greek and aramaic script
গ্রিক ও আরামাইক লিপি।
nimai duttagupta
নিমাই দত্তগুপ্ত

পৃথিবীতে মানুষের আবির্ভাব লক্ষ লক্ষ বছর আগে হলেও লিপির উদ্ভাবন হয়েছে মাত্র পাঁচ-ছয় হাজার বছর আগে। আবার পূর্ণাঙ্গ আক্ষরিক লিপির উন্নতি সম্প্রতি হয়েছে। লিপির প্রচলন হওয়ার আগে কথোপকথনের ভাষাকে অবলম্বন করে ভাব বিনিময় করা হত। লিপি আবিষ্কার গোটা পৃথিবীকে তোলপাড় করে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের শিক্ষা-সংস্কৃতিতে নতুন মাত্রা প্রদান করেছে। লিপি আবিষ্কারের আগে হাজার হাজার বছর ধরে বিশ্বের সর্বত্র বিভিন্ন মানবগোষ্ঠীর উত্থান-পতন ও বিলোপ হয়েছে এবং তার সঙ্গে বিলোপ হয়েছে বিভিন্ন ভাষার। শুধু কি তা-ই, লিপি না থাকার ফলে মানুষের বিভিন্ন উদ্ভাবন ও আবিষ্কার পরবর্তী প্রজন্ম রক্ষা করে উন্নত করতে পারেনি। লিপির অনুদ্ভাবনে মানবজাতির প্রচেষ্টার বিরাট সাফল্য লুপ্ত হয়েছে। লিপি বাণীর লৈখিক প্রতিফলন। বাণীর বর্ণনা ও ভাব লিপির মধ্যে চিরস্থায়ী হতে পেরেছে। বর্ণমালা ও লিপির পরিবর্তন বহু ধাপে বিভক্ত। তার গোটা ইতিহাস এখনও উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। লিপিবিশারদ ও অনুসন্ধানীরা লিপি নিয়ে গবেষণা ও বিতর্কে সক্রিয়। কোনো কোনো লিপিবিশারদের মতে, ধ্বনি প্রকাশের ক্ষমতা বাদ দিলে চিত্রাঙ্কনও এক ধরনের লিপিবিশেষ। প্রস্তর যুগে গুহাবাসী মানুষ যে সব চিত্র এঁকেছে সেগুলি লিপিরই প্রথম পদক্ষেপ। চিত্র ও লিপি আজও সমাজজীবনের অঙ্গ। শিশুকে এখনও আগে ছবি আঁকতে শেখানো হয়। পরে লিখতে শুরু করে।

বিশ্বের সবগুলি ভাষার বর্ণমালা আজও আবিষ্কার করা সম্ভব হয়নি। হাজার হাজার ভাষা আছে যেগুলির কোনো বর্ণমালা নেই। এমন বহু মানবগোষ্ঠী আছে, যাদের  ভাষার কোনো বর্ণমালা নেই। আমাদের দেশে বহু ভাষাভাষীর বিভিন্ন জাতি ও উপজাতি, জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রায় ৫০০ ভাষা আছে। কিন্তু লিপি আছে মাত্র বিশটি ভাষার। এই সব ভাষার লিপি আবিষ্কার করতে পারলে দেশ কী বৈচিত্র্যময় হত বলুন তো? বর্ণমালার লিপি উদ্ভাবন হওয়ার আগে চিহ্ন দিয়ে বিশ্ব-মহাবিশ্বের ঘটনা আলোচনা হত। চিহ্ন হল বর্ণমালার আদি অক্ষর। আজও বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে চিহ্ন ব্যবহার করা হয়। আসলে চিহ্ন হল অন্তরের বা বাস্তবের বহিঃপ্রকাশ। বর্ণমালার বিতর্কের কথা নতুন নয়, যদিও সেমিটিক বা প্রোটো-সেমিটিক বর্ণমালা থেকে বিভিন্ন ভাষার বর্ণমালার উদ্ভব হয়েছে। প্রোটো-সেমিটিক থেকে বর্ণমালার দু’টি মূল শাখা বিকাশ লাভ করে। একটির নাম উত্তর সেমিটিক শাখা এবং দ্বিতীয় শাখাটির নাম দক্ষিণ সেমিটিক। বর্ণমালা-বিশারদরা সমকাল পর্যন্ত অনুসন্ধান করে বলেছেন, উত্তরের শাখাটি ব্যাপক পদ্ধতিতে বিকাশ লাভ করে যথাক্রমে আরামায়িক, ক্যানানাইট ও গ্রিক বর্ণমালা সৃষ্টি করেছে। আর দক্ষিণের শাখাটি সার্বীয়, সাফাহিটিক ও থামুডেনিক প্রভৃতি কয়েকটি বর্ণমালা উদ্ভব করেছে। আবার উত্তর দক্ষিণের মূল সেমিটিক থেকে বেরিয়ে আরও নানা ভাবে বিস্তার লাভ করেছে। আজ বিশ্বের বহু জাতি-উপজাতির স্বাতন্ত্র্য রক্ষায় ভাষা-লিপি হল অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বিভিন্ন জাতির অভ্যুত্থানে প্রোটো-সেমিটিক বর্ণমালার অগ্রগতি বিশেষ ভূমিকা নিয়েছে।

