swapna chakraborty
payel samanta
পায়েল সামন্ত

‘বলি ও ননদি আর দুমুঠো চাল ফেলে দে হাঁড়িতে ….’।

গানের লাইনে মুগ্ধ বাঙালি দর্শক তখন টিভির পর্দায় আটকে। জনপ্রিয় রিয়্যালিটি শোয়ের এক প্রতিযোগী গাইছেন এই গান। বিচারক প্রতিযোগীকে ডিজ্ঞাসা করলেন, ‘এটা কার গান?’ অগণিত গুণমুগ্ধ দর্শককে অবাক করে বোলপুরের সেই প্রতিযোগী অক্লেশে বললেন, ‘জানি না’। টিভির পর্দায় চোখ রেখে বসে থাকা একজন প্রবীণা এতে আহত হলেন। এ গানটা যে তাঁরই গাওয়া। এ গান কি আজকের? এ তো কালজয়ী। তবে?

খবর অনলাইনকে এই ঘটনার কথা বলছিলেন বীরভূমের লতা ওরফে স্বপ্না চক্রবর্তী। তাঁকে খুঁজে পাওয়া গেল সিউড়ি বাসস্ট্যান্ডের কাছে একতলার সুন্দর অ্যাপার্টমেন্টে। একরাশ দীর্ঘশ্বাস ফেলে সরাসরি এ বার বললেন, “আজকাল তো সবাই রিয়্যালিটি শোয়ে এসেই শিল্পী হয়ে যাচ্ছে। ঠিকঠাক গানের চর্চাই করে না। সাধনা তো দূরের কথা! এ সব দেখলে খুব খারাপ লাগে।”

১৯৭৮ সালে অশোকা কোম্পানির ঈগল কমার্শিয়াল রেকর্ডে প্রকাশিত হয়েছিল বাংলার দু’টি কালজয়ী লোকগান। এই রেকর্ডের এক পিঠে ছিল ‘বড়লোকের বিটি লো’, অন্য পিঠে ছিল ‘বলি ও ননদি’। লোকসংগীতের ইতিহাসে সে রেকর্ড মাইলফলক গড়েছিল। গানের জনপ্রিয়তায় শিল্পীর নামও হয়ে গিয়েছিল ‘বড়লোকের বিটি’। সে বছরের পুজোয় সব মণ্ডপে বেজে উঠেছিল বড়লোকের বিটির গান। স্বয়ং লোকগানের সম্রাট নির্মলেন্দু চৌধুরী তাঁকে বলেছিলেন, “স্বপ্না, তুই বাংলার লোকগানকে আবার জনপ্রিয় করে তুলেছিস। শহরের মানুষরা যারা লোকগান শুনলে রেডিও বন্ধ করে দিত, তুই তাদের ছোটোলোকদের গান শুনতে বাধ্য করিয়েছিস।” তার পরেও শিল্পী স্বপ্না চক্রবর্তী হারিয়ে যাননি। একের পর এক বেরিয়েছে— ‘বর এল মাদল বাজায়ে’, ‘কাঠ কুড়াতে বেলা যায়’, ‘বনমালী তুমি’, ‘শ্রীচরণেষু মা দুর্গা’, ‘রূপমতী আমার নাম’, ‘ই পাড়াতে লুব না ভিখ’, ‘আমার কচিছানাটা বড়ো’ এমন প্রচুর গান।

তথাপি আজ তিনি স্বেচ্ছা নির্বাসনে, লোকচক্ষুর আড়ালে। কেন এখন নিজেকে এতটা গুটিয়ে নিয়েছেন তিনি? প্রশ্নটা শুনে তিনি বললেন, “এখন শিল্পীদের নিজস্বতা নিয়ে মাথা ঘামানো হয় না। চটজলদি খ্যাতির চোটে চর্চা আর সাধনার দরকার হচ্ছে না। এখনকার এই সব ঠিক মেনে নিতে পারছি না। তাই সরিয়ে নিয়েছি। এখন আর কোনো অনুষ্ঠানে গান করি না। বরং বীরভূমে গানমেলার মতো পার্বণ আয়োজনে থাকি।”

