indramitra
papiya mitra
পাপিয়া মিত্র

বছর বাইশ আগের এক সকাল। সকাল বলব না, বরং বলা ভালো বেলা প্রায় সাড়ে এগারোটা। তখন পাড়ার নতুন বাসিন্দা আমরা। তাই অনেকেই দেখেন, আলাপ করেন। ছেলে নিয়ে স্কুল থেকে ফেরার পথে দেখা হল এক বৃদ্ধের সঙ্গে। মুখোমুখি হল, চোখাচুখিও হল। মুখের দিকে তাকিয়ে একটু অবাক হয়ে চোখ নামিয়ে ছেলেহাতে বাড়িমুখো। কী আশ্চর্য! সেলোটেপ দিয়ে চোখের নীচের অংশ টেনে গালে সাঁটা। বৃদ্ধও ঠিক ওই সময় কখনও ফেরেন অথবা উলটো পথে হাঁটেন। পরে বুঝলাম ওই সময় বাড়ি থেকে বের হন।

বেহালা চৌরাস্তার কাছে এক হাইস্কুলে কবি-সম্মেলন হচ্ছে। আমন্ত্রিত কবিরা সবাই উপস্থিত। আমি যখন পৌঁছোলাম দেখি মঞ্চে উপবিষ্ট কবিদের মধ্যে তিনিও আছেন। পরিচয়পর্ব চলছে আর কবিরা উঠে কবিতা পড়ছেন। চেনা মানুষটির কবিতা পড়া হয়ে গিয়েছে, খানিক পরে বুঝলাম। উদ্যোক্তারা ব্যস্ত হলেন ওঁকে অটো্ করে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার জন্য। কবি এগিয়ে এলেন আমার কাছে। “এক পাড়াতেই তো থাকা হয়। আমার সঙ্গে চলো”। আমি অবাক। উদ্যোক্তারা স্বস্তি ফেললেন। ওই সামান্য পথে কোনও কথা নেই। উনি বাড়ি চিনিয়ে নিয়ে চললেন। নেমে গেলেন ধীরেসুস্থে। অটোওলাকে বলে দিলেন, “দিদিকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে তোমার ছুটি”।

বাড়ি এসে আলোচনা। নতুন বাড়ি করে এসেছি, সব কিছু নতুন। তবে কি যা শুনছি সেটা ঠিক? উনিই ইন্দ্রমিত্র? কবি অরবিন্দ গুহ?

গায়ে চাদর, পায়ে মোজা, মাথায় হনুমানটুপি। হন্তদন্ত হয়ে ঢুকে পড়লেন বাড়িতে। সৌভাগ্যবশত সে দিন দরজাটাও খোলা ছিল।

“একবার সঞ্চয়িতার চিত্রা কাব্যগ্রন্থের ‘মৃত্যূর পরে’ কবিতার পাতাটা খোলো তো।”

“বসুন চা খাবেন তো?”

“না, না, সময় নেই বুঝলে, দেখো দেখো। একটু মিলিয়ে নাও তো যে লাইনগুলো বলছি। ‘আজিকে হয়েছে শান্তি, জীবনের ভুলভ্রান্তি/সব গেছে চুকে। রাত্রিদিন ধুকধুক, তরঙ্গিত দুঃখ সুখ/থামিয়াছে বুকে’। যত কিছু ভালোমন্দ, যত কিছু দ্বিধাদ্বন্দ্ব/কিছু আর নাই’।” সময়টা ফেব্রুয়ারির ২, ২০১৪’র সকালবেলা। অরবিন্দ গুহ, ইন্দ্রমিত্র, আমার মেসোমশাই এলেন, দেখলেন, মুখে বলতে বলতে আবার হনহনিয়ে বাড়ির দিকে চলে গেলেন। আমি পিছন পিছন দৌড়ে যাই। কিন্তু ততক্ষণে তিনি নাগালের বাইরে। তাঁর শেষ কাব্যগ্রন্থ ‘প্রস্থানসময় উপস্থিত’! অথচ এই কাব্যগ্রন্থের প্রথম প্রকাশ কলকাতা বইমেলা, জানুয়ারি ২০১৪। প্রকাশ করেছিল কারুকথা। আমার মনে হয় মিতবাক মানুষটি বুঝেছিলেন হয়তো সময় এগিয়ে আসছে, তাই ‘মৃত্যুর পরে’ কবিতাটির জন্য দৌড়ে আসতেন আমার কাছে। মাঝে মধ্যে কন্যা টুম্পাকে (গৌরী) বলতেন, তুই বলে দিবি না, আমাকে মনে করে বলতে দে। বলে শুরু করতেন ‘আজিকে হয়েছে শান্তি, জীবনের ভুলভ্রান্তি, সব গেছে চুকে…’। তিনি হয়তো আরও নতুন কিছুতে হাত দিতে চেয়েছিলেন বা দিয়েছিলেন।

creations of indramitra
ইন্দ্রমিত্রের সৃষ্টি।

নাগালের বাইরে চলে গেলেন ৩ জুন ২০১৮, সকাল সাড়ে এগারোটায়, আমার মেসোমশাই। আর কন্যা গৌরীর কথায়, বাবা অরবিন্দ গুহর বন্ধু আমি। বাবা, তোমার বন্ধু এসেছে। আজ বন্ধুত্বের স্মৃতিযাপন করতে বসা। কী লিখব আর কী লিখব না ভেবে পাচ্ছি না। এত বছরের নানা কথার জাল বোনা হয়েছে কখনও আমার বাড়িতে, কখনও কবির বাড়িতে, কখনও রাস্তার মোড়ে, কখনও বকুলতলার ‘বন্ধু কেবিন’-এ, আবার কখনও বা সারকেলহাট সম্মেলনীর কালীমন্দিরের সিঁড়িতে।

