horse driven cart in 19th century kolkata

সিদ্ধার্থ বসু

এই ছক্কর-গাড়ি বা রবীন্দ্রনাথের স্যাকরা গাড়ি অবশেষে প্রতুলচন্দ্র গুপ্তের ‘দিনগুলি মোর’ স্মৃতিকথায় ছ্যাকড়াগাড়িতে পরিণত হল। সে কালের কলকাতার থিয়েটারের দর্শকদের মধ্যে ‘মেয়েরা বেশিরভাগই ছ্যাকড়াগাড়ি করে আসতেন।’ ছ্যাকড়াগাড়ির সঙ্গে এক বা একাধিক অভিভাবকও দাঁড়িয়ে থাকতেন। ‘স্যাকরা গাড়ি’ ‘দোলদার ছক্করগাড়ি’ ও প্রতুলচন্দ্র গুপ্তের লেখায় ‘ছ্যাকড়াঘাড়ির’ পর অবশেষে ক্ষিতীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সে কালের কলকাতায় ‘ঠিকা গাড়ি’র সন্ধান পাওয়া যায়। তিনি জানাচ্ছেন, ‘সেকালের ঠিকা গাড়ির কথাও বড়ই আমোদজনক।’ ‘আমাদের জোড়াসাঁকো অঞ্চলে ঠিকাগাড়ির অনেরগুলি আড্ডা ছিল। সেই সকল আড্ডার অধিকারী ছিল অধিকাংশস্থলেই এক একজন হিন্দুস্থানী।’

আরও পড়ুন রবিবারের পড়া : বাংলা সাহিত্যে ছক্কর গাড়ি / দ্বিতীয় পর্ব

সে কালের ধর্মতলা অঞ্চলে এই ঠিকাগাড়ি যাত্রী ধরার জন্য ঠিকাগাড়ির মালিকদের পাহারাওয়ালা পুলিশকে যেমন পয়সা দিতে হত তেমনই কোচবাক্সেও গাড়ির ছাদে নির্দিষ্ট সংখ্যা অপেক্ষা বেশি আরোহী ওঠাতে ঘুষ দিতেও হত। যাত্রী নিয়ে যাওয়ার একটা সুন্দর চিত্র পাওয়া যায় এই লেখায় — “চারজন একমুখের যাত্রী পাইলে গাড়োয়ানেরা খুবই আহ্লাদিত হইত। কিন্তু যদি দেখিল যে, সে সময়ে একমুখের তিনজন যাত্রী ছাড়া চতুর্থ একজন পাওয়া গেল না, তখন গাড়োয়ান বেচারা কি করে— অগত্যা বাধ্য হইয়া গাড়ির এলোমেলো সারির মধ্য হইতে নিজের গাড়িটা কোনরকমে বাহির করিয়া লইয়া পক্ষীরাজ ঘোড়া দুইটিকে পৃষ্ঠে একবার এদিক একবার ওদিক ছিপছিপে চাবুকের দ্বারা উ-উ শব্দ করিতে লাগিল; আবার উহারাই মধ্যে চিৎকার করিতে লাগিল— আর একজন ভবানীপুর।”

যাত্রী ধরার আরেক দৃশ্যের অবতারণা হয় গত মহাযুদ্ধের সময়কার কলকাতায়। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় ‘অনুবর্তন’ উপন্যাসে এর ছবি পাওয়া যায় — “সকাল হইতে না হইতে যদুবাবু ঘোড়া গাড়ি আড্ডায় গাড়ি ভাড়া করিতে গেলেন। হাওড়া স্টেশনে যাইতে কেহ হাঁকিল তিন টাকা, কেহ হাঁকিল সাড়ে তিন টাকা। একজন বলিল, হাওড়া পুল বন্ধ হয়ে গিয়েছে বাবু। কোন গাড়ি যেতে দিচ্ছে না।’

বাংলা সাহিত্যে এই ঘোড়ার গাড়ি নিয়ে একটি হাস্যরসাত্মক চিত্র পাওয়া যায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখায়। তাঁর ‘জীবনস্মৃতি’তে এই ‘স্যাকরা গাড়ি’ অন্য নামে উপস্থিত হয়ে যে গোলমালের সৃষ্টি করেছিল তার বর্ণনা পাই এই লেখায় — “ভারতমাতা সম্বন্ধে কি একটি কবিতা লিখিয়াছিলাম। তাহার কোন একটি ছত্রের প্রান্তে কথাটি ছিল ‘নিকটে’, ঐ শব্দটাকে দূরে পাঠাইবার সামর্থ ছিল না অথচ কোনমতেই তাহার সঙ্গতমিল খুঁজিয়া পাইলাম না। অগত্যা পরে ছত্রে ‘শকটে’ শব্দটা যোজনা করিয়াছিলাম। সে জায়গায় সহজে শকট আসিবার একবারেই রাস্তা ছিল না। কিন্তু মিলের দাবি কোনো কৈফিয়তেই কর্ণপাত করে না; কাজেই বিনা কারণেই সে জায়গায় আমাকে শকট উপস্থিত করিতে হইয়াছিল। গুণদাদার প্রবল হাস্যে, ঘোড়াসুদ্ধ শকট যে দুর্গম পথ দিয়া আসিয়াছিল সেই পথ দিয়াই কোথায় অন্তর্ধান করিল এ পর্যন্ত তার কোনো খোঁজ পাওয়া যায় নাই।”

