records of puja songs
পুজোর গানের রেকর্ড।

তপন মল্লিক চৌধুরী

১৯৪২-এর পুজোর রেকর্ড ‘চিঠি’ গেয়েই গানের জগতে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিলেন জগন্ময় মিত্র। তাঁর সাড়াজাগানো পুজোর আরেকটি রেকর্ড ১৯৪৮-এ প্রকাশিত ‘সাতটি বছর আগে পরে’। রাগভিত্তিক ও ভক্তিমূলক গানে অভ্যস্ত ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য এক পুজোয় অভিনব ছন্দবিন্যাসে ‘অন্তবিহীন এই’ ও কলাবতী রাগভঙ্গিমায় ‘ঝনন ঝনন বাজে’ গান দু’টি মারফত হিট হয়ে গেলেন। এই শিল্পীর অন্য পুজোর জনপ্রিয় গানের মধ্যে ‘৫৬ সালে ‘আমি চেয়েছি তোমায়’, ’৫৮-তে ‘চামেলি মেলো না আঁখি’, ‘৬০-এ ‘এইটুকু এই জীবনটাতে’। সম্পূর্ণ অন্য এক মাধুর্যভরা কন্ঠের শিল্পী উৎপলা সেন ১৯৫৩ সালের পুজোর গান ‘প্রান্তরের গান আমার’ গেয়ে নিজের আসন প্রতিষ্ঠা করে নিলেন। এর পরও তাঁর পুজোর একাধিক গান জনপ্রিয় হয়, উল্লেখ করা যায় ‘ময়ূরপঙ্খী ভেসে যায়’, ‘এত মেঘ এত যে আলো’। এর আগের বছরই পুজোর গান ‘পাষানের বুকে লিখ না আমার নাম’ সতীনাথ মুখোপাধ্যায়কে প্রাদপ্রদীপের আলোয় নিয়ে আসে। ’৫৯-এর পুজোয় ‘ওই আকাশপ্রদীপ তারা’, ৬০-এ ‘জীবনে আমি যারে চেয়েছি’ ফের হিট করে। দরদী কণ্ঠের তালাদ মামুদ তপন কুমার নাম নিয়ে ১৯৫২-র পুজোর গান ‘আলোতে ছায়াতে দিনগুলি’ ও ‘চাঁদের এত আলো’ হিট হওয়ায় বাংলা গানের দুনিয়ায় আসন পাকা হয়। ১৯৫৮-র পুজোয় শিল্পীর গাওয়া ‘সুন্দরতর তুমি আমার প্রেমে’ ও ‘এল কি নতুন কোনও’ আবার হিট করে।

আরও পড়ুন রবিবারের পড়া: কোথায় হারিয়ে গেল পুজোর গান / ১

১৯৪২-এর পুজোর রেকর্ড ‘চিঠি’ গেয়েই গানের জগতে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিলেন জগন্ময় মিত্র। তাঁর সাড়া জাগানো পুজোর আরেকটি রেকর্ড ১৯৪৮-এ প্রকাশিত ‘সাতটি বছর আগে পরে’। রাগভিত্তিক ও ভক্তিমূলক গানে অভ্যস্ত ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য এক পুজোয় অভিনব ছন্দবিন্যাসে ‘অন্তবিহীন এই’ ও কলাবতী রাগভঙ্গিমায় ‘ঝনন ঝনন বাজে’ গান দু’টি মারফত হিট হয়ে গেলেন। এই শিল্পীর অন্য পুজোর জনপ্রিয় গানের মধ্যে ‘৫৬ সালে ‘আমি চেয়েছি তোমায়’, ’৫৮-তে ‘চামেলি মেলো না আঁখি’, ‘৬০-এ ‘এইটুকু এই জীবনটাতে’। সম্পূর্ণ অন্য এক মাধূর্যভরা কন্ঠের শিল্পী উৎপলা সেন ১৯৫৩ সালের পুজোর গান ‘প্রান্তরের গান আমার’ গেয়ে নিজের আসন প্রতিষ্ঠা করে নিলেন। এর পরও তাঁর পুজোর একাধিক গান জনপ্রিয় হয়, উল্লেখ করা যায় ‘ময়ূরপঙ্খী ভেসে যায়’, ‘এত মেঘ এত যে আলো’।   এর আগের বছরই পুজোর গান ‘পাষানের বুকে লিখনা আমার নাম’ সতীনাথ মুখোপাধ্যায়কে প্রাদপ্রদীপের আলোয় নিয়ে আসে। ’৫৯-এর পুজোয় ‘ওই আকাশপ্রদীপ তারা’, ৬০-এ ‘জীবনে আমি যারে চেয়েছি’ ফের হিট করে।  দরদী কণ্ঠের তালাদ মামুদ তপন কুমার নাম নিয়ে ১৯৫২-র পুজোর গান ‘আলোতে ছায়াতে দিনগুলি’ ও ‘চাঁদের এত আলো’ হিট হওয়ায় বাংলা গানের দুনিয়ায় আসন পাকা হয়। ১৯৫৮-র পুজোয় শিল্পীর গাওয়া ‘সুন্দরতর তুমি আমার প্রেমে’ ও ‘এল কি নতুন কোনও’ আবার হিট করে।

