ashwini kumar and his book
didhiti ghosh
দীধিতি ঘোষ।

“অযোধ্যায় তো কোনো না কোনো সময়ে অবশ্যই যাব। কিন্তু মনে হল বেনারসটাই আগে ঘুরে আসি।”

“হঠাৎ বেনারসই বা কেন অশ্বিনীবাবু?”

“অযোধ্যা এখন একটা নির্বোধ রাজনৈতিক প্রকল্পে দাঁড়িয়ে গিয়েছে। তাই মানুষ এখন বেনারসে ছুটছে। নতুন রাজনৈতিক কল্পনা, সমসাময়িক ভারতের ব্যথাবেদনা আর আপাত-স্ববিরোধী চরিত্রের প্রতিনিধিত্ব করছে বেনারস।”

অশ্বিনী কুমার এক জন কবি, লেখক এবং টাটা ইনস্টিটিউট অফ সোশ্যাল সায়েন্সেস-এর এক জন অধ্যাপক। তাঁর প্রকাশিত বইগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘মাই গ্র্যান্ডফাদার্স ইমাজিনারি টাইপরাইটার’, ‘কমিউনিটি ওয়ারিয়র্স’ ইত্যাদি। তাঁর সাম্প্রতিকতম প্রকাশিত বইটির শিরোনাম ‘বানারস অ্যান্ড দি আদার’। সম্প্রতি কলকাতা ঘুরে গেলেন অশ্বিনী কুমার। যোগ দিয়েছিলেন আইসিসিআর-এ আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে। কলকাতার পাঠকদের কাছে তাঁর ‘বানারস অ্যান্ড দি আদার’ বইটিকে পরিচিত করানোর উদ্দেশ্যেই আয়োজিত হয়েছিল ওই অনুষ্ঠান।  ওই অনুষ্ঠানের ফাঁকেই কথা হল অশ্বিনীবাবুর সঙ্গে। কথা হল মূলত বেনারস নিয়েই। তাঁর কথায়, বেনারসের জীবনে ফিরে আসা মানে একটা বিশৃঙ্খল, তালগোল পাকানো জীবন, যেখানে রয়েছে বৈপরীত্যের সমাহার, যেখানে রয়েছে জনশ্রুতি আর নানা কানাঘুষো।

কথার শুরুতে নিজের নামের উচ্চারণ একটু মজা করলেন অশ্বিনীবাবু। বললেন, কখনও কখনও তাঁকে ‘আশওয়ানি’ বলেও ডাকা হয়। “এটা আমার মনে হয় পাঞ্জাব আর ওকলাহামার একটা মিশ্র বিজাতীয় ব্যাপার”।

অশ্বিনীবাবু লেখায় হিন্দুত্বের দৃঢ় আভাস রয়েছে। সে প্রসঙ্গে তুলতেই তিনি বললেন, “হিন্দুত্ব কী? হিন্দুত্ব হল একটা রাজনৈতিক মত, পরাক্রমের তাড়না, বিভেদের উদ্দীপনা, একচক্ষু সংখ্যাধিক্যের স্বৈরতন্ত্র। এই বেনারসকেও ঘিরে থাকে অনেক কিছু যা প্রতিষ্ঠিত হিন্দুত্বের মতোই। এই সব কথার স্বাধীন প্রকাশ  এক জোট হয়ে আসে রামকৃষ্ণ, বিবেকানন্দ, গান্ধী প্রমুখের বেনারস ভ্রমণের বলিষ্ঠ আখ্যান থেকে। রবীন্দ্রনাথও এসেছিলেন, কিন্তু তিনি ছিলেন অনেক বেশি নমনীয়।”

তা হলে বেনারস আর হিন্দুত্বের মধ্যে আরও কোথায় সন্ধি পাওয়া যায়?