ফিরে যাব একেবারে গোড়ার দিকে, নাকি ২০১৪ সালের মহালয়ার ঠিক আগের দিনের কথায় থাকব, ভেবে পাচ্ছি না। সে দিন তিন বার আমার বাড়ি এসেছিলেন হাতে ছোট্টো রেডিও নিয়ে, মহালয়া শুনবেন বলে। মহালয়া শুনে বেলার দিকে এলেন। “বুঝলে ভালো লাগেনি, তাই পুরোটা শুনলাম না। আসলে আমি কোনও দিন মহালয়া শুনিনি। তাই ভেবেছিলাম এ বছর শুনব।” এই আসাই সম্ভবত শেষ আসা আমার বাড়িতে।

গান-বাজনার কথা উঠলে খুব অবাক হয়ে প্রশ্ন করতেন, “এখন কেউ ভালো গাইছে নাকি? আচ্ছা রেডিওতে শোনা যাবে? আহা সেই পুরোনো দিনের গান শুনতে ইচ্ছে করে। কোথায় শুনব বলো তো?”

হাতে ছোট্টো রেডিওটা দেখিয়ে বললাম, “এটা ক্যারি করা খুব সহজ। আমার ইচ্ছে আপনাকে কিছু দেওয়ার। আমার বাবা থাকলে তো…।”

“না না মেয়ে কিনে দিয়েছে ওই রকম একটা রেডিও। কিন্তু ওটাতে বুঝতে পারছি না।”

পাশ থেকে কর্তা বললেন, “আমি আপনাকে শিখিয়ে দেব।”

“দেবে তুমি, বাঃ বাঃ। তা হলে ওটাকে নিয়ে আসব কাল।” মানে মহালয়ার আগের দিন। কী উৎসাহে ছোটো ছেলের মতো শিখলেন মন দিয়ে।

2 july, 2017, with daughter gauri
২ জুলাই, ২০১৭। মেয়ে গৌরীর সঙ্গে।

পিছিয়ে যাই ক্রমশ। সংসার-স্বামীপুত্র নিয়ে একবারে ল্যাজেগোবরে আমি। কখনওসখনও লেখা। লিখতে বসলে ঘুম পায়। মনে ভাবি আজ লিখেই যাব। ওঁর লেখা নামালাম। ইতিমধ্যে ওঁর লেখা বইপত্র এর থেকে ওর থেকে নিয়ে পড়া শুরু করেছি। চেয়েচিন্তে ‘বিদ্যাসাগর করুণাসাগর’ খানিক পড়া খানিক দেখা। জীবনের অর্ধেক সময় ধরে যে গবেষণার ফসল উনি সমাজকে দিয়ে গিয়েছেন তা কি এত দ্রুত শেষ হয়? আর যা ভালোবেসে পড়া তা তো ছোটো গল্পের মতো শেষ হয়েও শেষ হয় না।

সন্ধে নামছে, বর্ষার আকাশ ঘনঘটা। বাইরে যেন একটা কার ডাক, আমারই নাম ধরে ডাকছে। দরজা খুলে দেখি মেসোমশাই। হ্যাঁ, তত দিনে অরবিন্দবাবু আমাদের বাড়িতে মেসোমশাই হয়ে গিয়েছেন। ছেলের কাছে দাদু। “একটু চা করো তো”, আদেশ না আবদার! সবে জল চাপিয়েছি, অমনি ব্যস্ততা। “আরে চা করতে এত সময় লাগে নাকি? এসো বসো তো।” কিন্তু মেসোমশাই চা? “আচ্ছা নিয়ে এসো।” তারই মধ্যে ভিজে সাপ্টে বৃষ্টি নিয়ে হাজির বাড়ির কর্তা। উফ্‌ রাস্তায় একটা মানুষও নেই। এত তোড়ে বৃষ্টি নেমেছে। “এ হে হে, একবারে চান করেছো যে? চা খাও।”

নিজের চায়ে চুমুক দিয়ে শুরু করলেন, “এটা কি বিশ্বাসযোগ্য? তুমুল বৃষ্টিতে সে দিন উথালপাতাল দামোদর। সেই সময় মাঝিমাল্লাদের একমাত্র পেশাই ছিল নদী পারাপার। আর তারাও নদীর আশেপাশে থাকত, নানা কাজকম্ম সারত। ওই রাতে একটা ছেলে নদীর কাছে এল, ঝাঁপ দিল, সাঁতরাচ্ছে, কারওর চোখে পড়বে না? একজন কেউই কি ছিল না, এটা বিশ্বাসযোগ্য? আমার মনে এ প্রশ্ন যে দিন থেকে জেগেছে, সে দিন থেকে উত্তর খোঁজার জন্য আমি হন্যে হয়ে ঘুরেছি, চষে ফেলেছি দেশের নানা লাইব্রেরি, নানা গবেষণাকেন্দ্র। অবশেষে স্থির সিদ্ধান্তের ফল, বিদ্যাসাগর দামোদর পার হননি।” বলেই উঠে পড়লেন। হনহন করে জলকাদার মধ্যে বেরিয়ে পড়লেন। আমার লেখা পড়ে রইল। ‘করুণাসাগর বিদ্যাসাগর’ নিয়ে বসে পড়লাম। (চলবে) 

ছবি: লেখক

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here