optical tweezer
অপটিক্যাল টুইজার। ছবি সৌজন্যে দ্য কনভারসেশন।

সন্তোষ সেন

লেজার (LASER) কথাটির সঙ্গে আমরা সবাই অল্পবিস্তর পরিচিত। বাইরে থেকে শক্তি প্রয়োগ করে পরমাণুর ইলেক্ট্রনকে উচ্চতর শক্তি স্তরে পাঠানো হয়। ওখান থেকে ইলেক্ট্রন মুহূর্তের মধ্যে নীচের শক্তি স্তরে ফিরে আসে। এই প্রক্রিয়ায় অতিরিক্ত শক্তি জন্ম দেয় নির্দিষ্ট শক্তির ফোটনকণা আর সঙ্গে সঙ্গে বিকিরিত হয় নির্দিষ্ট দৈঘ্যের আলোকতরঙ্গ। পদার্থ পরিবর্তন করে বিভিন্ন দৈর্ঘ্যের ও বিভিন্ন শক্তির বিকিরণ ঘটানো সম্ভব।

লেজার আবিষ্কৃত হয় ১৯৫৮ সালে। তার পর থেকেই এর ব্যবহার হয়ে আসছে বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় নানান কাজে। বিশেষ করে চোখের লেজার অপারেশন সুবিদিত। যদিও আরও অনেক বৈজ্ঞানিক কাজে ব্যবহার করা হয় লেজার রশ্মি।
একটি কল্পবিজ্ঞানের কাহিনিও গড়ে উঠেছে ট্রাক্টর বিম নামে এক লেজার প্রযুক্তি ব্যবহার করে, যা একটি মহাকাশযানকে নাড়িয়ে দিতে পারে বা তাকে এক জায়গায় নিশ্চল করে রাখতে পারে। এখানেই লুকিয়ে আছে এই লেখার মর্মবস্তু।

আরও পড়ুন রবিবারের পড়া: মহাকাশে চাক্কা জ্যাম

এ বছর, এই ২০১৮ সালে প্রকৃতি বিজ্ঞানের বুনিয়াদি শাখা পদার্থবিদ্যায় নোবেল পুরস্কার ঘোষণা করা হয় লেজারের চমকপ্রদ সরঞ্জাম আবিষ্কারের জন্য। নোবেল পেলেন তিন প্রোথিত যশা বিজ্ঞানী – মার্কিন পদার্থবিদ আর্থার অ্যাশকিন, ফরাসি পদার্থবিদ জেরার্ড ম্যুরো এবং কানাডার পদার্থবিদ ডোনা স্ট্রিকল্যান্ড। প্রায় আট মিলিয়ন তথা ৮০ লক্ষ ডলারের নোবেল পুরস্কার এই তিনজন পদার্থবিদ ভাগাভাগি করে পেলেন।

নতুন করে কী করলেন এই বিজ্ঞানীরা, যার জন্য পেলেন নোবেল পুরস্কার?

ashkin, mourou, strickland
অ্যাশকিন ম্যুরো এবং স্ট্রিকল্যান্ড।

প্রথমত আর্থার অ্যাশকিন অপটিক্যাল টুইজার (optical tweezer) বানালেন, যার মধ্যে সুনিয়ন্ত্রিত ও নির্দিষ্ট শক্তির লেজার বিম পাঠিয়ে অনু, পরমাণু, এমনকি ব্যাক্টেরিয়ার মতো অণুজীবীদেরও নাড়িয়ে দেওয়া যায়। শুধু তা-ই নয়, এই সব ক্ষুদ্র বস্তুকে লেজার বিমের কেন্দ্রের দিকে ঠেলে নিয়ে গিয়ে তাদের গ্রেফতার বা আটকে ফেলা যায় টুইজারের পিনের সাহায্যে। সহজ করে বললে অপটিক্যাল টুইজার হল একটি সন্না বা চিমটের মতো সরঞ্জাম যা সূক্ষ ভাবে তুলে আনে শরীরের লোম বা ছোটো ছোটো বস্তুকে। বিজ্ঞানী অ্যাশকিন এই কাজটি ১৯৮৭ সালেই করে ফেলেছিলেন, কিন্তু তখন তিনি নোবেলের জন্য নির্বাচিত হননি। আর প্রফেসর অ্যাশকিনের টুইজার যন্ত্রটি বানানোর পিছনে প্রধান কারিগর ছিলেন অন্য দুই নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী ম্যুরো আর স্ট্রিকল্যান্ড। তাঁরা সুনিয়ন্ত্রিত ও নির্দিষ্ট তরঙ্গ শক্তির লেজার রশ্মি বানিয়ে ফেলেন।

