imprisoned in detention camp

অরূপ চক্রবর্তী

এত দিনে আপনারা চন্দ্রধর দাসের কাহিনি জেনে ফেলেছেন। ১০২ বছরের চন্দ্রধর দাস। ‘ডি’ ভোটার তথা ‘ডাউটফুল’ ভোটারের  তকমা সেঁটে দিয়ে তাঁকে ‘বিদেশি’ ঘোষণা করে দেওয়া হয়েছিল। অথচ ১৯৬৬ সালের নাগরিকত্বের কার্ড ছিল তাঁর কাছে। ‘৬৬ সালের ভোটার তালিকায়ও নাম ছিল তাঁর। কিন্তু তার পরেও ‘রাষ্ট্রের কল্যাণে’ তিনি ‘বিদেশি’ ঘোষিত হন।  ভোটার কার্ড থাকলেও, ১৯৯৭ সাল থেকে ভোট দিতে পারেননি তিনি। কারণ, বয়সের ভার আর শারীরিক অসুস্থতা। আর এই ভোট দিতে না পারাটাই কাল হল। তাঁর গায়ে লেগে গেল ‘ডি’ ভোটারের তকমা। যা-ই হোক, অনেক দৌড়ঝাঁপ, অনেক লড়াইয়ের পর ২০১৪ সালে ভোটার তালিকায় নাম তুলতে সক্ষম হন তিনি। কিন্তু বিধি বাম। ভোটার তালিকায় ফের নাম উঠলেও, চার বছর আগে আর একটা কাণ্ড ঘটিয়ে রেখেছিল সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। ২০১০ সালে চন্দ্রধরবাবুর ‘ডি’ ভোটার মামলাটি ফরেনার্স কেস হিসেবে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল অসমের কাছাড় জেলার ধলাই বর্ডার পুলিশ ব্রাঞ্চে। দীর্ঘ ছ’বছর ধরে সেখানে মামলাটি ঝুলে থাকার পরে ২০১৬ সালে মামলাটি পাঠানো হয় ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালে। যথারীতি, ‘বিদেশি’ হওয়ার নোটিশ পাঠানো হয় চন্দ্রধরবাবুকে। ভারতীয় নাগরিক হওয়ার কাগজপত্র তিনি আদালতকে দিতে পারেননি। গত বছর মোট চার বার আদালত তাঁকে তাঁর ভারতীয় হওয়ার প্রমাণ দাখিল করতে বলে কিন্তু তিনি ব্যর্থ হন। অগত্যা যেটা আশঙ্কা করা হয়েছিল, সেটাই হল। এ বছর, ৩১ মার্চ, তাঁকে ডিটেনশন ক্যাম্পে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। অবশেষে বহু জনের প্রচেষ্টায় ডিটেনশন ক্যাম্প থেকে মুক্তি পেয়েছেন ওই বৃদ্ধ।

কিন্তু সকলের ভাগ্য তো চন্দ্রধরবাবুর মতো নয়। এই তো, কয়েক দিন আগে গোপাল দাস নামক এক ভারতীয় নাগরিকের মাথায়ও ‘ডি’ ভোটারের তকমা লাগিয়ে দেওয়া হয়। তিনি মামলার খরচ বহন না করতে পেরে আত্মহত্যা করেন।

