nimai dutta gupta
নিমাই দত্তগুপ্ত

ড. হানস্‌ ভেরনার লিসমান আবিষ্কার করেন যে, আফ্রিকার বাইরে মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকায় ইলেকট্রিক মাছ পাওয়া যায়। তার নাম ‘নাইফ-ফিশ’। জিমনারকাস আবিষ্কার করার পর তিনি ‘নাইফ-ফিশ’ নিয়ে গবেষণা করেন। এই মাছ সাধারণ ভাবে যে দলের মধ্যে পড়ে তার নাম ‘জমটোনাস কারপো’। এই মাছের শরীরেও বিদ্যুৎ তৈরি হয়। ‘জমটোনাস কারপো’ তার শরীর সোজা টান টান অবস্থায় রেখে সাঁতার কাটে, সামনে ও পেছনে দু’ দিকেই।

ডঃ লিসমানের পরে আমেরিকার বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে জানতে পারেন প্রত্যেকটি মাছের শরীরের মধ্যে বিদ্যুৎ তৈরির আয়োজন রয়েছে। বিজ্ঞানীদের অভিমত হল, সম্ভবত সমস্ত নাইফ ফিশই ইলেকট্রিক মাছ। এই মাছও একটি মাত্র পাখনার দুলুনির দ্বারা সাঁতার কাটে এবং তাদের পাখনাটি শরীরের এক্কেবারে পেছনে অবস্থিত। নাইফ ফিশও থাকে ঘোলা জলের নদীতে। শরীরের চারদিকে তৈরি হওয়া বিদ্যুতিক ক্ষেত্রের সাহায্যে চলাফেরা করে।

আরও পড়ুন: রবিবারের পড়া ১ / ইলেকট্রিক মাছ এবং গবেষণার কথা : প্রথম পর্ব

এখন ইলেকট্রিক ঈল মাছ নিয়ে আলোচনা করব। দক্ষিণ আমেরিকায় যে মাছকে নাইফ ফিশ বলা হয় তারই সমগোত্রীয় এই ঈল। অবশ্য ঈল নাম দেওয়া হলেও আসলে এরা ঈল নয়। দক্ষিণ আমেরিকায় যে সব নদীর জল ঘোলা হয় সেখানে এই মাছ পাওয়া যায়।

knife fish
নাইফ ফিশ।

ইলেকট্রিক ঈল নিয়ে গবেষণা করে অনেক আশ্চর্য তথ্য পাওয়া গিয়েছে। নাইফ ফিশ জাতীয় এই মাছ শরীর সোজা টান টান অবস্থায় রেখে, লেজের দিকে পাখনা দুলিয়ে সাঁতার কাটে সামনে ও পেছনে দু’ দিকেই। এদের শরীরে বিদ্যুৎ তৈরির অঙ্গের সংখ্যা তিনটি। প্রধান অঙ্গে তৈরি হয় উচ্চ মাত্রায় বিদ্যুৎ, ৬৫০ ভোল্ট পর্যন্ত। এটি রয়েছে লেজের দিকে। তার পেছনে দ্বিতীয় অঙ্গ। এতে কম ভোল্টের বিদ্যুৎ তৈরি হয়। তার পেছনে রয়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদনের তৃতীয় অঙ্গটি। এই মাছ যখন স্থির থাকে তখন কোনো বিদ্যুৎ তৈরি হয় না। যখন চলে তখন দ্বিতীয়টি থেকে কম মাত্রায় বিদ্যুৎ তৈরি হয়। তার সাহায্যেই চারদিকটা বুঝে নিতে পারে। আর শত্রুকে ঘায়েল করার জন্য প্রথম অঙ্গটি চালু করে উচ্চ ভোল্টের বিদ্যুৎ তৈরি করে।

এই মাছের বিদ্যুৎ তৈরির অঙ্গটি সম্ভবত ব্যবহার হয় অন্য মাছেদের আকর্ষণ করার জন্য। পরীক্ষা নিরীক্ষা করে দেখা গিয়েছে এমন বহু মাছ আছে বিদ্যুৎ যাদের টানে। ইলেকট্রিক ঈলও তার তৃতীয় অঙ্গের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে  অন্য মাছদের কাছে টানে। তার পর সেই মাছ কাছে এলে উচ্চ ভোল্ট বিদ্যুতের সাহায্যে তাকে ঘায়েল করে। কিন্তু মেরে ফেলে না। কারণ ইলেকট্রিক ঈল কখনও মরা মাছ খায় না। এমন মাত্রায় শক দেয় যাতে শিকার ঝিমিয়ে পড়ে। তার পর জ্যান্ত অসাড় মাছ খায় এরা।

torpedo ray
টর্পেডো রে।

ইলেকট্রিক ঈল আকারে বেশ বড়ো। লম্বায় তিন মটার পর্যন্ত হতে পারে। বাচ্চা বয়সে অবশ্য ৩০ সেন্টিমিটারের বেশি হয় না। তখন এদের চোখ ভালো থাকে।  কিন্তু বড়ো হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চোখ ক্রমশ খারাপ হয়ে একে বারে অন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু চলাফেরা করতে কোনো অসুবিধে হয় না। শরীর ঘিরে বিদ্যুৎ ক্ষেত্র থাকায় সামান্য ঘা খেলেই সে টের পেয়ে যায়। দেখার কাজটা এই ভাবে সারে বলেই সামনে বা পেছনে চলতে অসুবিধা হয় না। চোখ দিয়ে শুধু সামনের দিকে ভালো ভাবে দেখতে পায়। কিন্তু সামনে, পিছনে, নীচে এ-পাশে ও-পাশে ভালো ভাবে চলতে পারে।

