winner uruguay team in 1930 world cup
১৯৩০ বিশ্বকাপে জয়ী উরুগুয়ে দল।
তপন মল্লিক চৌধুরী

এক মাস ধরে সারা দুনিয়াকে টান টান উত্তেজনায় বেঁধে রাখছে বিশ্বকাপ ফুটবল বা গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ। সারা বিশ্ব জুড়ে কয়েক কোটি মানুষ টিভির পর্দাতেই বিভোর হচ্ছেন রোনাল্ডো, মেসি, নেইমারদের পায়ের জাদুতে। ৮৮ বছর আগে এই টুর্নামেন্টের শুরুটা হয়েছিল কী ভাবে?  কেমন ছিল ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাস তাই নিয়েই দু-চার কথা।

ফুটবল তখন কি এতটা জনপ্রিয় ছিল? অল্প কিছু দেশ তখন ফুটবল খেলত। প্রথম বার নয়, অলিম্পিকের দ্বিতীয় আসরে ফুটবলকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। কিন্তু সে বারও জাতীয় দলগুলো অংশ নেয়নি। ফুটবল প্রথম আনুষ্ঠানিক ভাবে মর্যাদা পায় ১৯০৮ সালের অলিম্পিকে। এর পরের দু’দশকের মধ্যেই ফুটবলের জনপ্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ে সারা দুনিয়ায়। এ কথা নিঃসন্দেহেই বলা যায় যে, ১৯২৪ ও ১৯২৮ সালের অলিম্পিকে মূল আকর্ষণ ছিল ফুটবল। আর তাতেই নড়েচড়ে বসেন ফিফার কর্তারা। অলিম্পিকের আদলে একটি আলাদা টুর্নামেন্ট আয়োজন করতে চায় সংস্থাটি।

আরও পড়ুন ফিরে দেখা ফুটবল বিশ্বকাপ: যে রেকর্ড কোনো দিনই ভাঙবে না

কিন্তু আইওসি কিছুতেই মানতে নারাজ। ফিফার সঙ্গে এই নিয়েই টালবাহানা চলে বেশ কিছু কাল ধরে। আর এরই জেরে ফুটবলকে শেষ পর্যন্ত অলিম্পিকের স্পোর্টস ক্যাটাগরি থেকে  বাদই দেওয়া হয়। অন্য দিকে তার রেশ ধরে অলিম্পিকের পরবর্তী আসরের আগেই তৎকালীন ফিফা প্রেসিডেন্ট জুলে রিমে তাঁর নিজের নামে ফুটবল বিশ্বকাপ আয়োজন করবেন এমন সিদ্ধান্ত নেন।

তবে  সফল ভাবে প্রথম বিশ্বকাপ প্রতিযোগিতা আয়োজিত  হয় ১৯৩০ সালে, উরুগুয়েতে। এতে নতুন এক দিগন্তের সূচনা হয় ঠিকই, তবে শুরুতে ইউরোপের দলগুলো ব্যাপারটাকে খুব ভালো চোখে দেখেনি। তাই নানা বাধাবিপত্তিতে জড়িয়ে যায় প্রথম বিশ্বকাপ ফুটবল। সেই সব বিপত্তি পেরিয়ে ইউরোপের মাত্র চারটি দল যোগ দেয় বিশ্বকাপে। ওই এক বারই বিশ্বকাপের ইতিহাসে ইউরোপের দলগুলোর চেয়ে লাতিন দলগুলির উপস্থিতি ছিল বেশি।

arjentina team examining the ground before the final match in 1930
১৯৩০-এ ফাইনাল ম্যাচের আগে মাঠ পরীক্ষা করছে আর্জেন্তিনা দল।