columbia record
কলম্বিয়া রেকর্ডে প্রতিমার গান।

অত্যন্ত গুণী শিল্পী কিন্তু কোনও দাম পাননি। সুরেলা, চর্চিত কণ্ঠে নিজের সুরে গাওয়া অখিলবন্ধু ঘোষের গাওয়া ১৯৬১ সালের পুজোর গান ‘ও দয়াল বিচার করো’, ’৬৩-র পুজোর গান ‘তোমার ভুবনে ফুলের মেলা’ আজও শ্রোতার মনকে দোলায়। আধুনিক ও রবীন্দ্রসঙ্গীতে সমান দক্ষ শিল্পী দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়ের প্রথম জনপ্রিয় পুজোর গান ১৯৫২ সালে গাওয়া ‘শ্যামলবরণী ওগো কন্যা’, এরপর উল্লেখ করা যায় ’৬৩-তে ‘একদিন ফিরে যাব চলে’। এক আশ্চর্য সুরেলা কণ্ঠের অধিকারী প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়। যার গায়কীতে কোনও আরোপিত অভিব্যক্তি নেই, নেই কোনওরকম নাটকীয়তা অথচ কী নিস্পাপ এবং বাগ্ময়। শিল্পীর উল্লেখযোগ্য পুজোর গান ১৯৫৮-তে ‘মেঘলা ভাঙা রোদ উঠেছে’, ’৬৮-তে ‘ আঁধার আমার ভাল লাগে’, ৭৪-এ ‘বড় সাধ জাগে’। সামান্য অনুনাসিক হলেও মাধুর্যেভরা কণ্ঠশিল্পী শ্যামল মিত্র-র পুজোর গান একাধিকবার হিট করে। উল্লেখ করা যায় ১৯৫২-তে ‘স্মৃতি তুমি বেদনা’, ’৫৮-তে ‘চোখের নজর কম হলে’, ’৫৯-এ ‘ভ্রমরা ফুলের বনে’ ও ‘তরীখানি ভাসিয়ে দিলাম’, ’৬৫-তে ‘তুমি চলে যাবার পর’। অনুশীলণঋদ্ধ কণ্ঠের শিল্পী মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায় লোকগীতি দিয়ে শুরু করে নজরুলের গান ও আধুনিক গানেও সমধিক খ্যাতিলাভ করেন। তাঁর বহু জনপ্রিয় গানের মধ্যে সুপার ডুপার হিট পুজোর গান ১৯৫৭-তে গাওয়া ‘আমি এত যে তোমায় ভালবেসেছি’। চল্লিশের দশকে মুম্বাই চলে যান মান্না দে, কিন্তু প্রথম আধুনিক বাংলা গান রেকর্ড করেন ১৯৫৩-র পুজোয় ‘হায় হায় গো’ ও ‘কত দূরে আর নিয়ে যাবে বল’। হেমন্ত-সন্ধ্যা প্রমুখ শিল্পীদের মতো মান্না দেরও সব পুজোর গানই হিট, তার মধ্যে উল্লেখ করতে গেলে তালিকা দীর্ঘতর হয়ে যায়।

শান্ত মিঠে সুরেলা কণ্ঠের অধিকারী পান্নালাল ভট্টাচার্য আধুনিক গান দিয়ে শুরু করে সমর্পিত হয়েছিলেন ভক্তিগীতিতে। পুজোর গানে তাঁর রেকর্ড করা ‘মায়ের পায়ের জবা হয়ে’ (১৯৫৩), ‘আমার সাধ না মিটিল’ (’৫৬), ‘কালো মেয়ের পায়ের তলায়’ (’৬০) আজও সমান জনপ্রিয়। বাংলা আধুনিক গানের পাশাপাশি তখন লোকগীতিকেও জনপ্রিয় করে তুলেছিলেন মুক্ত দেদার নদীর মতো কণ্ঠের শিল্পী নির্মলেন্দু চউধুরী। সেইসময় কেবল আধুনিক গান নয়, পুজো উপলক্ষ্যে প্রকাশিত হত হাস্যকউতুক, প্যারোডি গান ইত্যাদি, সেগুলিও যথেষ্ট জনপ্রিয় হত।

