saukarya ghoshal

ঘণ্টা কয়েক আগে সস্ত্রীক ফিরেছেন হায়দরাবাদ থেকে। সেখানকার বাংলা চলচ্চিত্র উৎসবে নির্বাচিত হয়েছিল তাঁর ‘রেনবো জেলি’। ঝোলায় পাঁচ পাঁচটা সেরার খেতাব নিয়ে ফিরেছেন শহরে। বৃষ্টিভেজা সন্ধেবেলায় পরিচালক সৌকর্য ঘোষালের সঙ্গে জমল আড্ডা খবর অনলাইনের তরফে মধুমন্তী চট্টোপাধ্যায়ের

দর্শকের প্রশংসা, পুরস্কার নাকি বাণিজ্য, সাফল্য বলতে কোনটা বোঝেন?

সৌকর্য: সব কটাই। দর্শকের ভালো লাগাটা অবশ্যই একটা সাংঘাতিক বড়ো পাওয়া। তবে ‘রেনবো জেলি’র ক্ষেত্রে আরেকটা জিনিস কিন্তু লক্ষ করার মতন। অনেক দিন পর হাউস নির্বিশেষে সব সংবাদমাধ্যম ছবিটা নিয়ে ইতিবাচক ফিডব্যাক দিয়েছে। আর তার সঙ্গে হায়দরাবাদে বিচারকদের চোখে এবং জনপ্রিয়তার নিরিখে দুই বিভাগেই শ্রেষ্ঠ ছবির সম্মান পেয়েছে। আর বাণিজ্যের কথা জানতে চাইলে বলব, আমাদের ছবি বড়ো ব্যানারের ছবির তুলনায় অনেক কম হলে মুক্তি পাওয়া সত্ত্বেও বেশ কিছু হাউসফুল শো হয়েছে। আবার হাউসফুল শো-এর পর দিনই ছবি হল থেকে তুলে নেওয়া হয়েছে, এমন ঘটনাও ঘটেছে।

বাংলা ছবি দর্শকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার পেছনে সোশ্যাল মিডিয়ার ভূমিকা ঠিক কী?

সৌকর্য: সোশ্যাল মিডিয়া যখন ছিল না, মানুষ কোনো ছবির সমালোচনা পড়তে পারত সংবাদপত্রে। এবং সেখানে একজন স্বঘোষিত চলচ্চিত্র সমালোচক একটি ছবির রিভিউ করতেন এবং পাঠক সেই রিভিউ পছন্দ করুন বা না করুন, মেনে নিতে বাধ্য হতেন। কারণ বিরুদ্ধমত প্রকাশের জায়গাটার অভাব ছিল। আমি যখন ছোটো ছিলাম, স্পষ্ট মনে আছে ‘ডিডিএলজে’র সমালোচনায় কোনো এক সংবাদপত্রে শোভা দে লিখেছিলেন, ‘অসভ্য শাহরুখ আর অভব্য কাজল’। সে দিন আমার খুব রাগ হয়েছিল। কিন্তু প্রতিবাদের প্ল্যাটফর্মটাই ছিল না আমার কাছে। এখন আছে। এখন এক জন দর্শক সিনেমা দেখে আর পাঁচ জনকে জানাতে পারছে সিনেমাটি ভালো লেগে থাকলে কেন লেগেছে, না লেগে থাকলে কেন লাগেনি। এতে আমাদের মতো পরিচালকদের সুবিধেই হচ্ছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় যখন ছবির প্রশংসা পাব, শেয়ার করতে থাকব, আর এক বার কেউ অন্য রকম মত জানালে বলব, ‘আজকাল তো সবাই ফিল্ম রিভিউ করে’, এটাকে আমি সমর্থন করি না। শুধু ফেসবুকে লিখে ‘রেনবো জেলি’র মতো লো বাজেট একটা ছবিকে ছ’ সপ্তাহ ধরে প্রেক্ষাগৃহে রাখাটা খুব ছোটো ঘটনা নয়।

বাংলা ছবি কোথায় দাঁড়িয়ে আছে বলে মনে করেন আপনি?

