছবিরা জীবন্ত, নিজেকে খুঁজে নিন ভার্চুয়াল দুনিয়ায় বইমেলায় ফ্রান্সের প্যাভিলিয়নে

তবে, প্রদীপ জ্বালানোর আগে সলতে পাকানোর একটা পর্ব থাকেই। আনুষ্ঠানিক পরিভাষায় যাকে বলি উদ্বোধন। কলকাতা বইমেলার সাহিত্যিক উৎসবটিও তাই উদ্বোধন দিয়েই শুরু হল। যে অনুষ্ঠানে এক দিকে যেমন উপস্থিত ছিলেন ক্রিশ্চিয়ান গার্সিন, সেবাস্টিয়ান অরটিজ, জেরার্ড মদাল, জঁ ক্লদ পেরার, কাতিয়া লেজেরেত, ম্যাকেঞ্জি অরসেল, ফিলিপ ফরেস্ট, সাবাইন ওয়েসপিয়েসার, সুমনা সিনহার মতো ফরাসি এবং ফরাসি ভাষায় লেখালিখি করা কবি-সাহিত্যিকরা, তেমনই চিণ্ময় গুহর মতো এই শহরের বিশিষ্ট ফরাসি সাহিত্যবিদরাও। অনুষ্ঠানটিকে গতানুগতিকতার ধারা থেকে মুক্তি দিয়েছিল সাবাইন ওয়েসপিয়েসারের রম্য উদ্বোধনী কথন-শৈলী।

এর পরেই অনেকটা অনিবার্য ভাবেই প্রসঙ্গ আসে ভারত আর ফ্রান্সের পরস্পরের উপরে সাহিত্যিক প্রভাবটি নিয়ে। একে এড়িয়ে যাওয়ার যেমন উপায় হয় না, তেমনই অর্থও হয় না। ফলে বইমেলার সভাঘরে দুই দেশ একে অন্যকে কতটা প্রভাবিত করেছে এবং করছে- তারই খতিয়ানে ঊর্বশী বুটালিয়ার সঞ্চালনায় শব্দের সেতু রচনা করলেন অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী, ফিলিপ ফরেস্ট, ক্রিশ্চিয়ান গার্সিন, চিণ্ময় গুহ এবং ভাল ম্যাকদারমিদ। যদিও এই আলোচনা অনেকটাই ফরাসি ভাষা জানা মননশীল পাঠকের জন্য, তবুও বিশ্লেষণী আঙ্গিকে তা ফরাসি না জানা মানুষের মনে হাহাকার তোলে। একটা অতৃপ্তি জাগিয়ে দেয়- কেন ভাষাটি রয়ে গেল অধরাই! তা না হলে তো সুরার মতো ফরাসি দেশের সাহিত্যের নেশাতেও মজতে পারা যেত!

kolkata book fair

যদিও তার পরের অনুষ্ঠানে কোনো অতৃপ্তির জায়গা রাখেনি ফ্রান্স। বিষয় নির্বাচনেই এই দেশ মাতিয়ে দিয়েছে বইমেলার সাহিত্যিক উৎসবকে। অশান্ত এই বিশ্বে যে ভাবে ক্ষয়ে যাচ্ছে সহিষ্ণুতা, যে ভাবে ব্যক্তিবিশেষের মতপ্রকাশের অধিকারকে ঢেকে দিচ্ছে নির্বোধের সমবেত রব, তারই কথা তুলে ধরল এই আলোচনাচক্রের বিষয়- শোনার অধিকার, নানা গোষ্ঠীর নানা বক্তব্য যা পরিবেশিত হয়েছে সাহিত্যের উঠোনে। কান পেতে থাকাটাও যে কতটা জরুরি, অনর্থক কথা না বলে অন্যকে বলার সুযোগ করে দেওয়াও যে এই সভ্যতারই অঙ্গ, তা সাহিত্যের নিদর্শন দিয়ে তুলে ধরলেন হাঁসদা শোভেন্দ্র সরকার, সুদীপ চক্রবর্তী, সঞ্জয় হাজারিকা, তারা উইঞ্চ, ম্যাকেঞ্জি অরসেল এবং সুমনা সিনহা। আলোচনাচক্রটি উজ্জীবিত হয়েছিল সুজয় ভট্টাচার্যর সঞ্চালনায়।

বৃহস্পতিবার কলকাতা বইমেলার সাহিত্যিক উৎসবে সে দিনেকর মতো শেষ যে বিষয়টি উপস্থাপিত হল ফ্রান্সের হাত ধরে, তা এক দিকে যেমন আকর্ষণীয়, অন্য দিকে তেমনই প্রয়োজনীয়ও। তা হল বিশ্বের শব্দ, দ্য নয়েজ অব দ্য ওয়ার্ল্ড! শব্দ ছাড়া এই পৃথিবী যে কতটা অর্থহীন হয়ে যায়, তারই অভিজ্ঞান যেন এই আলোচনাচক্র। অ্যানি তেরিয়ার, ক্রিশ্চিয়ান গার্সিন, ম্যাকেঞ্জি অরসেল, জেনি ব্রাউনের মতো সাহিত্যিকদের সঙ্গে সঞ্চালক জেরার্ড মদালের মুখের শব্দে যেন নতুন করে প্রাণ পেল দুই দেশের সাহিত্য।

সেই সঙ্গে মনে রেখে গেল এই সব আলোচনাচক্র থেকে পাওয়া স্মৃতির শব্দের ঝঙ্কার! যা প্রতিনিয়ত কলকাতা বইমেলার সাহিত্যিকের উৎসবে ভারত আর ফ্রান্সের যুগলবন্দির তরানার মতোই বিরাজ করবে!

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here