ডোনা স্ট্রিকল্যান্ড তৃতীয় নোবেলজয়ী মহিলা পদার্থ বিজ্ঞানী। পদার্থ বিজ্ঞানে প্রথম মহিলা – মাদাম কুরি, তেজস্ক্রিয় বিকিরণে অভূতপূর্ব সাফল্যের জন্য। দ্বিতীয় নোবেলজয়ী মহিলা বিজ্ঞানী মারিয়া গোয়েপার্ট মায়ার, ১৯৬৩ সালে। তার পর ৫৫ বছর পর পদার্থবিদ্যায় নোবেল পেলেন ডোনা। আর তিনি নোবেল পেলেন এমন এক সময়ে, যার কয়েক দিন আগেই সার্ন-এর (CERN) বরিষ্ঠ বিজ্ঞানী আলেসান্দ্রো স্ত্রুমিয়া মহিলা বিজ্ঞানীদের সম্পর্কে কুরুচিপূর্ণ ও অবমাননাকর মন্তব্য করার জন্য সাসপেন্ড হন। স্যার স্ত্রুমিয়া, আপনার গালে সপাটে চড় মেরেছেন স্ট্রিকল্যান্ড তাঁর অসাধারণ অবদানের জন্য নোবেল পুরস্কার জিতে নিয়ে। আশা করি, বিজ্ঞানের জগতে লিঙ্গবৈষম্য এ বার থেকে ইতিহাসের পাতায় স্থান নেবে।

লেজার যন্ত্র বানানোর জন্য তিন পদার্থবিদকে নোবেল পুরস্কার প্রদান অত্যন্ত সঠিক সিদ্ধান্ত। এই আবিষ্কারের ফলে বিজ্ঞান-প্রযুক্তির নব নব দিগন্ত উন্মোচিত হল। এই আবিষ্কার বিজ্ঞান এবং মানব প্রজাতি তথা সমাজের সার্বিক বিকাশে অগ্রগণ্য ভূমিকা পালন করবে।

আরও পড়ুন বিশ্ব উষ্ণায়ণ কমাতে পারে সানস্ত্রিন স্প্রে: গবেষণা

এই প্রসঙ্গে বন্ধুদের জিজ্ঞেস করব – ক’ জন ভারতীয় বিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন? হাতে গোনা চার জন দিকপাল। সর্বপ্রথম সি ভি রমন, তার পর দু’ জন ভারতীয় বংশোদ্ভূত আমেরিকান, সুব্রহ্মণ্যম চন্দ্রশেখর ও হরগোবিন্দ খুরানা। সর্বশেষ ভারতীয় বংশোদ্ভূত বেঙ্কটরমন রামকৃষ্ণন আমেরিকা ও ব্রিটেনের হয়ে রসায়নে নোবেল পুরস্কার পান ২০০৯ সালে।

আমাদের প্রাচীন বিজ্ঞান তার ঐতিহ্য, বিশ্ববিখ্যাত সি ভি রমন, শ্রীনিবাস রামানুজন, ডক্টর মেঘনাদ সাহা, আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়, স্যার জগদীশচন্দ্র বসু, ডক্টর সত্যেন বোসের কথা, বিজ্ঞান ও সামাজিক ক্ষেত্রে ওঁদের অসামান্য অবদান ভুলে মেরে আমাদের রাষ্ট্রনায়করা বিজ্ঞানের সব চুড়ান্ত আবিষ্কার বেদ, রামায়ণ, মহাভারতে হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছেন। আমরা কি পিছনের দিকে এগোতে এগোতে গরুর গাড়ির যুগে ফিরে যাব নাকি বিজ্ঞান-প্রযুক্তির অভাবনীয় সব অবদান কাজে লাগিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাব, এই প্রশ্ন রেখেই এ বারের পর্ব শেষ করলাম।

(লেখক সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজিয়েট স্কুলের সিনিয়র ফিজিক্স টিচার)

 

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here