rabindranath tagore
শম্ভু সেন

রবীন্দ্রনাথের আহারে কিছু পরিবর্তন এল ‘নতুন বৌঠান’ কাদম্বরী দেবী ঠাকুর-পরিবারে বধূ হয়ে আসার পর – “বউঠাকুরণের জায়গা হল বাড়ির ভিতরের ছাদের লাগোয়া ঘরে। সেই ছাদে তাঁরই হল পুরো দখল। পুতুলের বিয়েতে ভোজের পাত পড়ত সেইখানে। নেমন্তন্নের দিনে প্রধান ব্যক্তি হয়ে উঠত এই ছেলেমানুষ। বউঠাকুরণ রাঁধতে পারতেন ভালো। খাওয়াতে ভালোবাসতেন, এই খাওয়াবার শখ মেটাতে আমাকে হাজির পেতেন। ইস্কুল থেকে ফিরে এলেই তৈরি থাকত তাঁর আপন হাতের প্রসাদ। চিংড়িমাছের চচ্চড়ির সঙ্গে পান্তাভাত যেদিন মেখে দিতেন অল্প একটু লঙ্কার আভাস দিয়ে, সেদিন আর কথা ছিল না।”

আসলে কাদম্বরী তাঁর রান্নার সুস্বাদু হাতটি পেয়েছিলেন বংশ পরম্পরায়। ঠাকুরদা জগমোহন গঙ্গোপাধ্যায়, বাবা শ্যামলাল – দু’জনেরই রান্নার হাতটি ছিল তোফা। অবনীন্দ্রনাথ বলেছেন, “জগমোহন গাঙ্গুলী মশায়ের ছিল রান্না আর খাবারের শখ। পাকা রাঁধিয়ে ছিলেন, কি বিলিতি, কি দেশী।” আর রবীন্দ্রনাথের ভাইঝি ইন্দিরা (মেজদা সত্যেন্দ্রনাথের কন্যা) তাঁর ‘ভ্রমণস্মৃতি’তে শ্যামলালের রান্না নিয়ে লিখেছেন, “গাজিপুরে জ্যোতিকাকামশাইয়ের শ্বশুর শ্যামলাল গাঙ্গুলীও ছিলেন। মনে আছে, তিনি বেগুন, মুলো ও বড়ি দিয়ে গুড়-অম্বল রেঁধে রান্নাঘরের তাকে তুলে রেখে কাশী বেড়াতে যেতেন এবং ফিরে এসে খেতেন। ততদিনে অম্বল পুরনো হয়ে বেশ সুন্দরভাবে মজে থাকত। সত্যি কথা বলতে কী, সেরকম সুস্বাদু গুড়-অম্বল তার পরে আর কখনো খাইনি।”

আরও পড়ুন রবিবারের পড়া : খুশখানেওয়ালা রবীন্দ্রনাথ/প্রথম পর্ব

এ হেন জগমোহনের নাতনি, শ্যামলালের কন্যা কাদম্বরীর রান্নার হাতটিও যে পাকাই হবে তাতে সন্দেহ কী! তাই সামান্য হবিষ্যান্ন অনন্য হয়ে ওঠে নতুন বৌঠানের হাতের গুণে। ১৮৭৩-এর ৬ ফেব্রুয়ারি পইতে হয় রবীন্দ্রনাথের। তেরো বছরের কাদম্বরী প্রিয় দেওরটির জন্য তিন দিন হবিষ্যান্ন রেঁধেছিলেন। সেই রান্নার স্বাদ রবীন্দ্রনাথ ভোলেননি কোনো দিন – “মনে পড়ে বউঠাকুরণ আমাদের দুই ভাইয়ের (রবীন্দ্রনাথের ওপরের ভাই সোমেন্দ্রনাথেরও পইতে হয় একই দিনে) হবিষ্যান্ন রেঁধে দিতেন, তাতে পড়ত গাওয়া ঘি। ঐ তিন দিন, তার স্বাদে গন্ধে মুগ্ধ করে রেখেছিল লোভীদের।”

rabindranath and kadambari devi
রবীন্দ্রনাথ ও কাদম্বরী দেবী।

পইতে উপলক্ষে মাথা মুড়িয়ে যখন রবীন্দ্রনাথের ভয়ানক ভাবনা শুরু হল, কী করে ইস্কুল যাবেন, তখনই তেতলার ঘরে ডাক পড়ল – পিতৃদেব হিমালয়-যাত্রার ডাক দিলেন। “পিতা জিজ্ঞাসা করিলেন, আমি তাঁহার সঙ্গে হিমালয় যাইতে চাই কি না। ‘চাই’ এই কথাটা যদি চিৎকার করিয়া আকাশ ফাটাইয়া বলিতে পারিতাম, তবে মনের ভাবের উপযুক্ত উত্তর হইত।” হিমালয় থেকে ফেরার পর অবসান হয় ভৃত্যরাজক তন্ত্রের – “বাড়িতে যখন আসিলাম তখন কেবল যে প্রবাস হইতে ফিরিলাম তাহা নহে – এতকাল বাড়িতে থাকিয়াই যে-নির্বাসনে ছিলাম সেই নির্বাসন হইতে বাড়ির ভিতরে আসিয়া পৌঁছিলাম। অন্তঃপুরের বাধা ঘুচিয়া গেল, চাকরদের ঘরে আর আমাকে কুলাইল না।” ঠাকুরবাড়ির খাওয়াদাওয়ার মূল স্রোতে ঢুকে পড়লেন রবীন্দ্রনাথ।