ঘোড়ার গাড়ির ইতিহাস, অর্থাৎ কী করে এল, কবে এল কলকাতায়, তা সঠিক ভাবে জানা না গেলেও বিনয় ঘোষের অনুবাদ উইলিয়াম হিকির বিবরণে পাওয়া যায়, “চোখে তখন ক্লারেটের রঙ ধরেছে, ফুরফুরে হাওয়া লাগছে গায়ে, আর মনে হচ্ছে যেন দেবদূতের মতন পুষ্পরথে করে স্বর্গের দিকে উড়ে চলেছি।”

horse cart beside horse driven tram in old calcutta
ঘোড়ায় টানা ট্রামের পাশে ঘোড়ার গাড়ি।

এ বিবরণের কাল প্রায় দু’শো বছর অতিক্রান্ত হয়ে গিয়েছে। বাংলা সাহিত্যে এই গাড়ির বিবরণ পাই টেকচাঁদ ঠাকুরের ‘আলালের ঘরের দুলাল’ গ্রন্থে। যেখানে লেখক বর্ণনা করছেন, “বাবুরাম অধোমুখে শীঘ্র এক-খান লকাটে রকম কেরাঞ্চিতে ঠক চাচা প্রভৃতিকে লইয়া উঠিলেন এবং খন্‌খন্ ঝন্‌ঝন্ শব্দে বাহির সিমলের বাছারামবাবু বাটিতে আসিয়া উপস্থিত হইলেন।”’

আরেক স্থানে এই গাড়ির চিত্র পাওয়া যায় অন্য রকম — “সেই ছকড়ায় প্রেমনারায়ণ মজুমদার যাইতেছিলেন — গাড়িখানা বাতাসে দোলে — ঘোড়া দুটা বেটো ঘোড়ার বাবা —  পক্ষিরাজের বংশ — টায়স্ টায়স্ ডয়েস ডয়েস করিয়া চলিতেছে — পটাপট্ পটাপট্ চাবুক পড়িতেছে কিন্তু কোন ক্রমেই চাল বিগড়ায় না।”

আবার কালীপ্রসন্ন সিংহের ‘হুতোম প্যাঁচার নক্সা’য় হুতোমের সাক্ষ্য স্মরণ করুন, ‘কলকাতায় কেরাঞ্চি গাড়ি বেতো রোগীর পক্ষে বড় উপকারক (গ্যালবানিক শকের) কাজ করে।’

এ বিষয়ে ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়ের ‘ডমরু-চরিত’-এ ডমরুধরের উক্তি, “তাহার পর লম্ফ দিয়া একেবারে আমি বরের চারিঘোড়ার গাড়িতে গিয়া উঠিলাম। ঘোর ত্রাসে সন্ন্যাসীর হৃৎকম্প হইল। আমার শরীর হইতে ফট্ করিয়া সে সূক্ষ শরীর বাহির করিল।”

আরও পড়া রবিবারের পড়া: বাংলা সাহিত্যে ছক্কর গাড়ি/ প্রথম পর্ব

উনিশ শতকের বাংলা সাহিত্যে এই ঘোড়ার গাড়ির আনাগোনা ঘটেছিল। কারণ এই দ্রুতগামী যানের ব্যবহার তখন জনজীবনের অঙ্গ ছিল। তাই সাহিত্যেও তার প্রবেশ ঘটেছিল খুব স্বাভাবিক ভাবেই। ঘোড়ার গাড়ির ব্যবহার ছাড়া বোধহয় তখন ঘটনার বর্ণনা অসম্ভব ছিল। এই জন্যেই ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘নববাবুর বিলাস’-এ দেখি, “অপূর্ব অপূর্ব ছকড়া সকলে আরোহন পূর্বক সদর দেয়ানী কোর্ট আপিল প্রভৃতি আদালতে গমন করতেন।”