records of swapna chakrabartyলোকসঙ্গীত নিয়ে এখন অনেক পরীক্ষা চলছে। চলছে নানা কাটাছেঁড়া আর সুরপ্রয়োগ। তখনকার ছবিটাও কি এমনি ছিল? পরীক্ষানিরীক্ষা করতে গিয়েই কি লোকগানের সঙ্গে জড়িয়ে পড়া? ব্যাপারটা যে মোটেই তা নয়, সেটা বুঝিয়ে বললেন স্বপ্না চক্রবর্তী। লোকগানের চর্চাটা তখন আজকের মতো ছিল না। গবেষণা বা পরীক্ষানিরীক্ষা তো দূরের কথা, লোকগান সে ভাবে শোনাই হত না। তবে তিনি মনে করেন যে সংস্কৃতিচর্চাটা যার যার নিজের ব্যাপার। তাঁর তো লোকগান প্রথম থেকেই ভালো লাগত। “আমাদের আনন নামে একটা গোষ্ঠী ছিল। বীরভূমের লুপ্তপ্রায় লোকগানগুলো আমরা সংগ্রহ করে গাইতাম। এ ভাবে প্রচার হত গানগুলোর। তখন থেকেই ঝুমুর, ভাদু, মনসা, কোঁড়া এ সব গাইতাম। এ ভাবেই এক দিন রেডিওতে জেলা বেতার অনুষ্ঠানে লোকগান গাওয়ার সুযোগ পেয়েছি। ‘বড়োলোকের বিটি’র রেকর্ড বেরোনোর দু’ বছর আগে জেলা বেতারেই এই গানদু’টো গেয়েছি।”

ঘরোয়া আড্ডায় উঠে এল সে সময়ের অনেক ঘটনা। জানা গেল, জেলা বেতারে ‘বড়োলোকের বিটি’ আর ‘বলি ও ননদি’ গেয়ে প্রথম ১৫ টাকার চেক পেয়েছিলেন তিনি। বেশ অবাক হয়ে শুনলাম, বাংলার লোকগানের অমন জনপ্রিয় রেকর্ড যাঁর, তিনি রেকর্ড কোম্পানির থেকে শিল্পীর কপি হিসেবে একটি রেকর্ডও পাননি। ২০১৮-য় ইউটিউব যেখানে গান পৌঁছে দিচ্ছে মানুষের কানে কানে, সেখানে শিল্পী শোনাচ্ছেন ১৯৭৮-এর ঘটনা। “রেকর্ড চাইতে ঈগলের কলকাতা অফিসে গিয়েছিলাম। তাঁরা তো আমায় চিনতেই পারলেন না। আসলে তখনকার দিনে রেকর্ডের কভারে শিল্পীর ছবি থাকত না। বাজার থেকে রেকর্ড কিনে বাড়ি ফিরেছি। এখনকার মতো তখন শিল্পীদের আর্থিক লাভও বিশেষ ছিল না।”

ঘরের দেয়ালে ভর্তি প্রচুর ব্যাজ। বিভিন্ন সময়ে তিনি যা সম্মাননা পেয়েছেন, তা সুন্দর করে সাজানো দেয়াল জুড়ে। পুরস্কারও পেয়েছেন অনেক। সর্বোপরি আজ এত বছর পরেও বাংলার মানুষের কাছে সমান জনপ্রিয় ১৯৭৮-এ প্রকাশিত তাঁর দু’টো লোকগান। সে দিন কি জানতেন এই দু’টো গান কালজয়ী হবে? লাজুক হেসে শিল্পী বললেন, “মনসামঙ্গলের রেকর্ডিং চলাকালীন মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায় বলেছিলেন, তোমার বড়োলোকের বিটি দশ বছর পরও মানুষ শুনছে। আরও কয়েক বছর টিকে থাকলে বলা যাবে, এ গান কালজয়ী হয়েছে।”

গান, সংসার, রেকর্ডিং, অ্যালবাম, প্লেব্যাক – এক সময় সবই একা হাতে সামলেছেন তিনি। পাশে পেয়েছেন সুরকার স্বামী মানস চক্রবর্তীকে। আজও সে হাত ছাড়েননি। ছাড়েননি স্বর্ণযুগের স্মৃতি রোমন্থনের দুরন্ত নেশা। হেমন্ত, নির্মলেন্দু, ভূপেন হাজারিকা, মহঃ রফির আশীর্বাদ ও শুভেচ্ছা কানে বাজে এখনও। আজকের সংগীত নিয়ে অনেক অভিযোগ থাকলেও তিনি নিয়ম করে আজকের গান শোনেন। নচিকেতা, শুভমিতাদের গান ভালো লাগে। সংগীত জগতে প্রত্যক্ষ যোগাযোগ না রেখে এ সব নিয়েই দিব্যি আছেন তিনি। সময় বা পরিস্থিতি নিয়ে জাগতিক হতাশা নেই। আক্ষরিক অর্থেই যে তিনি ‘বড়োলোকের বিটি’!

1 মন্তব্য

  1. মরি হায় বসন্তের দিন …. বিদায়ী বসন্ত কে নিয়ে এমন উচ্ছ্বাস মন মাতালো । লেখিকা কে সাধুবাদ জানাই ।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here