record player of earlier days
কলের গান।

গত শতাব্দীর পাঁচের দশক থেকে পুজোর গানে বাংলা আধুনিক গান রেকর্ড করতে শুরু করলেন মুম্বই জগতের প্রতিষ্ঠিত শিল্পীরা। তাঁদের মধ্যে প্রথমে উল্লেখ করতে হয় গীতা দত্তের নাম। ১৯৫১-র পুজোয় তাঁর গান ‘ওই সুর ভরা দূর নীলিমায়’ ও ১৯৫৩-তে ‘আয় রে আয় রে ছুটে’ দারুণ জনপ্রিয় হয়। একে একে পুজোর গানের রেকর্ড প্রকাশিত হয় লতা মঙ্গেশকর, আশা ভোঁসলে, সুমন কল্যাণপুর, কিশোর কুমার, রাহুল দেব বর্মন, মহঃ রফি, মুকেশ প্রমুখ শিল্পীর। লতা শুরু করেছিলেন ১৯৫৮-তে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সুরে ‘প্রেম একবার এসেছিল’, পরে অধিকাংশ গানই সলিল চৌধুরীর এবং বেশ জনপ্রিয়। উল্লেখযোগ্য ১৯৬৩-তে ‘ওগো আর কিছু তো নেই’, ‘৫৯-এ ‘না যেও না’। ১৯৭৪-এ লতা গাইলেন কিশোরকুমারের সুরে ‘কী লিখি তোমায়’ আর কিশোরকুমার লতার সুরে ‘আমি নেই’ – দু’টি গানই জনপ্রিয় হয়। আশা শুরু করেছিলেন ১৯৫৯-এ মান্না দের সুরে ‘আমায় তুমি যে ভালবেসেছ’ ও ‘আমি খাতার পাতায়’ পরে তাঁর পুজোর হিট গানগুলির সুর আর ডি বর্মনের করা। উল্লেখ করা যায় ’৭৩-এ ‘ফুলে গন্ধ নেই’, ’৭৪-এ ‘মহুয়ায় জমেছে আজ’। ১৯৬৯-এ রাহুল পুজোয় বাংলা গান শুরু করেন, পরবর্তীতে আশার সঙ্গে ডুয়েটও গেয়েছেন। এ ছাড়া জনপ্রিয় হয় ১৯৫৯-তে রফির ‘কথা ছিল’, ১৯৬৮-তে মুকেশের ‘মন মাতাল’, সুমন কল্যাণপুরের ‘বাদলের মাদল বাজে’ ইত্যাদি গান। অনেক বছর পুজোর গানে পাওয়া গিয়েছিল বিশ্বজিৎ, বাসবী নন্দী প্রমুখ চলচ্চিত্র আভিনেতা অভিনেত্রীদেরও।

আজ আর পুজোর গান বলে কিছু নেই। বাংলা নতুন গান নিয়েও নেই কোনো উন্মাদনা। হয়তো গানের সঙ্গে জড়িয়ে আছেন অনেক প্রতিভা, কিন্তু তাঁরা বাংলা গানের সেই আমেজ কিংবা ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার যোগ্যতা রাখেন কি?

গেল শতকের পাঁচের দশক ও ছয়ের দশকেও বহু শিল্পীর একটি-দু’টি গান সুপার ডুপার হিট করেছে। উল্লেখ করা যায়, ১৯৫৮-তে আলপনা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘ছোট্ট পাখি চন্দনা’, একই বছর গায়ত্রী বসু ‘আমার সন্ধ্যাপ্রদীপ’, ১৯৬৫-তে মৃণাল চক্রবর্তীর ‘কেন জানি না যে’, একই বছর শৈলেন মুখোপাধ্যায়ের ‘ঝর্ণা সুন্দরী ঝর্ণা’, ইলা বসুর ‘সে যে একটি দিনের চেনা’, ১৯৬৭-তে মাধুরী চট্টোপাধ্যায়ের ‘ওই যে সুদূর বনবীথিকায়’, ’৬৭-তে সুবীর সেনের ‘সারাদিন তোমায় ভেবে’, ৬৮-তে চলো না দিঘার সৈকত’, ’৭৪-এ নির্মলা মিশ্রের ‘কাগজের ফুল বলে’ প্রভৃতি গান।

কেবল ছয়ের বা সাতের দশকই নয় আশির দশকেও পুজোর গান ঘিরে উৎসাহ-উত্তেজনা ছিল যথেষ্টই, কিন্তু তার পর? গ্রামোফোন রেকর্ড থেকে ক্যাসেট, তার পর কম্প্যাক্ট ডিস্ক, অবশেষে আইপড, পেন ড্রাইভ – প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে গান শোনার পদ্ধতি বদলাল, প্রযুক্তির কল্যাণে উন্নত হল রেকর্ডিং কিন্তু বাংলা গানের জনপ্রিয়তা শেষমেশ কোথায় গিয়ে দাঁড়াল? গত তিরিশ বছরের বাংলা গানের চর্চায় একমাত্র সুমনের গান ছাড়া আর কারও কোনো গান কি কোনো ভাবে মনে রেখাপাত করেছে? আগামী দিনে এই সময়ের বাংলা গান প্রসঙ্গে সুমনের গান ছাড়া কি আর কোনো গানের কথা কোনো ভাবে উল্লেখ করা যাবে? তাই আজ আর পুজোর গান বলে কিছু নেই। বাংলা নতুন গান নিয়েও নেই কোনো উন্মাদনা। হয়তো গানের সঙ্গে জড়িয়ে আছেন অনেক প্রতিভা, কিন্তু তাঁরা বাংলা গানের সেই আমেজ কিংবা ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার যোগ্যতা রাখেন কি? (শেষ)

ঋণস্বীকারঃ শারদ অর্ঘ্য- এইচ এম ভি, বিভিন্ন রেকর্ড কোম্পানির ক্যাটালগ, স্বপন সোম, অতনু চক্রবর্তী প্রমুখ।

 

 

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here