indramitra
papiya mitra
পাপিয়া মিত্র

পানটা মুখে দিয়ে পাশ ফিরতেই আমার সঙ্গে দেখা। বকুলতলার মোড়ে। সকাল বলতে সাড়ে দশটা বা এগারোটা। একটা মিষ্টি আর প্রেসারের ওষুধ খেয়ে হাঁটতে বের হয়েছেন। “আজ তোমার সঙ্গে বাড়ি যাই। কিছুটা তো কথা বলা যাবে।” বড়ো স্নেহ করতেন। জানি না, এ আমার কত জনমের সৌভাগ্য। কথায় কথায় জ্যোতিরিন্দ্রনাথ নন্দীর কথা জিজ্ঞেস করেছিলাম। বললেন, “লেখা খুবই ভালো, কিন্তু ন্যায্য প্রাপ্য তিনি পাননি। তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস ‘বারো ঘর এক উঠোন’। লেখক হিসেবে অত্যন্ত আধুনিক ছিলেন। তিনি তাঁর সমসাময়িকদের থেকে সব সময় আলাদা ছিলেন। আজও তাঁর লেখা পড়লে বোঝা যায় তিনি আর পাঁচজনের থেকে আলাদা। আমার বিবেচনায় ঔপন্যাসিক থেকে গল্পলেখক হিসেবে বেশি আকর্ষক ছিলেন তিনি। রূঢ় বাস্তবকেও তিনি কবিত্বময় করে তুলতে পারতেন।”

আরও পড়ুন রবিবারের পড়া : ইন্দ্রমিত্রকে যেমন দেখেছি / প্রথম পর্ব

ছাত্র অরবিন্দের খেলাধুলো কেমন ছিল? খুব জানতে ইচ্ছে করত। দত্তের মাঠের পাশ দিয়ে গল্প করতে করতে ফিরছি। জিজ্ঞেস করলাম, কখনও ফুটবল খেলেছেন মেসোমশাই?

in his room, july 2017
নিজের ঘরে, জুলাই ২০১৭।

“ও বাবা, তা-ও খেলেছি। তবে গোলকিপার। গোলের ধারে কাছে বল না এলে আমার খেলা ত্রুটিহীন। কিন্তু বল এলে আমি আর গোলপোস্টের ধারে কাছে থাকতাম না। পাশের লাশকাটা ঘরের সিঁড়িতে গিয়ে বসে থাকতাম। নির্বিবাদে গোল হয়ে যেত। সে সময়ে ছাত্রমহলে গোলকিপার হিসেবে আমার বিপুল চাহিদা ছিল। প্রত্যেক দল চাইত আমি বিপক্ষ দলের গোলকিপার থাকি। এই ব্যাপারটা দল বুঝে গেল। ফলে বাদ পড়লাম খেলা থেকে। তবে অন্য প্রমোশন হল। খেলোয়াড়দের জামাপ্যান্ট দেখার দায়িত্ব পেলাম। তাদের জামাপ্যান্ট নিয়ে লাশকাটা ঘরের সিঁড়িতে বসে থাকতাম। আর বৃষ্টি এলে ঢুকে পড়তাম ঘরের মধ্যে। দেখতাম সার দিয়ে শুয়ে আছে লাশ।”

নানা কথার ফাঁকেই বললেন, “শোনো তোমার বাড়ি বিকেলে চা খেতে আসব।” আমি পথপানে চেয়ে মশার কামড় খেয়ে জানলা খুলে বসে। বিকেল পার হয়ে সন্ধে। সন্ধে পার হয়ে রাত সাড়ে ৭টা। আধা অন্ধকারে ওই তো মেশোমশাই আসছেন। বাঁকের মুখে দাঁড়িয়ে এ বার আমার ছেলের নাম ধরে ডাক। কারণ আমার বাড়ির আশপাশে থাকা কুকুর ছানা দিয়েছে। তাদের চিৎকারে আর এক পা এগোতে পারছেন না। দাদুর হাত ধরে নাতি (বুবাই) নিয়ে এল বাড়িতে। ঘরে ঢুকেই বললেন, “একটা ঠিকানা টুকে নাও তো, সম্ভবত এটাই বিনোদিনীর শেষ ঠিকানা।” ডায়েরিটা বের করতে যাচ্ছি, রেগে গেলেন। “লেখার কী আছে? এইটুকু মনে রাখতে পারবে না?” এখন লিখতে বসে ভাবছি, কেন সে দিন স্মৃতিকে বিশ্বাস করেছিলাম। পরে তো লিখে রাখতে পারতাম। বিনোদিনীর শেষ ঠিকানার কথা বারবার বলতেন। খুঁজে বের করার জন্য বড় ব্যাকুল হয়েছিলেন। আসলে ‘সাজঘর’ নতুন করে সাজানোর চেষ্টা করছিলেন।

