mery shelly, painter samuel john stump
মেরি শেলি, ১৮৩১-এ স্যামুয়েল জন স্টাম্পের আঁকা। ছবি সৌজন্যে দি ন্যাশনাল।

তপন মল্লিক চৌধুরী

আজ থেকে দু’শো বছর আগের কথা। সুইজারল্যান্ডে লেক জেনেভায় এক ঘরোয়া আড্ডায় হাজির সস্ত্রীক পার্সি বিসি শেলি, লর্ড বায়রন ও চিকিৎসক জন পোলিডরি। তাঁরা একটি ভূতের গল্পের বই থেকে পরস্পরকে একটার পর একটা গল্প পড়ে শোনাচ্ছিলেন। এক সময় বায়রন বললেন যে প্রত্যেককে একটি করে ভূতের গল্প লিখতে হবে। সেই গল্পগুলি থেকে সেরা গল্পের লেখককে ভোটের মাধ্যমে বিজয়ী করা হবে। প্রথমে একটা ছোটো গল্প হিসাবেই লিখবেন ভেবেছিলেন পার্সি বিসি শেলির স্ত্রী মেরি শেলি, কিন্তু তাঁর স্বামীর অকুন্ঠ উৎসাহে লিখলেন উপন্যাস ‘ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন, অর দ্য মর্ডান প্রমিথিউস’। মজাচ্ছলে গল্প লিখতে গিয়ে ১৮ বছরের মেরি শেলির ভেতরে প্রোথিত হয় লেখক হওয়ার স্বপ্ন। সেই স্বপ্নের কথা মেরি লিখেছিলেন তাঁর গল্পের নায়কের মুখে, ‘আমার স্বপ্নগুলো আমারই ছিল। এই স্বপ্নগুলো আমি অন্য কারও জন্য দেখিনি। যখন আমি খুব অস্থির হয়ে পড়তাম, আমার স্বপ্নগুলো আমায় আশ্রয় দিত, আমার উড়ে বেড়ানোর দিনগুলোতে এরাই ছিল আমার প্রিয় সুখ!’

আরও পড়ুন রবিবারের পড়া : লেজারের ফ্রেমে বন্দি ব্যাক্টেরিয়া

মেরি শেলির জীবন ছিল ট্র্যাজেডিতে ভরপুর। মাত্র এক মাস বয়সে হারিয়েছিলেন মাকে। বাবার নতুন স্ত্রী তাঁকে আনুষ্ঠানিক শিক্ষা দিতে আগ্রহী ছিলেন না। পড়াশোনা শেখাটা ছিল বাড়িতে, মায়ের কবরের পাশে বই পড়ে। ১৬ বছর বয়সেই মেরি শেলির সঙ্গে দেখা হয় কবি পার্সি শেলির। পার্সি শেলি বিবাহিত জানার পরও মেরি তাঁর প্রেমে পড়েন। পার্সি শেলির প্রেমে পড়েছেন তাঁর মেয়ে, খবরটি শোনামাত্র মেরির বাবা এই সম্পর্ক নাকচ করে দেন। পার্সি ও মেরি পালিয়ে গিয়ে ইউরোপ ভ্রমণ করেন এবং বিয়ে করেন। এর পর প্রথম দুই সন্তানের শিশু অবস্থায় মৃত্যু, সৎবোনের আত্মহত্যা মেরিকে তাড়িয়ে বেড়িয়েছে দীর্ঘদিন। মনে হয়, মেরি তাঁর প্রিয়জনদের স্মৃতি বাঁচিয়ে রাখার প্রবল ইচ্ছা থেকেই লিখতে শুরু করেন ফ্রাঙ্কেনস্টাইন। তাঁর উপন্যাসের বিজ্ঞানীর চরিত্রের নাম ফ্রাঙ্কেনস্টাইন, যিনি একটি মৃতদেহ থেকে সৃষ্টি করেন একটি অতিমানব বা দানব। সেই দানবের প্রতিশব্দ হিসেবে আমরা এখন যে ফ্রাঙ্কেনস্টাইনকে ভাবি, মেরির উপন্যাসে আদতে সে ছিল বিজ্ঞানী যার নাম ড. ভিক্টর ফ্রাঙ্কেনস্টাইন। মেরির গল্পে দানবের কোনো নাম নেই।

frankenstein, 1st edition
ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের প্রথম সংস্করণ।

