avijit datta

শিখী দত্ত

পথের মানুষ বলতে যা বোঝায়, পেশাগত ভাবে অভিজিৎ তা-ই। পেশায় প্রাইভেট কারের চালক অভিজিৎ দত্ত দিনের মধ্যে অনেকটা সময় ব্যস্ত থাকেন গাড়ির স্টিয়ারিং সামলাতে। অবসরে বা ফুরসত পেলে ছবি আঁকেন। অভিজিৎ একজন শিল্পী। ইতিমধ্যে দিল্লিতে ললিতকলার প্রদর্শনীতে আর রাজ্যে তথ্যকেন্দ্র আয়োজিত প্রদর্শনীতে তাঁর ছবি প্রদর্শিত হয়েছে।

অভিজিৎ আঁকতে ভালোবাসেন পুতুলের ছবি। সদ্য আঁকা একটি ছবি দেখিয়ে পেশ করলেন তার নমুনা। সুতোর টানে পুতুলনাচের ছবি এঁকেছেন অভিজিৎ। প্রধানত অ্যাক্রেলিকের কাজ করেন।

অভিজিতের গাড়ির মালিক একজন সরকারি বিজ্ঞানী। সরকারি অফিসারের চাকরি করেন। ড্রাইভার হিসাবে একজন সরকারি অফিসারের গাড়ি চালানোটা পেশাগত নিরাপত্তার কারণে ভালো। মাস গেলে যে টাকাটা বেতন হিসাবে পান, সংসারের হাল সামলাতে সামলাতে তার প্রায় গোটাটাই খরচ হয়ে যায়। সংসার বলতে মা, স্ত্রী ও শিশুপুত্র।

অভিজিৎ জানালেন, ছবি তাঁর রক্তে। ওঁর কথায়, আমার ঠাকুর্দা সরকারি আর্ট কলেজের ফাইনাল পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়েছিলেন। তখন ব্রিটিশ আমল। ঠাকুরদা ড্রাফটসম্যান হিসাবে সেই সময়ে ভূতাত্ত্বিক সর্বেক্ষণ বিভাগে কাজ করতেন। দীর্ঘায়ু ছিলেন মানুষটি।

অভিজিৎ এখন থাকেন পূর্ব কলকাতার ফুলবাগানের হরমোহন ঘোষ লেনে। হরমোহন ঘোষ লেনে কিশোর কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের ভিটেবাড়ি। কবি সুকান্তের বাড়ি থেকে ঢিলছোঁড়া দূরত্বেই অভিজিতের পৈতৃক বাড়ি।

painting of avijit 1নিজের কাজ প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে অভিজিৎ বললেন, জীবন তো পুতুলনাচই। তাই পুতুলনাচ আঁকতেই ভালোবাসি।

একজন ঔপন্যাসিক তাঁর প্রসিদ্ধ উপন্যাসের নামকরণ নিয়ে যদি দু‍‍-পাঁচ কথা জানাতেন, তা হলে পাঠকের তরফে বিরাট একটি সুবিধা হত। শুধু সমকালের নয়, ভাবী কালের পাঠকও নামকরণের নেপথ্য কাহিনিটি জানতে পারলে বহুবিধ কৌতূহলের জট ছাড়ানো যেত। বিশেষত উপন্যাসের মর্ম উপলব্ধির সহায়ক ঐতিহাসিক সাক্ষ্য পাওয়া যেত। আর লেখক যদি স্বয়ং তার সাক্ষ্যদাতা হন, তা হলে তো সোনায় সোহাগা!

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পুতুলনাচের ইতিকথায় এ-ও দেখানো হয়েছে, একজন শিল্পীর উচ্চা আকাঙ্ক্ষা যখন বাস্তবের কঠিন মাটিতে ধাক্কা খায়, সেই সময়ে তাসের ঘরের মতো করে ভেঙে পড়ে সেই শিল্পীর সংসার। তাঁর ব্যক্তিগত পরিসরের স্বপ্ন ও শান্তিও চুরমার হয়ে যায়। মানিকের পুতুলনাচের ইতিকথা অভিজিৎ পড়েননি। অভিজিতের বউ নন্দিতা স্বামীর শিল্পীসত্তাকে শ্রদ্ধা করেন। স্বামীর ছবি আঁকা নিয়ে প্রচ্ছন্ন ভাবে গর্বিত তিনি। আর অভিজিতের মা বীথিকাদেবী বললেন, খুব ছোটোবেলা থেকেই ওর ছবি আঁকার হাত। বহু প্রতিযোগিতায় পুরস্কৃত হয়েছে ওর হাতে আঁকা ছবি। শান্তিনিকেতনের কলাভবনে শেখার সুযোগ পেয়েছিল। কিন্ত ওর বাবার খরচ চালানোর মতো সঙ্গতি ছিল না।

painting of avijit 2অভিজিৎ বললেন, গত বারো বছর ধরে মানুষকে পুতুলের মতো অবয়বে আঁকছি। জীবনের সুখ-দুঃখ-আকাঙ্ক্ষায় নেচে ওঠা মানুষের জীবনকে যেন সুতোর টানে চালায়। মানুষ তো এক রকম পুতুলই। এই বলে অভিজিৎ সদ্যসমাপ্ত একটি ছবি দেখান। সে-ও পুতুলনাচের সুতোর টানের ছবি।

অভিজিৎ খানিকটা স্বগতোক্তির মতো করে বললেন, কলাভবনে পড়া হল না। ছবি আঁকা শিখেছি পাড়ার স্কুলে। এর বাইরে দেখে দেখে, প্রদর্শনীতে ঘুরে ঘুরে। জানালেন, সেইকালে পাড়ার ছবি আঁকার স্কুলগুলি চালাতেন সরকারি আর্ট কলেজ থেকে পাশ করা শিল্পীরা। অভিজিৎ ওঁদের কাছেই শিখেছেন ছবি আঁকার অ আ।

স্বপ্ন বলতে ছেলে মানুষ করার পাটটাও। মানিকের পুতুলনাচের ইতিকথার শিল্পীচরিত্রটি শিল্পী হিসাবে জয়লাভের জন্য সর্বস্ব পণ করে বাস্তবের ধাক্কায় চুরমার হয়েছেন। আর শহরের রুক্ষ রাস্তায় অলট্রোচালক অভিজিৎ বলেন, পেট আগে, শিল্প তারপর।

ঢিলছোঁড়া দূরত্বে কিশোর কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের পৈতৃক বাড়ি। অভিজিতের প্রতিবেশী সুকান্তই তো লিখেছিলেন, পূর্ণিমা চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি!

উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য দিন !
আপনার নাম লিখুন