সৌকর্য: আমরা যদি খেয়াল করি বুঝব, হলিউড দশ বছর আগে যা যা করেছে, এখন বলিউড সেটা করছে। আবার টলিউড এখন যা কিছু করছে, বলিউড দশ বছর আগে সে সব করে ফেলেছে। প্রায় এক দশক পিছিয়ে আমরা ঠিকই। কিন্তু বলিউড এখন দাঁড়িয়ে বহুত্ববাদের ওপর। এই বহুত্ববাদ কিন্তু বাংলা ছবিতে আসতে শুরু করেছে। একটা উদাহরণ দিই। ‘দঙ্গল’ আর ‘বহুবলী’ মুক্তি পেল একই বছর। কোনো মিল নেই দু’টো ছবির মধ্যে। অথচ ব্যবসার নিরিখে দু’টো প্রায় সমান। সমান সংখ্যক দর্শক ছবিটা দেখতে হলে গিয়েছে। ঠিক একই ভাবে একটা বছরে বাংলায় ‘হামি’ ব্লক ব্লাস্টার, ‘উমা’ সুপারহিট। আবার এবং ‘ময়ূরাক্ষী’ও সুপারহিট(যেখানে এই সময়ের দুই প্রজন্মের দুই প্রবাদপ্রতিম অভিনেতা অভিনয় করছেন, পর্দায় সাধারণ মানুষের মতো কথা বলছেন এবং তার পরেও দর্শক হলে গিয়ে ছবিটা দেখছে)। হ্যাঁ আঙ্কিক হিসেব তাই বলছে। তাই এই তিন ধরনের ছবিকেই ইন্ডাস্ট্রির দিক থেকে সমান ভাবে উৎসাহ দেওয়া উচিৎ, যেটা হয়তো এখনও দেওয়া হচ্ছে না। বহুত্ববাদ কিন্তু বাংলা ছবিতে এসে গেছে। যে কারণে মানস মুকুলের মতো নতুন পরিচালক ‘সহজ পাঠের গল্প’ বানাচ্ছে, আমি আমার মতো করে ‘রেনবো জেলি’ তৈরি করার চেষ্টা করছি। ‘ভালোবাসার শহর’  ইউটিউবে মুক্তি পাওয়ার পর ভাইরাল হয়ে যাচ্ছে। এই সব ক’টা ছবি আলাদা আলাদা। বিষয় আলাদা, ট্রিটমেন্ট আলাদা। এটা কিন্তু কিছু দিন আগেও ছিল না। ভালো বাংলা ছবি বলতে যেগুলোকে চিহ্নিত করা হত, প্রত্যেকটা থাকত কমবেশি একই গতে বাঁধা। একই রকম কালার কারেকশন, একই লোকেশন।

a scene from rainbow jellyএ বার আপনার ‘রেনবো জেলি’র প্রসঙ্গে আসি। আপনি কি ছোটোদের ছবি বানাতে চেয়েছিলেন? নাকি স্পেশাল চাইল্ডদের নিয়ে ছবি বানাতে চেয়েছিলেন?

সৌকর্য: আমি একটা ছেলেবেলার ছবি বানাতে চেয়েছিলাম। আমাদের প্রত্যেকের মধ্যে একটা শিশু আছে। বড়ো হওয়ার সময় এত সফিস্টিকেশনের চাদর জড়াতে জড়াতে সেটা চাপা পড়ে যায়। আমি একটা ইউনিভার্সাল ছবি বানাতে চেয়েছিলাম। আমার মনে হয়েছে শৈশবটা আমাদের সবার মধ্যে কমন ফ্যাক্টর। একটা বারো বছরের ছেলের মধ্যেও আছে, আমার সমবয়সিদের মধ্যেও আছে, আবার এক জন সত্তর বছরের মানুষের মধ্যেও আছে।

ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্রে মহাব্রতকে দিয়ে অভিনয় করানোর সাহস আপনি দেখিয়েছেন। স্পেশাল চাইল্ডকে নিয়ে ছবি বানানোর চিন্তা কি সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে এসেছে? এক একটা ‘রেনবো জেলি’র পর দর্শক একটা ঘোঁতনকে মনে রাখবে। কিন্তু আর পাঁচটা ঘোঁতনের প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি পালটাবে?

