NIRENDRA NATH CHAKRABORTY
প্রেসক্লাবের একটি অনুষ্ঠানে মৃণাল সেন, অরুণ মিত্র, অন্নদাশঙ্কর রায়, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী এবং দুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়। ছবি: রাজীব বসু
Tapas Roy
তাপস রায়

অকস্মাৎ কে চেঁচিয়ে উঠল রক্তে ঝাঁকি দিয়ে/ “নিলাম নিলাম নিলাম”।

আমি তোমার বুকের মধ্যে উঁকি মারতে গিয়ে/ চমকে উঠেছিলাম।

অথচ কেউ কোথাও নেই তো, খাঁ খাঁ করছে বাড়ি,/ পিছন দিকে ঘুরে

দেখেছিলাম, রেলিং থেকে ঝাঁপ দিয়েছে শাড়ি/ একগলা রোদ্দুরে।

বারান্দাটা পিছন দিকে, ডাইনে-বাঁয়ে ঘর,/ সামনে গাছের সারি।

দৃশ্যটা খুব পরিচিত, এখনও পর পর/ সাজিয়ে নিতে পারি।

(দুপুরবেলায় নিলাম, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী)

বাংলা কবিতার চল্লিশ এমন রোমান্টিকতা দেখেনি। ঝাঁঝালো দুপুরের টগবগে ঘোষণা শুনেছে বড়ো জোর। আর খুব রোমান্টিকতা শ্লেষে চাঁদের ফালি কাস্তে হয়ে এসেছে কখনো। এই প্রথম দৃশ্য ও ভাবনায় নবীন লাউ-লতাটি চনমন করে নিজের প্রকাশ দেখতে চাইল। ওই জেগে ওঠার খুব বড়ো আয়োজন নেই। দর্শনের অহং হাতছানি নেই। ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলার মতো করে চোখের সীমা তার ধ্বনিময় উদ্ভাসে ফুরফুরে বাতাস কবিতা পাঠকের বারান্দায় উঠে এল। বুদ্ধদেবকৃত সম্ভ্রান্ত উৎকর্ষ কোথায় নড়ে আছে এইখানে, যেন সামান্য বধূটিকে জল নিজে ছুঁয়ে দেখবে এই বার। এবং এই বার আকাশকুসুম না হয়েও বাস্তব রূপরেখা হয়ে উঠবে।

NIRENDRA NATH CHAKRABORTY
ছবি: রাজীব বসু

তেমন জটিলতা নেই, নাটকীয়তা আছে, দুর্বোধ্যতা নেই, শহুরে পালিশ করা, ঝকঝকে ভাষা আছে, জনতার চিত্তহরণ আঙ্গিক আছে, অক্ষরে অক্ষরে আত্মপ্রকাশ ও সমাজের আশ্লেষে জড়িয়ে কবি অমলকান্তির রোদ্দুর হয়ে ওঠা যেন লক্ষ্য করল বাংলা কবিতা। রাজনীতি নিয়ন্ত্রিত ফতোয়া থাকল না। শ্লেষ জড়ালো – ব্যক্তির সঙ্গে সমাজের যতটুকু, ততটুকু। নিজত্বের শমীবৃক্ষ থেকে পেড়ে এনে এই মহাভারতে লড়াইয়ে নেমে পড়তে হল যেন। সমাজে, রাষ্ট্রে ব্যক্তির চিহ্নিত গণ্ডিটিকে যত্ন করে খড়ি দিয়ে এঁকে দেখিয়ে দিতে চাইলেন। আটপৌরে দিনমান ফুটে উঠল কবিতায়-

কে কতটা নত হবে, যেন সব স্থির করা আছে!

যেন প্রত্যেকেই তার উদ্বৃত্ত ভূমিকা অনুযায়ী

উজ্জ্বল আলোর নীচে নত হয়।

সম্রাট, সৈনিক, বেশ্যা, জাদুকর, শিল্পী ও কেরানী,

কবি, অধ্যাপক, কিংবা মাংসের দোকানে

যাকে নির্বিকার হাতে মৃত ছাগলের চামড়া ছাড়াতে দেখেছি

এবং গর্দানে-রাংএ যে তখন মগ্ন হয়ছিল,

তারা প্রত্যেকেই আসে উজ্জ্বল আলোর নীচে একবার।

তারা প্রত্যেকেই নত হয়।

(স্বর্গের পুতুল, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী)