যা-ই হোক, ১৮১৮ সালের ১ জানুয়ারি লন্ডনের এক অনামী প্রকাশনা থেকে ‘ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন’ প্রকাশিত হল। ছাপা হয়েছিল মাত্র ৫০০ কপি। অজ্ঞাত লেখক উপন্যাসটি উৎসর্গ করেছিলেন দার্শনিক-ঔপন্যাসিক-সাংবাদিক বাবা উইলিয়াম গডউইনকে। ভূমিকা লিখেছিলেন পার্সি বিসি শেলি। প্রথমে বইটি সমাদৃত হয়নি। এত ভয়ংকর বিষয় সেই সময়ের পাঠক গ্রহণ করতে প্রস্তুত ছিল না। উপরন্তু যখন জানাজানি হল এই লেখা এক মহিলার, তখন মানুষ স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল। তাঁর উপন্যাস থেকেই ‘ফ্রাঙ্কেনস্টাইন’ কথাটি ছড়িয়ে গেল। সাহিত্যের ইতিহাসে নতুন এক ধারা, কল্পবিজ্ঞানের জন্ম দিলেন মেরি শেলি। সে সময় বেশির ভাগ মহিলা–লেখক লিখতেন পুরুষের ছদ্মনামে, কিন্তু মেরি লিখেছিলেন স্বনামেই। প্রথমে অনেকে ভেবেছিল এটি তাঁর স্বামীর লেখা। অচিরেই সেই ভুল ভাঙে।

মেরি শেলির অনবদ্য কল্পনা আকাশকুসুম নয়, এর পিছনে ছিল তৎকালীন বিজ্ঞানের খুঁটিনাটি বিষয়। তিনি সেই সময়ের চিকিৎসাব্যবস্থা এবং বিজ্ঞানের অগ্রগতি সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবহিত ছিলেন। সমকালীন বিজ্ঞানের জীবন ও মৃত্যুর সীমানা-অন্বেষক আবিষ্কার তাঁর লেখায় গভীর ভাবে প্রভাব বিস্তার করেছিল। যেমন জলে ডুবে আপাত মৃত মানুষের পুনর্জীবন আর প্রাণীকোষের উপর ইলেক্ট্রিসিটির প্রভাব। মেরি শেলির ডায়েরিতে পাওয়া যায় যে তিনি লন্ডনে এক দিন তড়িৎ চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রয়োগ বিষয়ে একটি  সেমিনার শুনেছিলেন। যদিও তাঁর  ফ্রাঙ্কেনস্টাইন গল্পে তিনি ‘ইলেক্ট্রিসিটি’ কথাটি এক বারও ব্যবহার করেননি। কিন্তু ১৯৩১ সালের সংস্করণের ভূমিকায় তিনি উল্লেখ করেন যে মৃতদেহে প্রাণ সঞ্চারের ক্ষেত্রে তাঁকে গ্যালভানির পরীক্ষা প্রভাবিত করেছিল। তা ছাড়া জলে ডুবে তাঁর মায়ের মারা যাওয়া এবং বেঁচে ওঠার পরের হতাশা অনেকাংশে প্রতিফলিত হয়েছে মেরি শেলির ফ্রাঙ্কেনস্টাইন গল্পে।

