nimai dutta gupta
নিমাই দত্তগুপ্ত

আমাদের সুন্দর পৃথিবীটাকে বৈচিত্র্যময় করেছে তার বিরাট জলরাশি। উদ্ভিদ ও প্রাণের আবির্ভাব হত না, যদি পৃথিবীতে জল না থাকত। উদ্ভিদ ও প্রাণীর নানা প্রকার প্রজাতির শ্রেণিভেদ বিস্ময়কর। জল ও স্থলের মধ্যে কত প্রকারের যে উদ্ভিদ ও প্রাণী আছে তার কোনো ইয়ত্তা নেই। বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের মাধ্যমে আমরা তা ক্রমশ জানতে পারছি। জলজপ্রাণীর মধ্যে এমন প্রজাতির মাছ আছে যারা প্রচণ্ড মাত্রায় ইলেকট্রিক শক দিতে পারে। তাদের শরীরের মধ্যে বিদ্যুৎ তৈরির ব্যবস্থা আছে। এই বিদ্যুৎ যখন ছাড়া পায় তখন তাকে বলে বৈদ্যুতিক মোক্ষন বা ডিসচার্জ। আমরা এই মাছের নাম দিয়েছি ‘ইলেকট্রিক মাছ’। তাদের শরীরের মধ্যে বিদ্যুৎ থাকলে শরীরটাকে ঘিরে একটি বৈদ্যুতিক ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে।

আমরা তো জানি একই রকমের বৈদ্যুতিক চিত্র দেখা যায় চৌম্বক ক্ষেত্রেও। সেটা একটা চুম্বককে ঘিরে তৈরি হয়। চৌম্বক ক্ষেত্রের চেহারাটা কিন্তু আমাদের পক্ষে চোখে দেখা সম্ভব। বৈদ্যুতিক বলরেখা দিয়ে যেমন তৈরি হয় চৌম্বক ক্ষেত্র। বৈদ্যুতিক মোক্ষন যেমন হতে পারে তীব্র, তেমনই মৃদু। সেটার মাত্রা যে মাপ দিয়ে ধরা হয় তার নাম ভোল্ট। যেখানে বিদ্যুৎ তৈরি হয় সেখান থেকে কতখানি বিদ্যুৎ বেরিয়ে আসতে পারে তা-ও নির্ভর করে ভোল্টের ওপর। যত বেশি ভোল্ট তত বেশি বিদ্যুৎপ্রবাহ, তত বেশি বৈদ্যুতিক মোক্ষন। তত চড়া বৈদ্যুতিক শক।

আমাদের বাড়িতে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয় সেটি ২২০ ভোল্টের। এর শক যে যথেষ্ট চড়া, সে অভিজ্ঞতা আমাদের অনেকেরই আছে। আর আফ্রিকায় এক রকমের ক্যাট ফিশ আছে, যে মাছ ৩৫০ ভোল্টের ইলেকট্রিক শক দিতে পারে। প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতায় মানুষ এই মাছের কথা জানতেন। তাঁরা কবরের দেওয়ালে এই মাছের ছবি এঁকে রেখে গিয়েছেন।  ট্রর্পেডো-রে নামে এক ধরনের মাছের সন্ধান পাওয়া গিয়েছে। এই মাছ ২০০ ভোল্টের ইলেকট্রিক শক দিতে পারে। রোমানরা এই ট্রর্পেডো-রে মাছের সাহায্যে ইলেকট্রিক শক নিয়ে বাতের চিকিৎসা করতেন। এবং ২০০ বছর আগে দক্ষিণ আমেরিকায় ‘ইলেকট্রিক ঈল’ মাছ আবিষ্কার হয়েছে। এই মাছ ৫০০ ভোল্টের ইলেকট্রিক শক দিতে পারে। অর্থাৎ ২২০, ৩৫০, ৫০০ ভোল্টের ইলেকট্রিক মাছের সন্ধান আমরা পেয়েছি। এই মাত্রায় বিদ্যুৎ শক খেলে কোনো প্রাণীর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা যে থাকবে না, সে কথা বলার অপেক্ষা রাখে না।