আফ্রিকায় এবং মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকায় স্বাদু জলে ইলেকট্রিক মাছ দেখা যায়। উত্তর আমেরিকা, ইউরোপ, এশিয়া, অস্ট্রেলিয়া প্রভৃতি দেশের স্বাদু জলে কিন্তু এই ইলেকট্রিক ঈল পাওয়া যায় না। ভারতে ক্যাট ফিশ অর্থাৎ শিঙি, মাগুর এই মাছ আছে কিন্তু ইলেকট্রিক মাছের সন্ধান পাওয়া যায়নি। তবে অনুসন্ধান চলছে। এই মাছ পাওয়ার সম্ভাবনা বাতিল করা যায় না।

stargazer
স্টারগেজার।

স্বাদু জলের ইলেকট্রিক মাছ ছাড়াও রয়েছে বিশাল সমুদ্র। সেখানে তিন ধরনের ইলেকট্রিক মাছ পাওয়া যায় – ১) স্টার গেজার, ২) টর্পেডো-রে ও ৩) স্কেট ইলেকট্রিক মাছ।  স্টার গেজার ছড়িয়ে আছে উত্তর আর দক্ষিণ আমেরিকার আটলান্টিক ও প্রশান্ত মহাসাগরের উপকূলে। এদের দলে খুব বেশি মাছ থাকে না। আকারে ৩০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। চোখ দু’টি থাকে একে বারে মাথার ওপরে। জীব জগতে এমন মাথার ওপরে চোখওয়ালা জীব আর নেই। আর বিদ্যুৎ তৈরির অঙ্গ চোখের পেছনে।

টর্পেডো-রে মাছ ওপর থেকে চ্যাপটা। অন্যদের মতো দু’ পাশে চ্যাপটা নয়। টর্পেডো-রে ও স্কেট মাছের চেহারা দু’পাশে ছড়ানো। অংশ দু’টি পাখির ডানার মতো। টর্পেডো-রে মাছের বিদ্যুৎ তৈরির অঙ্গ ডানার মধ্যে মাংসকোষ দিয়ে গড়ে উঠেছে। অন্য কোনো ইলেকট্রিক মাছের তা হয় না। অন্য সব ইলেকট্রিক মাছের বিদ্যুৎ তৈরির অঙ্গ থাকে শরীরে বা লেজে। তাদের ইলেকট্রোপ্লেটগুলো যে ভাবে সাজানো থাকে তা-ও ভিন্ন ধরনের। টর্পেডো-রে মাছের বিদ্যুৎ তৈরির প্রত্যেকটি অঙ্গে থাকে কয়েকটি করে খাড়া স্তম্ভ। প্রতিটি স্তম্ভে হাজার খানেক ইলেকট্রোপ্লেট থাকে। টর্পেডো-রে মাছের বিদ্যুৎ তৈরির অঙ্গে থাকে কয়েকটি করে খাড়া স্তম্ভ। প্রত্যেকটি স্তম্ভে হাজার কাহ্নেক ইলেকট্রো প্লেট থাকে। তার দু’ পাশের দু’টি অঙ্গে পাঁচ লক্ষ ইলেকট্রো প্লেট থাকাও অসম্ভব নয়।

টর্পেডো-রে লম্বায় প্রায় দু’ মিটার পর্যন্ত হতে পারে। ইলেকট্রিক শক দেওয়ার ক্ষমতা ২২০ ভোল্ট। এর সাহায্যে সে শিকারকে ঘায়েল করে থাকে।

skate fish
স্কেট মাছ।

স্কেট মাছ চেহারার দিক থেকে টর্পেডো-রে মাছের মতো। কিন্তু স্কেট মাছের বিদ্যুৎ তৈরির অঙ্গ রয়েছে তার লেজের অংশে এবং লেজের মাংসপেশি দিয়ে সে বিদ্যুৎ তৈরি করে খুব কম ভোল্টের – চার ভোল্টের বেশি নয়। বিদ্যুৎ তৈরির মাত্রা এত কম কেন তা জানা যায়নি। যে সব মাছ দেখার জন্য বিদ্যুতিক ক্ষেত্রকে ব্যবহার করে তারা সাঁতার কাটার সময়ে শরীরকে সিধে ও টানটান রাখে। কিন্তু স্কেট মাছ সাঁতার কাটে লেজের ঝাপটা দিয়ে। সুতরাং দেখার কাজ সারার জন্য যে তারা বিদ্যুৎ তৈরি করে না তা নিশ্চিত ভাবেই বলা যায়। এবং লেজের ঝাপটা দিয়ে সাঁতার কাটার দরুন শরীরকে সিধে এবং টানটান রাখা সম্ভব নয়। সুতরাং স্কেট মাছের সামান্য ভোল্টের বিদ্যুৎ তৈরির ব্যাপারটা রহস্যই রয়ে গেল। (শেষ)

এক ক্লিকে মনের মানুষ,খবর অনলাইন পাত্রপাত্রীর খোঁজ

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here