আরও পড়ুন রবিবারের পড়া : সম্পর্কের সীমানায়, অথবা সম্পর্কের সীমা নাই

মেরি শেলি সারা জীবনই চড়াই-উৎরাই পেরিয়েছেন। নৌকাডুবির ঘটনায় যখন কবি পার্সি বিসি শেলি ২০ বছর বয়সে মারা গেলেন তখন মেরির বয়স চব্বিশ। পরবর্তী জীবনে মেরিকে অক্লান্ত পরিশ্রম করতে হত তাঁর এবং একমাত্র জীবিত সন্তানের ভরনপোষণের জন্য। নিজের সৃষ্টির কথা না ভেবে তিনি নিজেকে ডুবিয়ে দিয়েছিলেন তাঁর স্বামীর বিভিন্ন কবিতাকে জনসমক্ষে তুলে ধরার কাজে। পার্সি শেলিকে ইংরাজি সাহিত্যের ইতিহাসে পরিচিত করানোর জন্য মেরি শেলির অবদান অবিস্মরণীয়। মেরি শেলিকে সবাই চেনে পার্সি শেলির পত্নী হিসাবে। অথচ তাঁর নিজস্ব সাহিত্যকর্মও কিছু কম ছিল না। ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইনের মতো সাড়াজাগানো উপন্যাস ছাড়াও আরও ছ’টি উপন্যাস, তিনটি শিশুসাহিত্য, অজস্র ছোটো গল্প, কবিতা, যুদ্ধবিদ্ধ্বস্ত ইউরোপে তাঁদের ছ’ সপ্তাহের ভ্রমণ ছাড়াও আরও নানা লেখা তিনি লিখেছিলেন। কিন্তু ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইনের পর তিনি কোনো দিনও শুধুমাত্র সাহিত্যিক হিসাবে মর্যাদা পাননি। মেরি শেলির সেই অভিশপ্ত দানবচরিত্র যেমন মেরে ফেলেছিল নিজের প্রাণদাতা ডক্টর ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইনের পরিবারকে, তেমনি ওই চরিত্রের অতি জনপ্রিয়তার ঔজ্জ্বল্যে ঢাকা পড়ে গিয়েছিল স্রষ্টা মেরি শেলির অন্যান্য রচনা।

গত দু’ শতক ধরে ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন জায়গা পেয়ে আসছে সিনেমা, টিভি, নাটক, বই, কার্টুন এবং কমিক্সের পাতায়। ১৮২২ সালের দ্বিতীয় সংস্করণের আগে কিন্তু অনেকেই জানতেন না এর রচয়িতা মেরি শেলি। ১৮১৮ এবং ১৮২২ – এই দুই সংস্করণে কোনো ছবিও ছিল না। ৮ ফুট লম্বা, হলদে চোখ এবং পাতলা চামড়ার আবরণ ভেদ করে পেশিকোষ এবং রক্তনালি ফুটে উঠছে- লেখিকার এই বর্ণনা থেকেই পাঠক কল্পনা করে নিত ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইনের গড়া অতিমানব বা দানবকে। ১৮২৩ সালে ইংলিশ অপেরা হাউসে প্রথম মঞ্চস্থ হয় ‘Presumption; or the Fate of Frankenstein’। পেশাদার মঞ্চ-অভিনেতা থমাস কুক ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইনের নামহীন দানবের ভূমিকায় অভিনয় করেন। মেরি শেলি সেই নাটক দেখেন এবং থমাস কুকের অভিনয়ের ভূয়সী প্রশংসা করেন। সেই প্রথম ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইনের দানবের সঙ্গে সকলের চাক্ষুষ পরিচয় ঘটে।  প্রযোজনাটি সফল হওয়ায় পরের তিন বছর ইংল্যান্ড, ফ্রান্স ও আমেরিকায় প্রায় ১৪টি প্রযোজনা মঞ্চস্থ হয়। ১৮২৬ সালে প্যারিসে ‘Le Monstre et le magician’ নাটকে থমাস কুক আবার অভিনয় করেন। উল্লেখ্য, ওই নাটকে দানবের মেকআপে মুখে সবুজ রঙ দেওয়া হয়, যা পরবর্তী প্রায় একশো বছর ধরে ওই চরিত্রের সিগ্নেচার মেকআপ হয়ে যায়।

১৮৩১-এ ফ্রাঙ্কেন্সটাইন-এর তৃতীয় সংস্করণটি হয় প্রথম ইলাস্ট্রেটেড সংস্করণ। এর পর সব সংস্করণেই দানবের ছবি ছাপা হতে থাকে। উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন কথাটি কথ্য এবং লেখার ভাষায় ভীষণ ভাবেই ব্যবহৃত হতে থাকে। এই সময় কার্টুনিস্টরাও ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইনের দানবকে নানা ভাবে তাঁদের ছবিতে তুলে ধরেন।

boris karloff as the monster of Frankenstein
ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের দানবের চরিত্রে বরিস কার্লফ।