পরিণত বয়সে রবীন্দ্রনাথের মধ্যাহ্নভোজ কেমন ছিল? পুত্রবধূ প্রতিমা দেবীকে লেখা চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ জানাচ্ছেন, “বেলা সাড়ে দশটার সময় আমার মধ্যাহ্নভোজ – একেবারে বিশুদ্ধ হবিষ্যান্ন – আতপ চালের সফেন ভাত, আলুসিদ্ধ, কচুসিদ্ধ, কোনও কোনও দিন অতি সভয়ে খেয়ে থাকি তোমারই বাগানে উৎপন্ন ওলসিদ্ধ। সঙ্গে থাকে এক পাইন্ট ঘোল।” এইটুকু পড়লে মনে হতে পারে রবীন্দ্রনাথের খাওয়া ছিল এতটাই সরল সাদাসিধে, একেবারে সন্ন্যাসীর মতো। সজনীকান্ত দাসকে প্রায় সে কথা বলেওছিলেন রবীন্দ্রনাথ – “আমি খুব ভোগী – লোকের এমন একটা ধারণা আছে। কথাটা সত্যি না। ছেলেবেলা থেকে যেভাবে মানুষ হয়েছিলুম তাতে ভোগের স্থান ছিল না। আমার মত কৃচ্ছ্রসাধন বুঝি কেউ করেনি। দিনের পর দিন শুধু মুগের ডালের সুরুয়া খেয়ে কাটিয়েছি।”

rabindranath having lunch at shilaidah kuthibari
শিলাইদহ কুঠিবাড়িতে মধ্যাহ্নভোজে রবীন্দ্রনাথ।

কথাটা হয়তো সত্যি। কিন্তু সব রকম পরিস্থিতিতে মানিয়ে নেওয়াও ছিল রবীন্দ্রনাথের একটা বড়ো গুণ। সর্বত্র কি ওই রকম হবিষ্যান্ন পাওয়া যায়? রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস করতেন যস্মিন দেশে যদাচারে। সত্তর বছর বয়সে পারস্য ভ্রমণে বেরিয়ে একজন বেদুইন দলপতির তাঁবুতে কবির নিমন্ত্রণ ছিল। প্রথমে ভেবেছিলেন, “শরীরের প্রতি করুণা করে না যাওয়াই ভালো।” পরে ভাবলেন, তিরিশ বছর বয়সে আস্ফালন করে লিখেছিলেন, “ইহার চেয়ে হতেম যদি আরব বেদুইন। কবিতাটিকে কিছু পরিমাণে পরখ না করলে পরিতাপ থাকবে।” গাড়ি চলল মরুভুমির উপর দিয়ে, তবে বালুময় নয়, শক্ত মাটি। অনেক দূর পেরিয়ে এদের ক্যাম্পে পৌঁছোলেন। মস্ত মাটির ঘরে বসার ব্যবস্থা। বেশ ঠান্ডা। মেঝেতে কার্পেট, এক প্রান্তে তক্তপোশের উপর গদি পাতা। শুরু হল আপ্যায়ন – “ছোটো আয়তনের পেয়ালা আমাদের হাতে দিয়ে অল্প একটু করে কফি ঢাললে, ঘন কফি, কালো তেতো। দলপতি জিজ্ঞাসা করলেন, আহার ইচ্ছা করি কি না। ‘না’ বললে আনবার রীতি নয়। ইচ্ছে করলেম, অন্তরে তাগিদও ছিল।… অবশেষে চিলিম্‌চি ও জলপাত্র এল। সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে প্রস্তুত হয়ে বসলুম। মেঝের উপর জাজিম পেতে দিল। পূর্ণচন্দ্রের ডবল আকারের মোটা মোটা রুটি, হাতওয়ালা অতি প্রচণ্ড পিতলের থালায় ভাতের পর্বত আর তার উপর মস্ত ও আস্ত একটা সিদ্ধ ভেড়া।… আহারার্থীরা সব বসল থালা ঘিরে। সেই এক থালা থেকে হাতে করে মুঠো মুঠো ভাত প্লেটে তুলে নিয়ে আর মাংস ছিঁড়ে ছিঁড়ে খেতে লাগল। ঘোল দিয়ে গেল পানীয় রূপে।”

আরও পড়ুন রবিবারের পড়া : খুশখানেওয়ালা রবীন্দ্রনাথ/দ্বিতীয় পর্ব

আসলে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন আলিসাহেবের কথামতো ভোজনবিলাসী, ভোজনরসিক। নানা রকমের খাবার খেতে, খাবার খাওয়াতে এবং খাবার নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা করতে ভালোবাসতেন। নানা জনের স্মৃতিকথা থেকে এ সংক্রান্ত নানা তথ্য পাওয়া যায়। পরীক্ষানিরীক্ষার একটি নজির – মার্মালেড দিয়ে ছাতু। মার্মালেড, গোল্ডেন সিরাপ, আদার রস, দুধ, কলা, মাখন ইত্যাদি দিয়ে আধ ঘণ্টা ধরে ছাতু মাখতেন, নিজে খেতেন, অন্যকে খাওয়াতেন। বেশ গর্ব করেই মৈত্রেয়ী দেবীকে বলেছিলেন, “এক সময় ভালো ছাতুমাখিয়ে বলে আমার নাম ছিল, মেজদার টেবিলে ছাতু মাখতুম মার্মালেড দিয়ে।” (চলবে)

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here