১৯৩০ সাল ছিল উরুগুয়ের স্বাধীনতার একশো বছর। বছরটিকে ঐতিহাসিক ভাবে উদযাপন করার অংশ হিসেবেই বিশ্বকাপ আয়োজন করতে চায় দেশটি। তাদের চাওয়া মেনে নেয় লাতিন ল্যাটিন আমেরিকার প্রায় সবগুলো দল। ইউরোপিয়ানদের কাছ থেকে কিছু আপত্তি আসে। আসলে অনেক দেশই আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিতে চায়নি । যদিও আয়োজক দেশ উরুগুয়ে বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী দলগুলোর যাবতীয় খরচও বহন করতে সম্মত ছিল। শেষ পর্যন্ত ভোটাভুটিতে বিশ্বকাপের জন্য উরুগুয়েকেই নির্ধারণ করা হয়। দেশের রাজধানী মন্টেভিডিওর মোট তিনটি মাঠে আয়োজিত হয় ওই বিশ্বকাপ। ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথম স্বাক্ষর রাখে উরুগুয়ে।

সেবার অংশ নিয়েছিল মোট ১৩টি দেশ। বেলজিয়াম, ফ্রান্স, রোমানিয়া ও যুগোস্লাভিয়া – এই চারটি দেশ ছিল ইউরোপ থেকে। পেরু, পারাগুয়ে, চিলে, আর্জেন্তিনা, ব্রাজিল, বলিভিয়া ও উরুগুয়ে, এই সাতটি দেশ ছিল লাতিন আমেরিকার। বাকি দু’টি দল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও মেক্সিকো। ১৩ জুলাই থেকে ৩০ জুলাই – এই ১৮ দিন ধরে অনুষ্ঠিত হয়েছিল সেই বিশ্বকাপের আসর। ১৩টি দেশ বা দলকে চার ভাগে ভাগ করে সাজানো হয়েছিল খেলা।

আরও পড়ুন ফিরে দেখা ফুটবল বিশ্বকাপ: যম আছে পিছে

ফিফা সভাপতি জুলেরিমে নিজের দেশে বিশ্বকাপ আয়োজন করতে না পারলেও বিশ্বকাপের প্রথম খেলায় নিজের দেশকে রাখতে সমর্থ হয়েছিলেন। ফ্রান্স এবং মেক্সিকোর ম্যাচ দিয়ে শুরু হয়েছিল প্রথম বিশ্বকাপ। আর  সেই ম্যাচে ৪-১ গোলে জয়ী হয়েছিল ফ্রান্স। আর প্রথম বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে হারের ধাক্কা এখনও পোহাচ্ছে মেক্সিকো। কারণ বিশ্বকাপের ইতিহাসে সব চেয়ে বেশি ২৫টি ম্যাচে হেরেছে মেক্সিকো। প্রতি গ্রুপের চ্যাম্পিয়ন দল সেমিফাইনাল খেলার সুযোগ পায়। তবে মজার ব্যাপার হল সেমিফাইনালের দু’টি ম্যাচের ফল হয় একই। এক দিকে উরুগুয়ে ৬-১ গোলে হারায় যুগোস্লাভিয়াকে। অন্য দিকে আমেরিকাকে ৬-১ গোলে হারিয়ে ফাইনালে ওঠে আর্জেন্তিনা। তবে ফাইনালেই যাবতীয় উৎসাহ-উত্তেজনা যেন জড়ো হয়। ফাইনাল খেলা দেখতে ৬০ হাজারের বেশি দর্শক হাজির হয়েছিল। দর্শকদের হাবভাব দেখে প্রথমে সন্দেহ হয় রেফারির। তিনি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দর্শকদের তল্লাশি করতে বলেন। কিন্তু সে কাজ যে মোটেও সহজ নয়। কিন্তু সেই কঠিন কাজ শেষ পর্যন্ত সম্পন্ন করা হয় এবং তল্লাশিতে দর্শকদের কাছ থেকে ১৬০০ রিভলভার পাওয়া যায়।

শুধু তা-ই নয়। এর পর বল নিয়েও লাগে আরেক বিপত্তি। দু’ দলই চায় নিজেদের বল নিয়ে খেলতে। শেষে সিদ্ধান্ত হয় প্রথমার্ধে আর্জেন্তিনার এবং দ্বিতীয়ার্ধে উরুগুয়ের বল দিয়ে খেলা হবে। প্রথমার্ধে নিজেদের বলে খেলে দু’টি গোল করে আর্জেন্তিনা। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধে নিজেদের বল নিয়ে খেলে উরুগুয়ে করে ৪টি গোল। ফলে ৪-২ ব্যবধানে আর্জেন্তিনাকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয় উরুগুয়ে।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here