সৌকর্য: প্রথম কথা, আমি কোনো সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে ঘোঁতনের চরিত্র তৈরি করিনি। আসলে আমি অনেক প্রশ্ন নিয়ে পৃথিবীটাকে দেখার চেষ্টা করি এখনও। একটা বাচ্চার মতো। আমার ছোটোবেলাটা খুব নিজের সঙ্গে কেটেছে। ঝুলের সঙ্গে, পিঁপড়ের সঙ্গে। অনেক জিজ্ঞাসা ছিল। মনে আছে অ-আ শেখার সময় মনে প্রশ্ন এসেছিল কেন এটাকে কেন অ বলে। বাবা বলেছিলেন, এটাকে অ  বলে, তাই বলে। ব্যাস, সেই তো আমাদের সবার মেনে নেওয়ার শুরু। দুইয়ে দুইয়ে যোগ করলে যে চার হয়, সেটা আমরা নিয়ম হিসেবেই মেনে নিই। আর যারা মেনে নেয় না, যারা প্রশ্ন করেই যায়, তাদেরই সমাজ ‘স্পেশাল চাইল্ড’ আখ্যা দেয়। ‘রেনবো জেলি’ তৈরির সময় আমরা একটা সমীক্ষা করতে গিয়ে জানতে পারি লিওনেল মেসি, আইনস্টাইন, ওয়াল্ট ডিজনি, পাবলো পিকাসো এঁরা সবাই স্পেশাল চাইল্ড। এঁদের আইকিউ কম ছিল? এঁরা প্রশ্ন করেছিল, কেউ সেটাকে দাবড়ানি দিয়ে গুঁড়িয়ে দিতে পারেনি। তাই একটা আলবার্ট আইনস্টাইন হয়েছে, একটা মেসি হয়েছে।

আরও পড়ুন : “রামচন্দ্র আজ থাকলে কখনোই বাবরি মসজিদ ধ্বংসের মতো ধর্মীয় নৃশংসতা মেনে নিতেন না”

স্পেশাল চাইল্ডদের প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি কতটা পালটাবে জানি না। সেটা আমার সৃষ্টির ক্ষমতার ওপর নির্ভর করছে। আমি ছবিটা করতে গিয়ে দেখেছি, মহাব্রতর জীবনটা এইটুকু সময়ের মধ্যে নাটকের মতো বদলে গেল। ও আগে নর্মাল স্কুলে পড়ত না, কারণ ও মুখস্থ করতে পারত না। সংলাপ মুখস্থ করে করে ওর সেই অভ্যেসটা তৈরি হল। পাঠভবনে পরীক্ষা দিল, এখন আর পাঁচজন বাচ্চার সঙ্গে এক সঙ্গে নর্মাল স্কুলে পড়ছে। খুব ব্যক্তিগত ক্ষেত্রে হলেও এটা আমার ছবির একটা সার্থকতা। আমি অনেক কিছু করতে পারতাম। রাস্তায় মিছিল করতে পারতাম, একটা স্কুলে পড়াতে পারতাম। আমার মনে হয়েছে যেটা আমি সব চেয়ে ভালো করতে পারি, সেটাই করেছি।

আপনার সব ছবিতেই (পেন্ডুলাম, লোডশেডিং, রেনবো জেলি) গানের একটা বড়ো ভূমিকা হয়। সংগীতের ভাষা কি চলচ্চিত্রের ভাষাকে অনেকটা এগিয়ে নিয়ে যায় বলে বিশ্বাস করেন?