আরও পড়ুন রবিবারের পড়া : প্রাচীন ভারতে গণিতচর্চা

চিত্রাঙ্কন ও লিপির মধ্যে বিরাজ করে একটি ভাষা। প্রাগৈতিকহাসিক মিশর ও গ্রিসের চিত্রাঙ্কন ও লেখনীর মধ্যে কোনো পার্থক্য করা হত না। লিপিবিশারদদের মধ্যে কেউ কেউ অবশ্য চিত্রাঙ্কনকে লিপি বলে মানতে রাজি নন। তাঁরা বলেন, লিপির মধ্যে যে চিন্তা-স্রোতের ও গতির ইঙ্গিত থাকে চিত্রে তা অনুপস্থিত। বিষয়টি মোটেই এত সরল বিশ্লেষণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। একাধিক চিত্রের নিপুণ সমাবেশের দ্বারা অনেক সময় জটিল বিষয় ও ঘটনার অতি সুন্দর প্রাণবন্ত ও প্রাণোজ্জ্বল প্রকাশ ও ব্যাখ্যা পাওয়া সম্ভব। এই রূপ ভাবব্যঞ্জক চিত্রে গতিও থাকে। এই ধরনের চিত্র লিপির পর্যায়ভুক্ত। বিশেষজ্ঞরা এই ধরনের চিত্রকে ভাবব্যঞ্জক লিপি বা চিত্রলিপি বলে মনে করেন। তাঁদের অভিমত হল, চিত্রলিপি প্রকৃত লিপির প্রাচীনতম প্রতিফলন। বিজ্ঞান ও সাহিত্যে আজও চিত্রলিপির প্রচলন অব্যাহত। তা সত্ত্বেও চিত্রলিপির প্রধান দুর্বলতা এতে ধ্বনি সংযুক্ত হয় না।

