sonagacchi of past days
সে দিনের সোনাগাছি।
avijit kumar chatterjee
অভিজিৎ কুমার চ্যাটার্জি

আইনের ফাঁক গলে বহু পুরুষের বাঁধা রক্ষিতারা চোদ্দো আইনের আওতার বাইরে থেকে গিয়েছিলেন। যে সব বারবনিতা বিভিন্ন পুরুষের বিনোদনের জন্য চিহ্নিত ছিলেন তাঁরাই এই আইনের আওতার মধ্যে পড়েছিলেন। সেই সময় গঙ্গার পাড়ে যে সব কলকারখানা গড়ে উঠেছিল, সে সব কারখানার শ্রমিকশ্রেণিকে কেন্দ্র করে এক সমাজ গড়ে ওঠে যেখানে নিম্ন শ্রেণির বহু মহিলা পুরুষ শ্রমিকদের সঙ্গে বাস করতেন। অভাবের তাড়নায় নিম্নবর্গের বহু বিধবা, স্বামী পরিত্যক্তা, কলকাতায় এসে ওই কলকারখানার আশেপাশে জড়ো হয়েছিলেন। এটাকেও এক ধরনের গণিকাবৃত্তি বলে ধরে নেওয়া হলেও তাঁরা বহু পুরুষের সঙ্গ দান করতেন না। সেই কারণে তাঁরাও এই আইনের বাইরে বলে দাবি তোলেন। তবে এঁরা বা বাঁধা রক্ষিতারা চোদ্দো  আইনের আওতায় পড়বে কিনা তা পুলিশ প্রশাসন ঠিক করতেন। ফলে গণিকাপল্লিগুলিতে পুলিশের দৌরাত্ম্য বেড়ে যায়, পুলিশদের উৎকোচ নেওয়াও বৃদ্ধি পেতে থাকে।

ডাক্তারি পরীক্ষায় যৌনরোগের লক্ষণ দেখা দিলে বারবণিতাদের লক হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হত। ফলে গণিকাদের জীবিকার্জনের পথ বন্ধ হয়ে যেত। হাসপাতালবাসের সময়ে তাঁদের ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলি অর্থনৈতিক ভাবে অসহায় হয়ে যেতেন। হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার কারণে সরকারি ভাবে তাঁরা ‘যৌনরোগে আক্রান্ত’ বলে সমাজে চাউর হয়ে যেত। তাঁদের কাছে খরিদ্দার আসার আর সুযোগ থাকত না। কাজেই পুলিশ প্রশাসনের কাছে নিজেদের দেহোপজীবিনী বলার চাইতে বাঁধা রক্ষিতা বলে পরিচিতি দেওয়ার প্রবণতা দেখা দেয় গণিকাদের মধ্যে। শুরু হয় পুলিশ ও গণিকাদের মধ্যে লুকোচুরি খেলা।

আরও পড়ুন: রবিবারের পড়া: চোদ্দো আইন / প্রথম পর্ব

গণিকাদের নিয়ে সমাজের দ্বিধাবিভক্ত মানসিকতার ছবিও ফুটে উঠেছিল সংস্কৃতি জগতেও। তখনকার দিনে রচিত বিভিন্ন সংগীত, কাওয়ালি, কবিতা, নাটক ও বটতলার বইগুলিতে বিভিন্ন ভাবে গণিকাদের ভোগান্তির কথা উঠে এসেছে। আবার অন্য দিকে অনেক গল্প, কবিতা, গান, বইও রচিত হয়েছিল গণিকাদের ঘাতকিনী হিসেবে উল্লেখ করে।

চোদ্দো আইনে গণিকাদের ভোগান্তির কোনো অন্ত ছিল না। আইন অনুযায়ী প্রতিটি বারবনিতাকে কয়েক দফা সরকারি কার্য সম্পাদনের মাধ্যমে সরকারি ভাবে রেজিস্ট্রিভুক্ত হতে হত। প্রত্যেক গণিকার থাকত আলাদা আলাদা রেজিস্ট্রি নম্বর। অন্য দিকে গণিকাদের খদ্দেররা ছিলেন সমাজের বিভিন্ন মান্যগণ্য ধনবান পুরুষ। তাঁরা এই আইনের আওতায় পড়তেন না। তাঁদেরও যে যৌনরোগ থাকতে পারে সেই সম্পর্কে প্রশাসন থাকত উদাসীন।