কবিতা-ভাবনা নিয়ে বলছিলেন তিনি। বলছিলেন, “দাম্ভিক গলায় এক কালে সবাইকে বলতে ইচ্ছা করত, ‘এসো আমার হাত ধরো, সেই স্বপ্নলোকে আমি তোমাদের পৌঁছে দেব’। অর্বাচীন সেই ইচ্ছা কবেই বিদায় নিয়েছে। পঁয়ত্রিশে পৌঁছোনোর আগেই বুঝতে পারি, কবিতা কোনো দূর জগতের ব্যাপার নয়, ফলত সেখানে কাউকে পৌঁছে দেওয়ার প্রশ্ন ওঠে না। বুঝতে পারি কবিতার উপাদান আমাদের চতুর্দিকেই ছড়িয়ে আছে। দরকার শুধু চিত্তে ঈষৎ বেদনা কিংবা চক্ষুতে ঈষৎ কৌতুক নিয়ে তাদের দিকে তাকানো”। এই শেষ লাইনটাই সম্ভবত তাঁর কবিতার প্রাণভ্রমর। তাঁর গোটা জীবনের আসক্তিও বা।

ঢেউয়ের মাথায় ঢেউয়ের মতো একের পর এক আলোড়ন, জনজীবনের ভিত্তিমূলে কাঁপন।…সম্ভাবনার স্বপ্ন দেখতে চেয়েছে মানুষ। আর একজন কবি বৈপরীত্যের চড়াই-উৎরাই থেকে মনন তৈরি করে নিচ্ছিলেন তখন।

শ্রেণিগত ভাবে মধ্যবিত্তের স্বতঃবিরোধিতার ক্ষত তাঁর কবিতাবয়নের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেল। কত কী ডামাডোলে আলোড়িত গোটা চল্লিশ। শুধু তো যুদ্ধ বা মন্বন্তর নয়, স্বাধীনতা পরবর্তী উদ্ধাস্তু বাঙালির শেকড়ছিন্নতা নয়, কোথাও যেন মননেও শূন্যতার দোলাচল। অস্তি আর নেতির তীব্র সংঘাত সেখানে। ফলে কবিকে অমন যৌবনের চূড়ান্ত রোম্যান্টিকতাকেও দ্বন্দ্বে সাজিয়ে দেখে নিতে হয়, আছে আছে। কোনো এক শুভবোধের দিকে টানটান মেরুদণ্ড নিয়ে বলে ফেলেন, “তুমি বলেছিলেন ক্ষমা নেই, ক্ষমা নেই।/ অথচ ক্ষমাই আছে।/ প্রসন্ন হাতে কে ঢালে জীবন শীতের শীর্ণ গাছে।/ অন্তরে তার কোনো ক্ষোভ জমা নেই”। (প্রিয়তমাসু, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী)

মানুষকে, মানুষের মর্যাদাকে কোনো অবস্থাতেই হীনমান হওয়ার বিপরীতে মাথা উঁচু সে এক অবস্থান আমরা ক্রমে লক্ষ করে গিয়েছি। ৭০ দশকের নকশালবাড়ি আন্দোলন ও তদ্‌জনিত রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস – সব মূল্যবোধ নিশ্চিহ্ন হয়ে আছে। কবিকে তখনও বলতে হয়েছে, “যে আমার শত্রু, যেন সে আমার প্রতিদ্বন্দ্বিতার/ যোগ্য হয়।/ শত্রু মিত্র নির্বিশেষে যেন স্বভাবের/ সমস্ত ক্ষুদ্রতা আমি বর্জন করি”।

আমাদের মনে পড়ছে চল্লিশে দেশজোড়া গণঅভ্যুত্থান, যুদ্ধ, আকাল, দাঙ্গা, দেশভাগ আর স্বাধীনতা। মাত্র ১০টা বছরের মধ্যে যুগান্তকারী সব ঘটনা ঘটে গিয়েছে। ঢেউয়ের মাথায় ঢেউয়ের মতো একের পর এক আলোড়ন, জনজীবনের ভিত্তিমূলে কাঁপন। অভ্যস্ত জীবনের ঘেরাটোপ থেকে মানুষ নিক্ষিপ্ত হয়েছে এক অচেনা জগতে পরিবেশে। দু‌ঃখ আর মৃত্যু দেখতে দেখতে স্বাধীনতা রোমাঞ্চিত জগতে দু-দণ্ড বসে সম্ভাবনার স্বপ্ন দেখতে চেয়েছে মানুষ। আর একজন কবি বৈপরীত্যের চড়াই-উৎরাই থেকে মনন তৈরি করে নিচ্ছিলেন তখন।

তাঁর পাশে তখন রয়েছেন অরুণকুমার সরকার, দিনেশ দাস, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, মঙ্গলাচরণ চট্টোপাধ্যায়রা। চল্লিশের বিক্ষুব্ধ সময়কে সঙ্গে নিয়ে যে মানবতার আকরটি মুক্তোর মতো হয়ে বসেছিল, মনে হয় সারা জীবন ধরেই ছিল, তাই স্বদেশ হারানো অন্য জীবনে এসে ব্যথায় প্রকট কবি নিজের জীবনের ব্যথা উঠে এসেছিল উপরিতলে।