evolution of bengali script
বাংলা লিপি বিবর্তনের রূপরেখা। ছবি সৌজন্যে সমকাল।

মানুষের উচ্চারিত বিভিন্ন শব্দ অর্থ প্রকাশ করেই ভাষা হয়েছে। উচ্চারণের অনুকরণে সংকেতকে পর পর সাজিয়ে ভাষার একটি চলতি প্রতিরূপ সৃষ্টি করেছে। ধ্বনি বা চিহ্ন যদি সকলে জানে ও গ্রহণ করে তা হলে তার অর্থ সকলের পক্ষে বোঝা সম্ভব এবং এই সংকেতের সাহায্যে লিপির নাম হয় ধ্বনি-লিপি। ধ্বনি-লিপি দুই প্রকার। প্রথমটিতে রয়েছে শব্দাংশ বা অক্ষরের (SYALLABLE) প্রতীক এবং দ্বিতীয়টিতে থাকে বর্ণ (ALPHABET)। দ্বিতীয়টির প্রয়োগ পদ্ধতিই ধ্বনি-লিপির উন্নততর সর্বশেষ অবস্থা কিউনিক লিপি। চৈনিক বা জাপানি লিপি তার দৃষ্টান্ত। কিন্তু ভাষার জটিলতা বৃদ্ধির ফলে এবং অন্যান্য কারণে, যেমন উচ্চারণের জন্য, ধ্বনির অবনতি অথবা শব্দাংশ ব্যঞ্জন বাহুল্যের জন্য এই পদ্ধতিই ক্রমশ অচল হয়ে পড়ে। অবশ্য সমকালে আধুনিক বর্ণমালার ব্যবহার অনেকাংশে এই অসুবিধা দূর করতে সক্ষম হয়েছে। যেমন একই বর্ণমালার দ্বারা ইংরেজ, ফরাসি, ইতালীয়, জার্মান, পোলিশ, হাঙ্গেরিয়ান প্রভৃতি বিভিন্ন ইউরোপীয় ভাষা বর্তমানে লেখা হয়েছে। এমনকি এই বর্ণমালার সাহায্যে বাংলা, অসমিয়া, ওড়িয়া, হিন্দি প্রভৃতি ভাষা প্রকাশ করা যে অসম্ভব না তা বিশেষজ্ঞরা প্রমাণ করেছেন।

আরও পড়ুন রবিবারের পড়া : চিরায়ত ঐতিহ্য মুর্শিদাবাদ সিল্ক

ভাষার বিকাশ লাভের তথ্য থেকে জানা যায় যে আরামায়িক শাখা থেকে হিব্রু, আরব্য, ভারতীয় এবং আরও বহু শাখা আত্মপ্রকাশ করেছে। পাশাপাশি জানা গেল প্রাথমিক হিব্রু, ফিনিশীয়, পিউনিক প্রভৃতি সেমিটিক বর্ণমালার বিবর্তন ক্যানাইটি শাখা থেকে আত্মপ্রকাশ করেছে। আবার আধুনিক ইউরোপীয় বর্ণমালা জন্ম নিয়েছে গ্রিক বর্ণমালা থেকে। আসলে সামগ্রিক ভাবে প্রোটো-সেমিটিক থেকে আধুনিক বর্ণমালার সবগুলিই তৈরি হয়েছে, কালের ভেদাভেদ থাকলেও রূপান্তরিত হয়ে বিকশিত হয়েছে। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, উত্তর-সেমিটিক বর্ণমালার নাম আধুনিক হিব্রু বর্ণমালায় এখনও অধিকাংশ ক্ষেত্রে সংরক্ষিত। হিব্রু নামগুলি কোনো না কোনো একটি ব্যঞ্জনবর্ণে সমাপ্ত। অপর দিকে গ্রিক নামগুলি শেষ হয় স্বরবর্ণে। হিব্রুভাষায় নামগুলিতে মানবদেহের, বস্তুর অথবা জন্তুর নামগুলিও বটে, যেমন বেথ মানে বাড়ি – ব্যঞ্জনবর্ণে সমাপ্ত। ডালেথ – দরজা, হড্ড্‌ – হাত, আইন – চোখ, পে-মুখ, আলেয়্‌ – মেষ, কোফ্‌- মানুষ ইত্যাদি শব্দ শেষ হয়েছে ব্যঞ্জনবর্ণে। আবার গ্রিকরাই প্রথম বর্ণমালার মধ্যে স্বরবর্ণ সংযোজন করে। সেমিটিক বর্ণমালায় স্বর্ণবর্ণের ব্যবহার না থাকার কোনো সন্তোষজনক ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। কোনো কোনো ভাষা বিশেষজ্ঞ মনে করেন, সেমিটিক উচ্চারণের পার্থক্য বিবেচনা করে নিজেদের সুবিধামতো স্বরবর্ণ ব্যবহার করার জন্য তার প্রয়োগ অনুপস্থিত। ব্যঞ্জন ধ্বনির প্রতীক হওয়ায়  সেমিটিক বর্ণমালাকে বিভিন্ন ভাষাভাষি জাতির পক্ষে গ্রহণ করা সহজ হয়েছিল।  এই হল আদি বর্ণমালার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস। (চলবে)

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here