‘নগ্ন অবস্থায়, মুখ ঢেকে দিয়ে তাঁদের যৌনাঙ্গ পরীক্ষা করা হত’ – চিকিৎসার নামে ডাক্তারদের কাছে এই ধরনের আত্মসমর্পণ বারবণিতাদের কাছে অপমানকর হয়ে ওঠে।

চোদ্দো দিন অন্তর কোনো বারবনিতা ডাক্তারি পরীক্ষা করাতে না গেলে বা যেতে অস্বীকৃতি জানালে তাঁর বিরুদ্ধে জারি হত গ্রেফতারি পরোয়ানা। দিনে রাতে যে কোনো সময় উক্ত নারীকে পুলিশ এসে ধরে নিয়ে যেত। এ ছাড়াও ছিল বিভিন্ন বিধিবলে নানা মেয়াদের শাস্তি ও অর্থ ণ্ডের ব্যবস্থা। উক্ত ডাক্তারি পরীক্ষা এতই বেদনাদায়ক ছিল যে, সেই সময় ওই পরীক্ষার ভয়ে অনেক গণিকাই কলকাতা ছেড়ে ফরাসডাঙায় (বর্তমান চন্দননগর) পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন। ফরাসিশাসিত চন্দননগরে ইংরেজ আইনের বাধানিষেধ খাটত না। ডাক্তারি পরীক্ষার নামে গণিকাদের উপরে নেমে এসেছিল সরকারি মদতপুষ্ট পুলিশি নির্যাতন। শেষ অবধি সেই পরীক্ষা হয়ে উঠেছিল এক অশ্লীল অনাচার ও অত্যাচারের জায়গা মাত্র।

সমাজে কিছু সংখ্যক রক্ষিতা তাঁদের বাঁধা বাবুদের বদানত্যায় অন্যত্র চলে যেতে পারলেও অধিকাংশ বারবনিতাই কিন্তু এই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছিলেন। বটতলা থেকে তৎকালীন সময়ে প্রকাশিত পত্রিকাগুলিতে বারবণিতাদের ডাক্তারি পরীক্ষার অভিজ্ঞতা উঠে আসে। ‘নগ্ন অবস্থায়, মুখ ঢেকে দিয়ে তাঁদের যৌনাঙ্গ পরীক্ষা করা হত’ – চিকিৎসার নামে ডাক্তারদের কাছে এই ধরনের আত্মসমর্পণ বারবণিতাদের কাছে অপমানকর হয়ে ওঠে। তৎকালীন সমাজের গৃহস্থ কুলকামিনীরা অবশ্য বারবণিতাদের অপমানকে হাস্যকর বলেই মনে করতেন। বারবণিতাদের মানসিকতার টানাপোড়েন কুলকামিনীরা কখনোই বুঝতে পারেননি। গবেষকেরা মনে করেন, গৃহস্থ বধূদের এই ধরনের মানসিকতার পিছনে এক ধরনের প্রতিশোধস্পৃহা কাজ করেছিল, হয়তো তাঁদের ঘরের পুরুষেরা গণিকালয়মুখী ছিলেন বলেই।

তৎকালীন সময়ে অ্যান্টিবায়োটিক বা জীবাণু প্রতিরোধক ওষুধ আবিষ্কার না হওয়ার ফলে, যৌনরোগে সংক্রামিত গণিকাদের স্ত্রী অঙ্গে পারা (মারকারি) প্রবেশ করিয়ে দেওয়া হত, যা ছিল অত্যন্ত দহনকারী ও কষ্টকর। এ কথাও শোনা যায় তৎকালীন ডাক্তাররা বারবণিতাদের রজঃস্বলাক্ষেত্রেও পারা প্রয়োগ করতে দ্বিধা করতেন না। এই ধরনের চিকিৎসাপ্রয়োগের জন্য বারবণিতাদের যৌন রোগকে অনেক গবেষক, ‘ফিরিঙ্গি রোগ’ বা ‘পারার রোগ’ বলেও উল্লেখ করেছেন।