এ বিষয়ে বলা যায় শুধুমাত্র দফতর ছাড়া অন্য কাজেও এই গাড়ির ব্যবহার হত। অন্তত হুতুম সে কথাই জানায়। “বৈঠকখানা মেকাবি ক্লাবে টাং টাং টাং করে পাঁচটা বাজল। সূর্যের উত্তাপের হ্রাস হয়ে আসতে লাগল। শহরের বাবুরা ফেটিং সেলফ ড্রাইভিং, বগি ও ব্রাউহ্যামে করে অবস্থাগত ফ্রেন্ড, ভদ্রলোক, বা মোসাহেব সঙ্গে নিয়ে বেড়াতে বেরুলেন, কেউ বাগানে চললেন — দুই চারজন সহৃদয় ছাড়া অনেকেরই পেছন মাল ভরা মোদাগাড়ি চল্লো,পাছে লোকে জানতে পারে এই ভয়ে সে গাড়ির সহিস কৌচম্যানকে তকমা নিতে বারণ করে দেচেন — কেউ লোকাপবাদ তৃণজ্ঞান, বেশ্যাবাজী বাহাদুরির কাজ মনে করেন।”

আরেক স্থানে গাড়ির যাত্রী তোলার জন্য যে হাঁকডাক চলত তার বিবরণ পাই ‘হুতোম প্যাঁচার নকশা’তেই। “‘চারআনা’! ‘লালদিকি’! ‘তের জুরী’! ‘এসো গো বাবু ছোট আদালত!’ বলে গাড়োয়ান সৌখীন সুরে চিৎকার কচ্চে, — নবদ্ধাগমনের বৌয়ের মতো দুই এক কুটিওয়ালা গাড়ির ভেতর বসে আচেন — সঙ্গী জুটচে না। দুই একজন গবর্মেন্ট অপিসের ক্যারানী গাড়োয়ানদের সঙ্গে দর কসাকসি কচ্চেন। অনেকে হেঁটেই চলেছেন — গাড়োয়ান হাসি টিটকিরি সঙ্গে ‘তবে ঝাঁকামুটেয় যাও, তোমাদের গাড়ি চড়া কর্ম নয়’।”

বাংলা সাহিত্যে এই রকম ঘোড়ার গাড়ির বিবরণ ছড়িয়ে আছে উনিশ শতকের বহু লেখায়। বাংলা গোয়েন্দা কাহিনিতেও এই ঘোড়ার গাড়ির ছবি পাওয়া যায়। তবে ধীরে ধীরে সেই ঘোড়ার গাড়ির স্থান দখল করে উন্নত যন্ত্রচালিত যান। তাই সমাজজীবন থেকে এই ঘোড়ার গাড়ি হারিয়ে যায়। এক কালে ঘোড়ার গাড়ির দরকার ছিল, সে কাল গিয়েছে। তাই তার প্রয়োজনও ফুরিয়েছে। উনিশ শতকের সেই ‘বাবু’ও নেই, ‘বিবি’ও নেই। বাবুয়ানিও গিয়েছে। সেই সঙ্গে গিয়েছে ঘোড়ার গাড়ির চল। এ প্রসঙ্গে স্মরণীয় ঈশ্বর গুপ্তের লেখাটি —

বড় মানুষ দূরে থাকুক / ভাল ক’রে পেট চলে না / এখন কেমন করে চড়বে গাড়ী / জোটে নাক’ ঘোড়ার দানা।

এখনকার নবীন পাঠকেরা পুরোনো বাংলা সাহিত্যের পাতায় খুঁজে পাবেন এই ‘ঘোড়ার গাড়ি’, ‘স্যাকরা গাড়ি’ বা শিবনাথ শাস্ত্রীর ভাষায় ‘দোলদার ছক্কর গাড়ি’ কিংবা টেকচাঁদ ঠাকুরের (প্যারীচাঁদ মিত্র) ‘ছকরা গাড়ি’কে। (শেষ)

ঋণ স্বীকার—

আলালের ঘরে দুলাল/টেকচাঁদ ঠাকুর

জোড়াসাঁকোর ধারে/অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর/রানীচন্দ

জীবনস্মৃতি/রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

আত্মচরিত/শিবনাথ শাস্ত্রী

ফিরে ফিরে চাই/প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়

দিনগুলির মোর/প্রতুলচন্দ্র গুপ্ত

শ্রেষ্ঠ গল্প/ত্রৈলক্যনাথ মুখোপাধ্যায়

অনুবর্তন বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়

হারিয়ে যাওয়া ঘোড়ার গাড়ি/হিমানীশ গোস্বামী

রবীন্দ্ররচনাবলী/একাদশ খণ্ড              

 

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here