এই ঘটনাগুলি থেকে প্রমাণ হয়, হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে অসমে বাঙালিদের ওপরে ‘ডি’ ভোটারের তকমা লাগিয়ে দেওয়ার যেন একটা প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। আর তাদের মধ্যে অনেককেই পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে ডিটেনশন ক্যাম্পে। পদে পদে লঙ্ঘিত হচ্ছে মানবাধিকার। অসমের বিপন্ন ভাষিক সংখ্যালঘুদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য সর্বভারতীয় পর্যায়ে আসাম সংহতি মঞ্চ গঠিত হয়েছে। সম্প্রতি কলকাতায় এক সভা করে ওই মঞ্চ গঠন করা হয়েছে। মঞ্চ জানিয়েছে, অসমে অনসমিয়া, বিশেষ করে বাংলাভাষীদের ওপর জাতীয় নাগরিকপঞ্জী বা এনআরসির-র নামে যে ভয়াবহ অমানবিক আচরণ ও ধারাবাহিক নির্যাতন চলছে, সে বিষয়ে সঠিক তথ্য তুলে ধরতে তারা ভারতের সব নাগরিকের কাছে যাবে। ‘ডি’ ভোটার ও ডিটেনশন ক্যাম্পের নামে যে ভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক স্তরে মঞ্চ তার প্রতিবাদ জানানো হবে। মঞ্চ বলেছে, অসমে আজ যা হচ্ছে তা যদি ভারতের শান্তিকামী মানুষ প্রতিরোধ করতে না পারেন তা হলে আগামী কাল সেই তাণ্ডব রাজ্যে রাজ্যে শুরু হবে। আর এর ফলে আক্রান্ত হবে দেশের জাতীয় সংহতি। তাই দেশের স্বার্থে, দেশের মানুষের বৃহত্তর অস্তিত্বের স্বার্থে প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তোলার ডাক দিয়েছে ওই মঞ্চ।

movement against torture on hindu bengalees in assam

অসমে প্রায় ১ লক্ষ ৪২ হাজার ‘ডি’ ভোটার অর্থাৎ সন্দেহভাজন নাগরিক আছেন। এঁদের মধ্যে ৯৮৬ জন ডিটেনশন ক্যাম্পে বন্দি। রাজ্যের ৬টি ডিটেনশন ক্যাম্পে বন্দিজীবন যাপন করা অভিযুক্তদের মধ্যে সিংহভাগই বাঙালি। সে হিন্দুই হোক বা মুসলিম। উল্লেখ্য, যে সময়ে জাতীয় নাগরিকপঞ্জী (এনআরসি) নবায়নের কাজ অসমে চলছে, তখনই ‘ডি’ ভোটারদের নিয়ে শঙ্কার সৃষ্টি হয়েছে বিভিন্ন মহলে। কেননা সুপ্রিম কোর্ট ও গুয়াহাটি হাইকোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী এনআরসি-তে ‘ডি’ ভোটার বা এঁদের পরিবারের সদস্যদের নাম অন্তর্ভুক্ত হবে না। এ ছাড়া, রাজ্যে বিদেশি শনাক্তকরণ ট্রাইবুন্যাল ও আদালতগুলিতে বিচারাধীন অবস্থায় থাকা ব্যক্তিদের নামও এনআরসি-তে থাকবে না। তাদের নাম ‘হোল্ড’ করে রাখা হবে।