josephine butler
জোসেফিন বাটলার।

এ দিকে তৎকালীন ইংল্যান্ডে তাঁদের দেশের Contagious Diseases Act তথা সংক্রামক রোগ বিষয়ক আইনের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে উঠেতে থাকে। ইংল্যান্ডের নারীবাদী নেত্রী জোসেফিন এলিজাবেথ বাটলার এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তাঁর কাছে ভারতবর্ষের আইনটির ভয়াবহ রূপের খবর পৌঁছোয়। তিনি ও তাঁর সংগঠন  লেডিস ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন  ভারতবর্ষের তৎকালীন ঔপনিবেশিক ইংরেজ সরকারি কর্তাব্যাক্তিদের আইনের নামে ভারতীয় নারীদের এই উৎপীড়নের বিরুদ্বে স্মারকলিপি দিয়েছিলেন, সময়টা তখন ১৮৭০ সাল। ১৮৮৭ সালে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, রাধাকান্ত দেব প্রমুখ সচেতন ভারতীয় নাগরিকদের তৈরি ব্রিটিশ ইন্ডিয়া অ্যাসোসিয়েশনও তৎকালীন ঔপনিবেশিক ইংরেজ সরকারি কর্তাব্যাক্তিদের কাছে এই আইনের বিরুদ্ধাচরণ করে স্মারকলিপি দিয়েছিলেন। ভারতবর্ষের কিছু খ্রিস্টান মিশনারি ও এ দেশের কয়েকজন সমাজসচেতন নাগরিকদের চাপে অবশেষে ১৮৮৮ সালে ঔপনিবেশিক ইংরেজ সরকার সংক্রামক রোগ বিষয়ক আইন প্রত্যাহার করেন।

অনেক গবেষকের মতে, তৎকালীন ইংরেজ সরকারি কর্তাব্যাক্তিরা উপলব্ধি করেছিলেন যে আইন করে যৌনব্যাধি গণিকাবৃত্তি রোধ করা যাবে না। আইনের বিফলতার অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করে তাঁরা দেখেছিলেন যে, যে হেতু গোরা সৈন্যরা মিলিটারির তদারকির অধীনে থাকা গণিকালয়ের বাইরের গণিকাদের সঙ্গে অবাধে মেলামেশা করত, তাই ইংরেজ সরকারের এই আইন সৈন্যদের মাঝে যৌন রোগের প্রাদুর্ভাব কমাতে তো পারেইনি, বরং দেখা যায়, এই আইন যখন বন্ধ করে দেওয়া হয় তখন গোরা সৈন্যদের মধ্যে প্রায় ৫০% যৌনরোগে আক্রান্ত ছিল।

পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারী পণ্যদ্রব্যের মতো ব্যবহৃত হত। কাজেই সমকালীন পুরুষেরাও তাঁদের নিজেদের প্রয়োজনের স্বার্থেই গণিকাবৃত্তির প্রচলন ও পৃষ্ঠপোষকতা বজায় রেখেছিলেন। বিকিকিনির বাজারে দেহপসারিনিদের প্রয়োজন তাই কখনোই শেষ হতে পারে না। ভারতীয় পুরুষের এই দ্বিচারিতা দেখে গণিকাদের পুনর্বাসন নিয়ে গণিকারাই দ্বিধান্বিত ছিলেন। তাঁরা একটি কথার সারমর্ম বুঝেছিলেন – পুরুষতান্ত্রিক সমাজ কখনোই তাঁদের সামাজিক স্বীকৃতি দেবে না। তাই চোদ্দো আইনের প্রয়োগের কুফল কুড়ি বছর ধরে ভুগলেও আইন বিলোপের পরে সমাজসংস্কারকদের পুনর্বাসনের ডাকে তাঁরা সাড়া দেননি। পুনর্বাসনের ফলে পুরুষতান্ত্রিক সমাজে স্বাধীনতার স্বাদ যে হারাতে হতে পারে, চোদ্দো আইন প্রয়োগের কুড়ি বছরের অভিজ্ঞতা, তাঁদের সে শিক্ষা দিয়েছিল বলেই গবেষকদের ধারণা।