dr. hans lissmann
ড. হানস্‌ ভেরনার লিসমান।

জার্মান বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ বিজ্ঞানী ড. হানস্‌ ভেরনার লিসমান ইলেকট্রিক মাছ নিয়ে বিরাট গবেষণা করে সাফল্য অর্জন করেছেন। ১৯৫৮ সালে তাঁর গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়। আমরা অধ্যাপক লিসমানের নিবন্ধ থেকে ইলেকট্রিক ফিশ সম্পর্কে প্রথম বিশুদ্ধ ভাবে জানতে পারি। তিনি আফ্রিকার স্বাদু জলের এক দল মাছ নিয়ে বিশেষ ভাবে গবেষণা করেন এবং জানতে পারেন সেখানকার জলে নিচু মাত্রায় বৈদ্যুতিক মোক্ষন ছাড়ার ক্ষমতা অনেক মাছেরই আছে।

আমরা তো জানি যে বৈদ্যুতিক মোক্ষন যদি সামান্য মাত্রায় হয় তা হলে সেটা ধরতে পারাটা খুবই শক্ত। তা-ও যদি তা জলের মধ্যে হয় তা হলে সেটা ধরতে পারাটা আরও শক্ত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ইলেকট্রন শিল্পে আবিষ্কার হয় অ্যামপ্লিফায়ার ও হাইড্রোফোন। এই যন্ত্রের দ্বারা জলের নীচে কোনো কিছু চলাচল করলে তার অস্তিত্ব ধরা পড়বেই। বিশ্বযুদ্ধ শেষ হতেই ড. লিসমান এই জোরালো যন্ত্র নিয়ে আফ্রিকার ঘানায় চলে যান অনুসন্ধানের জন্য। সেখানে তিনি যে নদীটি গবেষণার জন্য বেছে নিলেন, তাঁর জল ছিল অতি মাত্রায় ঘোলাটে। জল এত বেশি ঘোলাটে যে সেই জলে তাকালে কিছুই দেখতে পাওয়া যায় না। তিনি সেই জলের মধ্যে অ্যামপ্লিফায়ার ও হাইড্রোফোন ডুবিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা করে স্পষ্ট টের পেলেন এই জলের মধ্যে প্রচুর তৎপরতা চলছে। এই ঘোলা জলে জীবের চলাফেরার সংকেত টের পাওয়া যাচ্ছে। বেশ নির্বিবাদেই চলা ফেরা চলছে। কোনো রকম অসুবিধা হচ্ছে বলে তো মনে হল না।

ড. লিসমান ভাবলেন, তা হলে ঘোলা জলের মধ্যে কী ব্যাপার ঘটছে? জলের নীচের জীবগুলি নিশ্চয়ই মাছ। কিন্তু তারা একে অপরকে বাঁচিয়ে সুন্দর ঘোরাফেরা করছে। চোখে কিছু দেখতে না পাওয়া সত্ত্বেও তা সম্ভব হচ্ছে। এটা কেমন করে সম্ভব হল? তিনি গবেষণার মাধ্যমে বুঝতে পারলেন খুব সামান্য মাত্রায় হলেও অনেক মাছের শরীর থেকে বিদ্যুৎ মোক্ষন ঘটছে। তার ফলে তাদের শরীর ঘিরে তৈরি হচ্ছে একটি বৈদ্যুতিক ক্ষেত্র। ফলে এই মাছের সামনে যদি কোনো বাধা থাকে বা অন্য কেউ যদি সামনে এসে পড়ে তা হলে এই বৈদ্যুতিক ক্ষেত্র বিঘ্নিত হয় এবং সেই মাছ তা সঙ্গে সঙ্গে টের পেয়ে যায়। সেই কারণেই কোনো কোনো মাছ তার পিছনের দিকে পর্যন্ত সাঁতার দিয়ে চলতে পারে। পেছনের দিকে সাঁতার দেওয়ার সময় যদি কোনো সরু ফুটো পার হতে হয় তা হলে ফুটোর দেওয়ালে গা না লাগিয়ে দিব্যি চলে যেতে পারে। এই হল জলের বিভিন্ন অংশে বহু মাছের নিরাপদে চলাফেরা করার আসল কারণ। অর্থাৎ মাছের নিজের শরীরের চার দিকে বিদ্যুৎ ক্ষেত্র তৈরি করে রাখা ও নিরাপদে চলতে পারার রহস্য আবিষ্কার করেন ড. লিসমান।