১৯৯৭ সাল থেকে ‘ডি’ ভোটারের তকমা সেঁটে দিয়ে এ রাজ্যের হিন্দু-মুসলিম বাঙালি নাগরিকদের ভোটাধিকারের মতো মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করে রাখা হয়েছে। এমনকি কংগ্রেস ও বিজেপি, দুই দলই বিষয়টিকে রাজনৈতিক ইস্যু হিসাবে বেছে নিয়ে বিভিন্ন সময়ে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিও দিয়ে গিয়েছে। শুধু তা-ই নয়, অসমে হিন্দু বাঙালির ভোট টানতে ডিটেনশন ক্যাম্প ১০০ দিনের মধ্যে গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে বলে ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন সে সময়ের প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী নরেন্দ্র মোদী। ২০১৪ সালের নির্বাচনে পালা বদল হল। কিন্তু অসমে বাঙালিদের ভাগ্য বদলাল না। তার পর ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেসকে হটিয়ে বিজেপি এল ক্ষমতায়। মুখ্যমন্ত্রী হলেন সর্বানন্দ সনোয়াল। কিন্তু আগেকার কংগ্রেস ও অগপ সরকারের তুলনায় পদ্মফুলের আমলে অসমে বেশি নির্যাতন  করে শুরু হল। ‘ডি’ ভোটারের তকমা দিয়ে রাজ্য পুলিশের সীমান্ত শাখা বাঙালিদের নানা ভাবে হয়রানি শুরু করল। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তরুণ গগৈ অবশ্য বারবার দাবি করেছেন, ‘ডি’ ভোটারদের মধ্যে অধিকাংশই ভারতীয়। কিন্তু মজার কথা হল, তাঁর আমলেও এই সমস্যা সমাধানে কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি। এমনকি প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্ল কুমার মহন্তও তাঁর আমলে কিছু করেননি। বর্তমান বিজেপি শাসনে পরিস্থিতি আর ভয়াবহ হয়েছে। এই পরিস্থিতি এখন এতটাই ভয়াবহ আকার নিয়েছে যে, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের মনোনীত বিশেষ পর্যবেক্ষক হর্ষ মান্দার কমিশন থেকে পদত্যাগ করেছেন। কোকরাঝাড় ও গোয়ালপাড়া ডিটেনশন ক্যাম্প পরিদর্শন করে তিনি সেই ভয়াবহ পরিস্থিতির কথাই তুলে ধরেন। তিনি অভিযোগ করেন, মাত্র ৫০০ বর্গমিটার মাপের ঘরে গাদাগাদি করে একগাদা বন্দিকে রেখে দেওয়া হয়েছে। তাঁদের দু’ বেলা খাওয়ার জন্য মাথাপিছু বরাদ্দ মাত্র ৪০ টাকা। বাইরে বেরোনোর কোনো অধিকার তাঁদের নেই। কিন্তু এঁরা কোনো অপরাধী নন। কোনো ফৌজদারি অভিযোগ নেই এঁদের বিরুদ্ধে। এঁদের একটাই অপরাধ, রাষ্ট্রের চোখে এঁরা ‘বিদেশি’।

রাজ্য সরকারের দেওয়া তথ্য থেকে জানা গিয়েছে, বর্তমানে রাজ্যে ৯৮৬ জন বিভিন্ন ডিটেনশন ক্যাম্পে বন্দি রয়েছেন। কিন্তু এই ডিটেনশন ক্যাম্পটা কী? আদতে ডিটেনশন ক্যাম্প বলে আলাদা কিছুই নেই। রাজ্যের জেলখানাগুলিতে নির্দিষ্ট দু’-একটি ঘরে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বন্দিদের রাখা হয়েছে। যাঁরা কোনো অপরাধ করেননি, বাংলাদেশের সঙ্গে প্রত্যর্পণ চুক্তিও নেই, সুতরাং তাঁদের ফিরে যাওয়ার পথও বন্ধ। অনেকেই আছেন যাঁরা গত সাত-আট বছর ধরে বিনা বিচারে বন্দি। জানা গিয়েছে, তেজপুর সেন্ট্রাল জেলে ৮৩ জন মহিলা-সহ ৩১৩ জন, শিলচর জেলে ১০ জন মহিলা-সহ ১০৯ জন, ডিব্রুগড় জেলে ৫৬ জন পুরুষ, যোরহাট সেন্ট্রাল জেলে ৩৭ জন মহিলা-সহ ১২২ জন, কোকরাঝাড় সেন্ট্রাল জেলে ১৫২ জন মহিলা এবং গোয়ালপাড়া ডিসট্রিক্ট জেলে ২৩৪ জন পুরুষ বন্দিজীবন কাটাচ্ছেন। তবে এ তথ্য ২০১৮ সালের ১৫ মে পর্যন্ত। এর পর বন্দির সংখ্যা যে আর বেড়েছে তাতে সন্দেহ নেই।  তবে ডিটেনশন ক্যাম্পের অবস্থার থেকেও ভয়ানক অবস্থা ট্রাইব্যুনালগুলির। এমতাবস্থায় অসমে বাঙালিরা কেমন রয়েছেন তা সহজেই অনুমেয়।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here