“ছোটো থেকে থিয়েটার দেখতে খুব ভালো লাগত। মঞ্চে যাঁরা অভিনয় করছেন তাঁদের একটা ব্যক্তিগত জীবন আছে। তাঁদের কথার পাশাপাশি মঞ্চের সাজঘরে কী ভাবে তাঁরা নিজেদের তৈরি করেন, মঞ্চে নামার আগের মুহূর্ত…আমাকে খুব ভাবাত। সেই বিষয়টা খুঁটিয়ে দেখতে জড়িয়ে পড়লাম আরও একটা নতুন কাজে। নাটক দেখব যে অত পয়সা কই? করি তো কেরানির চাকরি। তাই নাটক নিয়ে পড়াশোনা করা আর নাট্যকারদের, কুশীলবদের বাড়ি বাড়ি ঘুরে নোট নেওয়া থেকে আমার ‘সাজঘর’ গড়ে উঠতে লাগল।”

handwriting of indramitra
ইন্দ্রমিত্রের লেখা।

২০০৮-র জুন মাসের কথা। আমার যাওয়ার কথা দুপুরে ইন্দ্রমিত্রের কাছে। আমি একটু আগেই গিয়ে পড়েছি। দেখি লুঙ্গি পরে তেল মেখে কুয়োতলায় তিনি। যৌথ বাড়ির সবাই দুপুরের কাজে ব্যস্ত। আমি ঘরে না বসে বারান্দায় এ-দিক ও-দিক পায়চারি করছি। টুকটাক মেশোমশাইয়ের কথা শুনছি। কুয়ো থেকে জল তুলে স্নান সেরে ঘরের সোফায় বসলেন। বড়দি জ্যোতির্ময়ীদেবী তার আগে টেবিলে কাঁসার থালায় খাবার রেখে গিয়েছেন আর একটি থালা চাপা দিয়ে। অতি সাধারণ মানুষের সবটাই সাধারণ হওয়ার কথা। হাতের চেটোয় ওই ভারী থালা বসিয়ে খেয়ে নিলেন দুপুরের আহার। এ ভাবেই প্রতি দিনের খাওয়া। খুব দ্রুত খেয়ে বসে পড়লেন গল্পে। “জানো, খুব মিস করি ডেকার্স লেনের রমেশের দোকানের খাবার। ন্যাশানাল লাইব্রেরিতে এখন আর ঘন ঘন যাওয়া হয় না। ফেরার সময় সমস্যা বাড়ে। কিছু দিন আগে এসপ্ল্যানেড ইস্টে পুরোনো খবরের কাগজ পড়ার জন্য গিয়েছি, ফেরার পথে একবার ঢুঁ দিলাম রমেশের দোকানে। এক এক দিন জানো বড়ো ফুলকো লুচি খেতে ইচ্ছে করে।”

cover of 'nerikutta'আমার বাড়িতে গেস্ট আসবে তাই নানা রান্নার আয়োজন। দরজাতে বেল পড়ল। খুলতেই দেখি কবি অরবিন্দ গুহ দাঁড়িয়ে। লুঙ্গি-পাঞ্জাবি। পাঞ্জাবির বুকপকেটে নানা কাগজের সঙ্গে একটি কলমের ঠাসাঠাসি সহবাস। পাম-শ্যু খুলে বসলেন চেয়ারে। দু’দিক দিয়ে দু’টি পকেট ঝুলে পড়েছে। মেসোমশাই পকেটে কী আছে? “শুনবে?” ডান পকেটে যা ওষুধ খান সব একটা প্লাস্টিকে আর গ্যাসের লিকুইড ওষুধের শিশি। বাম পকেটে টর্চ, দু’টি রুটি ও আরও টুকিটাকি। রুটি কেন মেসোমশাই পকেটে? “আরে রাতের খাবার। আমি রাতে বিশেষ কিছু খাই না। ওই তো নরম দু’টো রুটি আগে খাব। তার পরে আমূলস্প্রে এক চামচ কি দু’চামচ গুঁড়ো খেয়ে জল খেয়ে নেব। দেখ পেটে গিয়ে ওটা দুধ হয়ে যাবে আর মিষ্টিমুখ করে রাতের খাওয়া সারা হল। কেমন ভাল না?” বলেই একটা মিষ্টি করে হাসি ছড়িয়ে দিলেন।

সে দিন রাতে আর ছাড়লাম না ওঁকে। বললাম, লুচি খেতে চেয়েছিলেন। ছেলে বলল, দাদু তুমি ‘বন্ধুকেবিন’-এ অনেক দিন কাটলেট খাইয়ে লুচি মাংস খাওয়ার কথা বলতে। আজ তোমার ছাড় নেই। এক প্রকার জোর করেই বসানো হল। খেলেন তিনটি লুচি আর মাংস, পরম তৃপ্তিতে। আজ মনে হচ্ছে ভাগ্যিস সে দিন এসেছিলেন। না হলে তাঁর অনেক ইচ্ছে না পূরণ হওয়ার মধ্যে এটাও থেকে যেত, কেউ জানতে পারত না।

অনেক কথা পরে আবার কোনো দিন হবে। ‘বলো শান্তি, বলো শান্তি, দেহ-সাথে সব ক্লান্তি/হয়ে যাক ছাই’ (মৃত্যুর পরে)। (শেষ)

ছবি: লেখক

 

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here