আফ্রিকার প্রায় সব জায়গাতেই জিমনারকাস নাইলোটিকাস মাছ পাওয়া যায়। বিশেষ করে ঘোলাটে জলের নদীগুলিতে। নীল তথা নাইল নদীতে তো বটেই। নাইলোটিকাস মাছের নামও হয়েছে নাইল নদীর নাম থেকে।

তিনি এই গবেষণার মাধ্যমে তিন ধরনের মাছের বৈদ্যুতিক মোক্ষন ধরতে সক্ষম হন। প্রথম ধরনের মোক্ষন পাওয়া যেত সেকেন্ডে একটি মাত্র স্পন্দন। দ্বিতীয় ধরনের মোক্ষন পাওয়া যেত সেকেন্ডে ২০-৫০টি স্পন্দন। তৃতীয় ধরনের মোক্ষন পাওয়া যেত সেকেন্ডে ৩০০টি স্পন্দন। এই তৃতীয় মোক্ষনটি হাইড্রোফোনে ধরা পড়ত একটানা একটি গুঞ্জন হিসেবে। ড. লিসমান সিদ্ধান্ত নিলেন যে, যে ধরনের মাছ থেকে তৃতীয় ধরনের মোক্ষনটি ধরা পড়েছে সেই মাছটি হল জিমনারকাস নাইলোটিকাস।

আফ্রিকার প্রায় সব জায়গাতেই জিমনারকাস নাইলোটিকাস মাছ পাওয়া যায়। বিশেষ করে ঘোলাটে জলের নদীগুলিতে। নীল তথা নাইল নদীতে তো বটেই। নাইলোটিকাস মাছের নামও হয়েছে নাইল নদীর নাম থেকে। এই মাছ নিয়েই তিনি গবেষণা করেছেন। আকারে বেশ বড়ো এই মাছ। পুরোপুরি বড়ো হয়ে উঠলে এক মিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। চোখ দু’টি তেমন ভালো নয়। ঘোলাটে জলের মধ্যে এই চোখ ভালো দেখতে পারে বলে মনে হয় না। কিন্তু তা সত্ত্বেও এই মাছ প্রচণ্ড বেগে শিকারের পেছনে ছুটতে পারে। আশ্চর্য ব্যাপার হল পেছনের দিকেও সাঁতার কাটতে পারে অতি সহজে।

জিমনারকাস মাছের শরীরের গঠন আর সাঁতার কাটার আরও একটি বৈশিষ্ট্য আছে। তা হল অন্য সব মাছ সাঁতার কাটে লেজটাকে এ-দিক ও-দিক চালিয়ে। কিন্তু জিমনারকাস সাঁতার কাটে পিঠের ওপরের পাখনা দুলিয়ে। এই পাখনা লম্বায় বেশ বড়ো ও সারা পিঠে ছড়ানো। ফলে শরীরটাকে সোজা টানটান রেখে সাঁতার কাটতে পারে। শরীরের গড়নটাও এমন যে পিছন দিকে সাঁতার কাটার সময় পিঠের পাখনার দুলুনি উলটো দিক করে দেয়। কাজেই সাঁতার কেটে যেতে অসুবিধা হয় না – শরীরটা এমন ভাবে গঠন করে নিতে পারে।