NIRENDRA NATH CHAKRABORTY
ছবি: রাজীব বসু

‘নিজের জীবন বীজের জীবন’-এ জানিয়েছেন, “পুব বাংলার নাবাল অঞ্চলে আমার জন্ম। বন্যা আমার কাছে নতুন ব্যাপার নয়, প্রায় প্রতিটা বড়ো-বর্ষাতেই আমাদের খেত-খামার তো বটেই ঘর-দুয়ারও জলে ভাসত, সাঁকো না বেয়ে এ ঘর থেকে ও ঘরে যাওয়ার উপায় থাকত না। আমার এক জ্যাঠতুতো ভাইকে সেই প্লাবনের দিনে হারিয়েছিলুম। পাঁচ বছরের বালক, সাঁতার জানত না। সকলের অলক্ষ্যে দাওয়া থেকে উঠোনে পড়ে সে তলিয়ে যায়, জীবিত অবস্থায় তাকে আর ফিরে পাওয়া গেল না। ভীষণ কষ্ট পেয়েছিলুম আমরা। শোকে-দু‌ঃখে জ্যাঠাইমা প্রায় পাগল হয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু সেই যে পরিবেশ আর সেই যে সংকট তার মধ্যে যে কোনো কনট্রাডিকশন আছে, এমন কথা আমাদের কখনও মনে হয়নি। প্রকৃতির বিরুদ্ধে যুঝবার মতো কোনো প্রস্তুতিই তো আমাদের ছিল না। তাই সংকটই ছিল স্বাভাবিক ব্যাপার। প্রকৃতির কাছে আমরা আত্মসমর্পণ করেছিলুম। আমরা ধরেই নিয়েছিলুম যে, এ রকম হবে এই রকমই হয়”।

“কিন্তু কলকাতা সম্পর্কে আর তেমন কথা ভাবা গেল কই? কন্ট্রাডিকশন এ ক্ষেত্রে এতই প্রকট যে, নিতান্ত গবেট কিছু পৌরপিতা আর আপাদমস্তক আকাট কিছু আমলা ছাড়া সকলের চোখেই তা ধরা পড়বে। আমার চোখেও পড়েছিল। খুব একটা যে বিপদে পড়েছিলুম তা এক হাঁটু জল দাঁড়িয়ে গেল রেসকু-বোটের জন্য দিন-তিনেক প্রতীক্ষায় থেকে তার পর অসুস্থ শিশুকন্যাকে ভেলায় করে ডাক্তারখানায় পাঠাতে হলে, কলের জলে বদলে বৃষ্টির জলে তেষ্টা মেটাতে হলে, শয়নকক্ষের মধ্যে দু-চারটে ঢোঁরাসাপ ঢুকে পড়লে, এবং জল থেকে সেই সাপগুলি ক্রমাগত বিছানায় উঠে আসার চেষ্টা করতে থাকলে যে কোনো মানুষের যেটুকু অসুবিধা হয়, তার চাইতে বেশি অসুবিধার মধ্যে বোধহয় পড়িনি।”

NIRENDRA NATH CHAKRABORTY
ছবি: রাজীব বসু

এই লম্বা গদ্যাংশটা আমরা পাঠ করে নিলাম এ জন্য যে কবি কথকঠাকুর ভূমিকায় কতটা স্বচ্ছন্দ। বক্তব্য ডিটেলসের দিকে ঝুঁকে আছে, শ্লেষ আশ্চর্য রসে পরিণত হয়েছে। তবে তা শেষ হওয়ার নয়। কবিকে ছুঁয়ে দেখা সম্ভব। কিন্তু ধরার চেষ্টা করা তো অসাধ্য সাধন। তবে তাঁর ছন্দ প্রসঙ্গে, যে হেতু কাছ থেকে দেখেছেন, অরুণকুমার সরকার জানিয়েছেন, “চল্লিশের কবিদের মধ্যে নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীই যে সব থেকে প্রকরণ কুশলী এ বিষয়ে আমার মনে কোনো সন্দেহ নেই। নীরেন যে শুধু ছন্দটা ভালো বোঝে তা নয়, এ নিয়ে সে সার্থক পরীক্ষা-নিরীক্ষাও করেছে। তার এখনকার কবিতা সামাজিক ঘটনাবলির উপর তির্যক কিন্তু বেদনাবিদ্ধ মন্তব্যে ভরা। বহির্বিশ্ব এবং বর্তমান কাল এমন আর কার কবিতায় মূর্ত?”

1 মন্তব্য

  1. প্রিয় কবি তাপস রায়ের লেখা থেকে কোট করে বললে কবিকে ছুঁয়ে দেখা সম্ভব। আর তাপস রায় তাই-ই করলেন।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here