১৯১০ সালে ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইনের দানব প্রথম ধরা দিল ছায়াছবিতে। ১৯৩৪ সালে উডকাট শিল্পী লিন্ড ওয়ার্ড নতুন করে আঁকেন ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের দানবের ছবি। তার আগে ১৯৩১ সালে মুক্তি পায় ইউনিভার্সাল পিকচার্সের ‘ফ্রাঙ্কেনস্টাইন’। জেমস হয়াল পরিচালিত এবং বরিস কার্লফ অভিনীত ছবিতে ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইনের দানবের যে চেহারা ফুটে ওঠে তা পরবর্তী ৬০ বছর ধরে অপরবর্তিত রয়ে যায়। ১৯৩৯ সালে ডিসি কমিক্সে যে ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের দানব আত্মপ্রকাশ করে সেখানেও বরিস কার্লফ-এর প্রভাব। তবে ১৯৪৫-এ ক্লাসিক ইলাস্ট্রেডেড কমিক্স-এ বরিস কার্লফ-এর ছায়া কমে গেলেও রেশ থাকে ৬০-এর দশক পর্যন্ত। ইতিমধ্যে সেলুলয়েডে ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের দানব তার নিজস্ব কণ্ঠস্বর লাভ করে, পড়াশোনা করতে শেখে এবং বিয়েও করে। ১৯৭৩-এ অ্যান্ডি ওয়ারহেল প্রযোজিত ‘ফ্লেশ ফর ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন’ এক নতুন দানবের চেহারা নিয়ে আসে দর্শকের সামনে। জেলেনোভিচ অভিনীত সেই দানবকে বলা হয় সব চেয়ে হ্যান্ডসাম।  উল্লেখ্য, এই সময়েই মুক্তি পায় ‘ব্ল্যাকেনস্টাইন’ – ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইনের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ দানব।

বের্নি রাইটসন ১৯৮৩-তে কমিক্স ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইনের জন্য আবার এক নতুন চেহারার দানবকে আঁকেন। দেখা গেল সেই চেহারার সঙ্গে যেন মেরি শেলির বর্ণনা পুরো মিলে যাচ্ছে।

১৯৯৪-তে মুক্তি পেল কেনেথ ব্রানাগ পরিচালিত এবং রবার্ট ডি নিরো অভিনীত ‘Frankenstein’।  ছবিটি হিট না হলেও নতুন আঙ্গিকে দানবের রূপায়ণ দর্শককে ভাবিয়েছিল।

২০১১-য় লন্ডনের ন্যাশনাল থিয়েটার ড্যানি বয়েলের পরিচালনায় নতুন আঙ্গিকে থিয়েটারে ফ্র্যাঙ্কেনন্সটাইন মঞ্চস্থ করে। মুখ্য অভিনেতা জনি লি মিলার এবং বেনেডিক্ট ক্যাওবেরব্যাচ দু’জনে এই নাটকে ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন এবং দানবচরিত্র পালটাপালটি করে অভিনয় করেন।

zelenovic in 'Flesh for Frankenstein'.
‘ফ্লেশ ফর ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন’-এ জেলেনোভিচ।

ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন বলতেই মনের মধ্যে ভেসে ওঠে এক অতিকায় দানব। যে মৃত্যুর পরপার থেকে ফিরে এসেছে বিভীষিকা হয়ে। তার চেহারায় সেলাই-এর দাগ। জলন্ত দুই চোখ। পাতলা চামরার নীচে দেখা যাচ্ছে পেশি,শিরা, ধমনী। সে নিষ্ঠুর, অমানবিক। কিন্তু সে তো ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন নয়। সে ডা. ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইনের আবিষ্কার। তিনি বানাতে চেয়েছিলেন এক শ্রেষ্ঠ মানুষ, অথচ ভুল করে বানিয়ে ফেলেন এক দানব। তার নাম নিয়েই দানবটা দু’শো বছর ধরে বেঁচে থাকে আমাদের কল্পনায়। এমনকি আজও সেই গথিক সায়েন্স ফিকশনের কালো দুনিয়া আমাদের পিছু ছাড়েনি।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here