চোখ দিয়ে দেখার বদলে জিমনারকাস তার শরীরকে ঘিরে যে বৈদ্যুতিক ক্ষেত্র তৈরি করে তা দিয়ে দেখার কাজ করে থাকে।  সামান্যতম বাধা উপস্থিত হলে সঙ্গে সঙ্গে বৈদ্যুতিক ক্ষেত্র পালটে যায় এবং ও সেটা বুঝতে পারে। এমনকি অন্য কোনো জিমনারকাস যদি কাছাকাছি চলে আসে তা হলেও তেড়েফুড়ে ঝগড়া লাগিয়ে দেয়। যদিও জিমনারকাস চোখে দেখতে পায় না, তবুও এই ধরনের কাজ সে চোখে দেখা প্রাণীর মতোই করে। আর তার খাদ্য হতে পারে এমন কোনো জীব যদি তার কাছাকাছি এসে পড়ে তা হলে তো আর কোনো কথাই নেই। পলকের মধ্যে নির্ভুল নিশানায় আক্রমণ করে তাকে খেয়ে ফেলে।

 Gymnarchus niloticusনিজের শরীরে বিদ্যুৎ তৈরি করার যে ক্ষমতা রয়েছে সেটিই জিমনারকাসের আসল জোর। জিমনারকাস একা নয় এমন আরও কয়েকটি মাছ আছে যারা নিজেদের শরীরের মধ্যে বিদ্যুৎ তৈরি করতে পারে। তাদেরও জোর জিমনারকাসের মতোই। এরা কী ভাবে শরীরের মধ্যে বিদ্যুৎ তৈরি করে তা নিয়ে অনেক গবেষণা হয়েছে। তাতে জানা গিয়েছে বিদ্যুৎ তৈরির কলাকৌশল সব মাছের শরীরেই মূলত একই রকম। শুধু পার্থক্য এই কৌশল থাকার জায়গায়। এক এক মাছের শরীরে এক এক রকমের।

গবেষণায় জানা গিয়েছে, জিমনারকাসের শরীরে এই বিদ্যুৎ তৈরির কলাকৌশল সাজানো রয়েছে পেছনের দিকে। লেজ বরাবর। প্রধান অঙ্গ আটটি। নলের মতো আকারের। শরীরের মধ্যরেখার দু’ দিকে চারটি চারটি করে বসানো। প্রত্যেক অঙ্গে ১৫০-২০০টি ইলেকট্রো প্লেট খাড়া ভাবে পরস্পরের সঙ্গে এঁটে থাকে। সব মিলিয়ে এক একটি মাছের শরীরে ১২০০-১৬০০টি ইলেকট্রো প্লেট পাওয়া যায়।

জিমনারকাসের এই ইলেকট্রো প্লেটের সঙ্গে ঘনবদ্ধ স্নায়ুর যোগ রয়েছে। তার সামনের দিকটা সমতল, পেছনের দিকটা ভয়ানক ভাবে ভাঁজ পড়া। আর গোটা প্লেট ডোবানো রয়েছে আঠার মতো চটচটে একটি পদার্থের মধ্যে এবং প্লেটগুলি সবই স্বচ্ছ বলে পুরো অঙ্গটি জেলির মতো দেখায়। এই হল তার শরীরের ভেতরে বিদ্যুৎ তৈরির আয়োজনের কলাকৌশল। এ যেন স্টোরেজ ব্যাটারি, মাছের মধ্যে ফিট করে রাখা আছে। অনেকগুলি প্লেট থাকার দরুন তা থেকে উচ্চ ভোল্টের বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে।

পৃথিবীর অন্য কোথাও জিমনারকাস বা এই জাতীয় মাছ পাওয়া যায় না। আর বিদ্যুৎ তৈরির কৌশল এই জাতীয় মাছের ক্ষেত্রে একই রকম। তবে জিমনারকাস ছাড়া অন্য কোনো ইলেকট্রিক ফিশের শরীরে আটটি অঙ্গ নেই। বাকিদের এক এক দিকে একটি করে মোট দু’টি। তাদের প্লেটের সংখ্যা ৪০০ থেকে ৬০০টি।

ইলেকট্রিক মাছ ও তার চলাফেরা নিয়ে আলোচনা আজ এই পর্যন্ত। বাকিটা আগামী রবিবার শেষ পর্বে। (চলবে)

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here