অশ্বিনীবাবু বললেন, তাঁর লেখার সারমর্মেই তা বর্ণিত – “আমার কবিতাগুলো হল এক রকম বিচিত্র দার্শনিক বুনন। বেনারস একই সঙ্গে পবিত্র ও অপবিত্র। অনেকটা সৎ ও অসৎ হিন্দুত্বের মতো। এই দুই কুসুম আমার কাব্যে এক অস্বচ্ছন্দ যোগসূত্রে বাঁধা। আবুল ফজলের পারসি আভাসে বেনারস যেমন”।

তা হলে বেনারসকে বর্ষার জমাট মেঘের সঙ্গে তুলনা করা যায়, যে মেঘ প্রচণ্ড গরমে বর্ষার আভাস দেয়?

কবি-অধ্যাপকের কথায়, “আসলে বেনারস একটা কল্পনা। একটা রহস্যময় দ্বন্দ্ব, সাদাকালো মেঘের মতো। একটি কল্পনাতীত কাব্যরচনা। এটাই আমি কলকাতাকে দেখাতে চাই। বাঙালিরাও সর্বদাই জলপ্রবাহে অগ্রসরমান, অনেকটা বেনারসেরই মতো।”banaras and the otherবেনারসকে কি সমুদ্রের মুক্তোর সঙ্গে তুলনা করা যায় নাকি একটা পরমাণু বোমা, যা যে কোনো সময়ে বিস্ফোরিত হতে পারে?

“তা এখনও হয়নি। বেনারস হল এমন একটা ভবিষ্যৎ পরমাণু বোমা যা কখনোই বিস্ফোরিত হবে না। কিন্তু যার তেজস্ক্রিয়তা উৎপন্ন হবে বহুত্বের মধ্যে। বেনারস হল কোবাল্টের মতো এক দ্যুতিময় যৌন লেখনী।”

কথায় কথায় অশ্বিনীবাবুর নিজের শহর মুম্বইয়ের প্রসঙ্গ এল। জানতে চেয়েছিলাম, মুম্বইকে তিনি কী চোখে দেখেন? তাঁর কথায়, “মুম্বই হল একটা এমন শহর যেখানে বিভিন্ন স্তর রয়েছে এবং এই শহর ক্রমশ আধিপত্যবাদী হয়ে উঠছে। এক জড়ানো প্যাঁচানো কোলাহলের মতো – সাংহাই, শিকাগোর গগনস্পর্শী অট্টালিকার মতো। যা নতুন রূপে অভিব্যক্ত হয়, কিন্তু মাঝপথে গিয়ে যার সরলতা হারিয়ে যায়।”

হিন্দুত্ব সম্পর্কে তাঁর মতামত জানতে চেয়েছিলাম। জানতে চেয়েছিলাম হিন্দুত্ব অর্থের মতো তরল কি না? অশ্বিনীবাবু বললেন, “ধর্ম সত্যি সত্যি ধনের চেয়েও বেশি তরল হয়ে যাচ্ছে। রামচন্দ্র আজ থাকলে কখনোই বাবরি মসজিদ ধ্বংসের মতো ধর্মীয় নৃশংসতা মেনে নিতেন না। সব নির্যাতিত জাতির একই কথা – আমরা বেঁচে আছি কীসের জন্য, আমাদের দেশ তো আর রইল না।”

অশ্বিনীবাবু তাঁর বইয়ের এক জায়গায় লিখেছেন, বেনারস হল সকল প্রকার হিংস্রতার সমাধিস্থল। এ কথায় তিনি ঠিক কী বলতে চেয়েছেন জানতে চেয়েছিলাম।

তিনি বলেন, “এই ভাবে আমি চেয়েছি বেনারসের মূল সত্তাটি সকলের সামনে তুলে ধরতে। যে সময়ে রবীন্দ্রনাথ, মির্জা গালিব, স্বামী বিবেকানন্দ সেখানে গিয়েছিলেন, সে সময়ের আভাস, সারমর্ম তুলে ধরতে চেয়েছি যা হিন্দুদের কাছে হিমালয় পর্বতের মতো এবং ঈশ্বরের কাছে এক কর্মরত আশাবাদী মানবজাতির জন্মের মতো। আমার শেষ বাক্য – বেনারস এক কল্পনাময় জগৎ, এক রহস্যে মোড়া আত্মজীবনী, এক প্রহেলিকাময় অনির্বচনীয় স্রোতধারা।

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here