যে হেতু গোরা সৈন্যরা মিলিটারির তদারকির অধীনে থাকা গণিকালয়ের বাইরের গণিকাদের সঙ্গে অবাধে মেলামেশা করত, তাই ইংরেজ সরকারের এই আইন সৈন্যদের মাঝে যৌন রোগের প্রাদুর্ভাব কমাতে তো পারেইনি, বরং দেখা যায়, এই আইন যখন বন্ধ করে দেওয়া হয় তখন গোরা সৈন্যদের মধ্যে প্রায় ৫০% যৌনরোগে আক্রান্ত ছিল।

তখনকার সময়ে, সমাজসংস্কারক, বুদ্ধিজীবী ও শিক্ষিত সমাজের ব্যাক্তিরা গণিকাবৃত্তির বিপক্ষ নিয়ে ইংরেজ সরকারের প্রশংসা করেন। গণিকাদের জন্য শহরের বাইরে আলাদা আলয় বা নিবাস তৈরির জন্য প্রস্তাব রেখেছিলেন তাঁরাই। অবশ্য ইংরেজ সরকারের পরোক্ষ চেষ্টা ছিল এই প্রথা বিলুপ্তির। কিন্তু সরকারের চাওয়াতে কী আসে যায়, যদি না সৈন্যদল, সাধারণ সুশীল, বিত্তবান পুরুষেরা গণিকালয়ে যাওয়া বন্ধ করেন। তাই গণিকাপ্রথা টিকে যায় এবং টিকে থাকে যুগে যুগে, কালে কালে। কারণ আমরা দিনের বেলা বারবনিতাদের ঘৃণা করলেও আবার রাতের বেলায় আমরাই তাঁদের বুকে টেনে নিই।

তাই তো যখন বৈশালীতে সেখানকার বারবণিতা আম্রপালীর কাছে সশিষ্য আমন্ত্রণ গ্রহণ করলেন গৌতম বুদ্ধ, বৈশালীর মানুষ হতবাক হয়ে যান। রূপেগুণে ছলাকলায় অতুলনীয়া, আম্রপালী ছিলেন বৈশালী ও তার আশেপাশের রাজন্যবর্গ ও সম্ভ্রান্ত ধনাঢ্য ব্যক্তিদের অতি কাম্য কিন্তু সমাজে ছিলেন অপাংক্তেয়া। সবাই তাঁকে ঘৃণা ও অবজ্ঞার চোখে দেখতেন। শ্রমণ গৌতম একজন সংসারত্যাগী সন্ন্যাসী হয়ে একজন নষ্টা মেয়েলোকের প্রমোদ উদ্যানে উঠেছেন এবং সমাজচ্যুত ও অস্পৃশ্যা গণিকার গৃহে নিমন্ত্রণ নিয়েছেন! হতবাক সমাজের এই ছবি আজও বিদ্যমান, তাঁরা বিছানার সঙ্গী হতে পারেন কিন্তু সমাজের চোখে স্বীকৃত হতে পারেন না! (শেষ)

তথ্যঋণ:-

১) বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস- সুকুমার সেন

২) কলকাতা শহরের ইতিবৃত্ত – বিনয় ঘোষ

৩) কলিকাতা দর্পণ – রাধারমণ মিত্র

৪) উনিশ শতকের কলকাতা ও সরস্বতীর ইতর সন্তান – সুমন্ত বন্দ্যোপাধ্যায়

৫) The Elusive Ingenue : A transnational Feminist Analysis of European Prostitution in Colonial Bombay – Dr. Ashwini Tambe

৬) কলকাতার যৌনপল্লী – দেবাশিস বসু

৭) অশ্রুত কণ্ঠস্বর – সুমন্ত বন্দ্যোপাধ্যায়

৮) পুরোনো কলকাতার অন্য সংস্কৃতি – বিশ্বনাথ জোয়ারদার

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here