নয়াদিল্লি : এই প্রথম কোনো সরকারি নথিতে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের সামাজিক মিলনের অধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়ার কথা বলা হল।  তৃতীয় লিঙ্গের জন্য সরকারের তৈরি খসড়া বিলে বিবাহ, বিবাহবিচ্ছেদ ইত্যদির মতো বিভিন্ন নাগরিক অধিকারের কথা না থাকায় ওই সরকারি নথিতে তার সমালোচনা করা হল। নথিটি তৈরি করেছে বিজেপি সাংসদ রমেশ বইসের নেতৃত্বে ৩১ সদস্যের একটা সংসদীয় কমিটি। কমিটির রিপোর্ট লোকসভায় পেশ করা হয়েছে।

সামাজিক ন্যায়বিচার এবং ক্ষমতায়ন বিষয়ক ওই কমিটি ‘দ্য ট্রান্সজেন্ডার পারসনস (প্রোটেকশন অব রাইটস) বিল ২০১৬’ তথা ‘তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ (অধিকার সুরক্ষা) বিল ২০১৬’-এর ওপরে রিপোর্টটি তৈরি করেছে। এই খসড়া বিলটি ২০১৬ সালের আগস্ট মাসে সংসদের নিম্ন কক্ষে পেশ করা হয়েছিল।

রিপোর্টে বলা হয়েছে, আলোচ্য খসড়া বিলে তৃতীয় লিঙ্গের নাগরিক অধিকারগুলিকেই এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। বিবাহ, বিবাহ বিচ্ছেদ, পরিবার, সন্তান দত্তক নেওয়ার মতো অধিকারগুলোর কথা বিলে নেই। এর দ্বারা তাঁদের ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারা অনুযায়ী অপরাধী আখ্যা দেওয়ার মতো পরিস্থিতিতে ফেলে দেওয়া হয়েছে। কারণ, এই সবের অধিকার তাঁদের দেওয়া না হলেও বাস্তবে তৃতীয় লিঙ্গের এমন অনেক মানুষ আছেন যাঁরা পরিবার, বিবাহ সম্পর্ক, সন্তানপালন করছেন, অথচ রাষ্ট্রের কাছে এর কোনো আইনগত স্বীকৃতি নেই।

রিপোর্টে বলা হয়েছে, বিবাহ, যৌনজীবন ইত্যাদির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিশেষ কয়েকটি বিষয়ে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের কোনো অধিকারই সুরক্ষিত নেই। তাঁদের এই অধিকার নির্দিষ্ট আইন করে বা নিয়মসম্মত ভাবে দেওয়া উচিত। এমন অনেকেই আছেন যাঁরা এই সবের সঙ্গে যুক্ত। সে ক্ষেত্রে তাঁরা ভারতীয় দণ্ডবিধি অনুযায়ী ‘প্রাকৃতিক নিয়মবিরুদ্ধ’ কাজে জড়িত বলে অপরাধী সাব্যস্ত হবেন। এমনকি তাঁদের আজীবন কারাবাস বা জরিমানার মতো শাস্তিও হতে পারে।

শুধু তা-ই নয়, এই রিপোর্টের ভূমিকায় তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের উদ্দেশে বলা হয়েছে, এই লড়াইয়ে তাঁরা একা নন। একটা ঐতিহাসিক পট পরিবর্তন হতে চলেছে। তাঁদের ওপর হওয়া অত্যাচার ও বৈষম্যের সমাপ্তি হতে চলেছে। তৃতীয় লিঙ্গের মানুষরা ব্যতিক্রম নন। মানবজীবনে এটা একটা বাস্তব অঙ্গ।

তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের সম্পর্কে সরকারি অবস্থানের বাইরে গিয়ে সংসদীয় প্যানেলের রিপোর্টে বলা হয়েছে, সমকামী, উভকামী, রূপান্তরকামী, ইত্যাদি কোনোটা হওয়াই লজ্জার বিষয় নয়। বরং ধর্মান্ধ, গোঁড়া মানসিকতার মানুষ হওয়াটাই লজ্জা আর অসম্মানের।

একই সঙ্গে এই গোত্রের মানুষদের জন্য বিকল্প পারিবারিক কাঠামোর বিষয়েও দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে ওই রিপোর্টে। বলা হয়েছে, এই সম্প্রদায়ের মানুষরা যাতে রূপান্তরকামী ছেলেমেয়েদের দত্তক নিতে পারেন, তা যাতে অপরাধ বলে সাব্যস্ত না হয় সে সম্পর্কেও উপযুক্ত ব্যবস্থা করতে হবে। বলা হয়েছে, এই বিলের নিরিখে পরিবারের সংজ্ঞা হওয়া উচিত — এক দল মানুষ রক্তের সম্পর্কে, বিবাহ বা তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের দত্তকের মাধ্যমে সম্পর্কযুক্ত।

বিলে ‘তৃতীয় লিঙ্গ’ শব্দটির যে সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে, রিপোর্টে তারও সমালোচনা করা হয়েছে। বিলে এঁদের বর্ণনা করা হয়েছে, না পুরোপুরি পুরুষ না পুরোপুরি মহিলা, পুরুষ-মহিলা মেলানো এবং না পুরুষ না মহিলা হিসেবে।  রিপোর্টে বলা হয়েছে, এঁদের সংজ্ঞা হওয়া উচিত, “মানুষ যাঁদের জন্মের সময় যে লিঙ্গের বলে বর্ণনা করা হয়, প্রকৃত লিঙ্গ তার সঙ্গে মেলে না; এঁদের মধ্যে পড়ে রূপান্তরিত-পুরুষ, রূপান্তরিত-নারী, বিচিত্র-লিঙ্গ এবং কিন্নর, হিজরা, অরাবানি, জোগতা প্রভৃতি সামাজিক-সাংস্কৃতিক অভিধাযুক্ত মানুষ।

ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারা সংশোধনের ব্যাপারে বিজেপির খুব অনীহা। সে দিক থেকে দেখতে গেলে বিজেপি সাংসদের নেতৃত্বাধীন এই কমিটির রিপোর্টের একটা অন্য গুরুত্ব আছে। ৩৭৭ ধারার বৈধতা অক্ষুণ্ণ রেখে সুপ্রিম কোর্ট ২০১৩ সালে বলেছিল, আইন পরিষদ যদি মনে করে তা হলে এই আইন সংশোধন করতে পারে। সে সময়ে দলের সভাপতি রাজনাথ সিং ভারতীয় দণ্ডবিধির ওই ধারাকে সমর্থন করে ওই ধারায় বর্ণিত কাজগুলিকে ‘অস্বাভাবিক’ বলে বর্ণনা করেছিলেন।

ভারতে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের সংখ্যা কত, তা ঠিক জানা যায় না। তবে ২০১১ সালের জনগণনা অনুসারে যাঁরা নিজেদের ‘আদার্স’ (অন্যান্য) গোষ্ঠীতে ফেলেছেন, অর্থাৎ যাঁরা নিজেদের পুরুষ বা নারী, কোনো হিসাবেই চিহ্নিত করেননি তাঁদের সংখ্যা ৪ লক্ষ ৮৭ হাজার। যদিও ২০১১ সালেই ‘স্যালভেশন অব অপ্রেসড ইউনাক্স’ নামের একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার গণনা অনুযায়ী এই সংখ্যা ১৯ লক্ষ।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here