street lighting in kolkata
মধুমন্তী চট্টোপাধ্যায়

অনেক ছোটোবেলায় রুশ দেশের গল্পে পড়েছিলাম এক দেশের কথা – আর্তেক। সেখানে সবাই সব সময় খুশি। মন ভালো আছে সব্বার। দুঃখ নেই, যন্ত্রণা নেই। আছে শুধু হাসি-মজা-গান-গল্প। গেঁড়ি থেকে বড়োবেলায় পৌঁছোনোর মাঝের পথটায় কত খুঁজেছি স্বপ্নের আর্তেককে। কেউ কেউ বুঝিয়েছিল ওটা কোনো দেশ নয়, একটা ভাবনা মাত্র। এমন দেশ আছে, এই ভাবনাটাকেই নাকি খড়কুটোর মতো আঁকড়ে ধরে ক্ষয়ে যেতে যেতে ভুল করে হলেও হিসেবের বাইরে একটু বেঁচে নেয় মানুষ। সবে মন থেকে আর্তেকের ছবিটা ফিকে হতে শুরু করেছে কী করেনি, খবর পেলাম বেহিসেবি, বাড়তি জীবন বাঁচতে চাওয়া মানুষগুলো নাকি সত্যি আজকাল ভিড় করছে এক শহরে। কী আশ্চর্য! শহর নাকি ফিরিয়ে দিচ্ছে না কাউকে। আজ তা হলে সেই শহরের গল্পই শোনা যাক।

মরশুমি সুখের পসরা বসে সে শহরে। বারো মাস উৎসব। আর তার আয়োজনপর্ব চলে আঠারো মাস। সব মিলিয়ে একটা হই হই ব্যাপার। জীবন উদযাপনে সামিল হতে কত মানুষ যে আসছে সেখানে। গোটা শহরটাই মুড়িয়ে ফেলা হয়েছে আলোয় আলোয়। গান বাজছে সারা রাত। দিব্যি হেসে খেলে ফুর্তিতে কাটছে দিন। হাতে হাত রাখা থাকছে সবার। সকাল বিকেল রকমারি হ্যাশ ট্যাগের ছাতার  তলায় উপচে পড়ছে হাসি খুশি মুখের কত শত নিজস্বী। ছবির মতো, গল্পের মতো শহর সে এক। শোনা যায় নটে গাছ মুড়োনোর আগেই সে শহরের সব গল্পে থাকে হ্যাপি এন্ডিং। আরও শোনা যায়, … পাঠকবন্ধুরা কী শুনবেন সে সব? শোনা যায়, সেই সমস্ত ‘হ্যাপি এন্ডিং’-এর পর পরই কোথাও থাকে এন্ডলেস অন্ধকার।

কানে হেডফোন গুঁজলেই যেমন অনেক কান্না, অনেক ‘ফুল নেবে গো দিদি, নাও না, সকাল থেকে একটাও বিক্রি হয়নি’ কিংবা ‘দু দিন ধরে কিছু খাইনি বাবু’ চাপা পড়ে যায়, আমাদের গল্পের সেই শহরেও নাকি তেমনটা হয়। মেলা, পার্বণ, মজলিসের কোলাহলের মাঝে কোথায় কান্না? আর্তনাদ কোথায়? বাড়িতে না বলে কয়ে হঠাৎ লোক এসে পড়লে ফেলতে-না-পারা জঞ্জালগুলো সব একপাশে সরিয়ে ওপরে জড়িয়ে দেওয়া হয় রঙিন কাপড়, চমৎকার সব নকশা আঁকা গায়ে। সে শহরেও নাকি এমন হয়। অতিথি আসবে বলে শহর সেজে ওঠে হাজার আলোয়। অতিথি আসে, ঘুরে ফিরে দেখে, আবার ফিরেও যায়। কিন্তু আলো নেভে না। সেজেই থাকে সে শহর। একে একে শহরের মানুষগুলোই কেমন অতিথি হয়ে যায়। রোজকার পেশাগত ক্লান্তি কাটাতে সেখানে এসে পড়ে এক একটা শুক্রবারের রাত। এর মাঝে পাশের ফ্ল্যাটের একা বুড়োর ঝুলন্ত দেহটার কথা যদি জানতে হয় শনিবারের শিরোনাম থেকে, তার দায়টা কার? সারা সপ্তাহের ক্লান্তি পুষিয়ে দিতে মজুত ছিল তার দ্বিগুণ আয়োজন। এতে দোষের কী আছে?

হাওয়ায় খবর আসে, চোখ ধাঁধানো আলো দিয়ে নাকি সে শহরে রাতারাতি ভরাট করা হয়েছে অন্ধকার সব গর্ত। কে জানে, কতটা গভীর সে অন্ধকার? কতটা হাড় হিম করা ভয়ের? তবে, পাঠকবন্ধুরা অযথা ভয় পাচ্ছেন কেন? গল্পের এ শহর নিশ্চয়ই আমাদের শহর নয়। কিন্তু কারা যেন বলছিল…।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here