সৌকর্য: আমি যে ধরনের ছবি করেছি সেখানে সংগীতের একটা বড়ো ভূমিকা আছে। আমার মনে হয় একটাও গান ছাড়া একটা ক্লাসিক তৈরি হতে পারে। আবার ছ’টা গান আছে, এমন ছবিতেও প্রত্যেকটা গান ভীষণ জরুরি হতে পারে। একটা উদাহরণ দিই। বলিউডের একটা ছবির কথা মাথায় আসছে- ‘মাসান’। ‘মাসান’-এ একটা গান আছে, ‘তু কিসি রেইল সি গুজারতি হ্যাঁয়/ ম্যায় পুল সা থরথরাতা হু’ , কিম্বা ‘মন কস্তূরী’ গানটা। এই গানগুলো একটা গোটা ছবিকে কেমন বেঁধে রেখেছে। এই গান দু’টো ছাড়া ‘মাসান’ হতই না। আবার উলটো দিকে যদি জাতীয় পুরস্কার পাওয়া মরাঠি ছবি ‘কোর্ট’ দেখেন আপনি, সেখানে নিঝুমতাকে ব্যবহার করা হয়েছে। গান ব্যবহার করলে সেটা বরং অপ্রয়োজনীয়।

বাংলা ছবি এবং ওয়ার্ল্ড মুভিজের ক্ষেত্রে কাদের ছবি আপনাকে অনুপ্রাণিত করে?

সৌকর্য: খুব ছোটোবেলায় আমি সিনেমার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার আগে সাহিত্য পড়েছি। লীলা মজুমদার, সত্যজিতের গল্প আমার ছোটোবেলাটা জুড়ে অনেক বেশি ছিল। আর সত্যজিতের প্রথম ছবি দেখি ক্লাস ফাইভে। ওঁর শেষ ছবি ‘আগন্তুক’ দিয়ে আমার ছবি দেখা শুরু। এবং এখনও ওঁর ছবি আমাকে খুব ভাবায়। সত্যজিত আর ঋত্বিকের মধ্যে পার্থক্যটা কোথায় জানেন? আমার যেন মনে হয় ঋত্বিকের ছবিগুলো একটা তরুণের চোখ দিয়ে পৃথিবীকে দেখা। আর সত্যজিতের ছবি দেখে এখনও আমার মনে হয়, একটা গোবেচারা ছেলের চোখ দিয়ে চারপাশটা দেখা। তারভোস্কি, মাজিদ মাজিদিও খানিকটা সেই পথেই হেঁটেছেন। ওঁদের দেখানো পথটাতেই আমি একটু ঘোরাফেরা করছি।

with wife puja
স্ত্রী পূজার সঙ্গে।

বাংলা ইন্ডাস্ট্রিতে ছোটোদের ছবির প্রযোজক পাওয়া এখন কতটা কঠিন?

সৌকর্য: আমি, আমার স্ত্রী যখন ‘রেনবো জেলি’ বানানোর কথা ভাবি, তখনও প্রযোজক পাওয়া কঠিন ছিল। তাই বাধ্য হয়ে আমাদের নিজেদেরকেই প্রোডিউস করতে হয়েছিল। কিন্তু ‘রেনবো জেলি’র পর পরিস্থিতি বদলেছে। এখন ছোটোদের ছবি বাজারে চলবে। প্রোডিউসার পেতে সমস্যা হবে না। এটা যে কোনো ইন্ডাস্ট্রিরই নিয়ম। নতুন কোনো ভাবনায় টাকা ঢালার লোক কম থাকে। সেটা ট্রেন্ড হয়ে গেলে আর সমস্যা থাকে না।

পরবর্তী ভাবনা কী?

সৌকর্য: এই মুহূর্তে দু’টো ভাবনা আছে। একটা হিউম্যান কমেডি করার কথা ভাবছি আমি আর পূজা (স্ত্রী)। আবার ‘দেশ’-এর যে কনসেপ্টে আমি বিশ্বাস করি সেটা নিয়েও একটি ছবি বানানোর পরিকল্পনা আছে। কোনটা আগে হয় দেখা যাক।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here