আটলা গ্রামে বামাখ্যাপার আদি ভিটে।
সুদীপ কুমার পাল

শ্রাবণ মাস শিবের মাস, শিবভক্তদের মাস। আবার এই শ্রাবণেই অমৃতলোকে গমন করেছিলেন সাধক বামাখ্যাপা। আজ তাঁকে স্মরণ করি।

১২৪৪ বঙ্গাব্দের ১২ ফাল্গুন রাত ৩টে ৫১ মিনিটে তারাপীঠের কাছেই আটলা গ্রামে বামাখ্যাপা জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা সর্বানন্দ চট্টোপাধ্যায় ও মা রাজকুমারী দেবী। সর্বানন্দ ও রাজকুমারীর প্রথম সন্তান কন্যা, নাম জয়কালী। দ্বিতীয় সন্তান ছিল বামা। বামার পরে আরও তিনটি কন্যাসন্তান ও একটি পুত্রসন্তান ছিল তাঁদের।

বামা জীবনের প্রথম যে শব্দটি উচ্চারণ করেছিলেন সেটি হল ‘বামা’। তাই তাঁর নাম রাখা হয়েছিল বামাচরণ। ছোটো থেকেই ঈশ্বরের প্রতি অগাধ ভক্তি ছিল জয়কালী ও বামার। জয়কালী পরে বিধবা হয়ে যান ও সন্ন্যাস নেন। তিনি একজন সিদ্ধ সাধিকা হয়ে উঠেছিলেন। এর পর যৌবন বয়সেই তিনি মারা যান।

বামা ছোটো থেকেই বাবার সঙ্গে বিভিন্ন মন্দিরে যেতেন। তারাপীঠ মন্দিরেও আসতেন। বোকা-বোকা ছেলেটি গাছে উঠে ফল, ফুল পেড়ে তারামায়ের উদ্দেশে’ নে মা, নে’ বলে ছুড়ে দিতেন। তাঁর মনে হত, প্রতিবেশীদের গৃহের ঠাকুরগুলি বড়ো অযত্নে রয়েছে। তাই রাতের বেলা সেগুলি চুরি করে এনে পুজো করে কখনও ফিরিয়ে দিয়ে আসতেন, কখনও বা চিলে নদীর জলে ডুবিয়ে রাখতেন। এই কথা যখন জানাজানি হতেই তাঁকে ‘ঠাকুরচোর’ আখ্যা দেওয়া হয়।

মাঠে গরু চরাতে চরাতে বা খেলতে খেলতে বামা মাঝে মাঝেই দ্বারকা নদী সাঁতরে পার হয়ে তারাপীঠ মন্দিরে চলে আসতেন।

ছয় ছেলেমেয়েকে নিয়ে সর্বানন্দের অভাবের সংসার। তবুও বামাকে পাঠশালায় ভর্তি করা হল।  এ দিকে সংসার চালানো মুশকিল হয়ে পড়েছে।  তাই বামা ও তাঁর ভাই রামচন্দ্রকে সর্বানন্দ রামায়ণ-মহাভারত কণ্ঠস্থ করালেন। কীর্তন ও ভক্তিগীতি শেখালেন। তার পর দুই সন্তানকে বিভিন্ন গ্রামে চলে যেতেন, তাঁদের নিয়ে সেই সব পরিবেশন করে কিছু বাড়তি রোজগার শুরু করলেন। তারাপীঠ মন্দিরে একদিন সংগীত পরিবেশন করার সময়ে বামা সমাধিস্থ হয়ে পড়েন। সেই প্রথম সমাধিস্থ হওয়া।

১২৬২ সালে বামার পিতৃবিয়োগ হয়। বামার বয়স তখন ১৮ বছর। মলুটিতে জমিদার বাড়িতে কাজে লাগলেন বামা। থাকা-খাওয়া এবং মাসিক দু’ টাকা বেতন। সেখানে বামার পুজো পছন্দ না হওয়ায় প্রধান পুরোহিত তাঁকে রান্নার কাজে লাগান। সে কাজে অকৃতকার্য হওয়ায় তাঁকে ফুল তোলার কাজে নিয়োগ করা হয়। বামা নিজের মধ্যে বিভোর হয়ে থাকেন। তাই ফুল তোলার কাজও ঠিকমতো হয় না। শেষে জমিদারমশাই নির্দেশ দিলেন, বামাকে যেন কোনো কাজের দায়িত্ব না দেওয়া হয়। সে এমনিই ওখানে থাকবে নিজের মতো করে।

মলুটির মৌলীক্ষা দেবীকে (মৌলী অর্থ মস্তক, ঈক্ষা মানে দেখতে পাওয়া) বামা বলতেন বড় মা। এটাই বামার প্রথম সাধনভূমি। পরে বামা অনেক সাধককেই বলেছেন, “আগে মলুটির বড় মায়ের কাছে যা, তাঁর কৃপা লাভ কর, তবে তারামায়ের চরণে জায়গা পাবি।”

বামাখ্যাপা

কিছু দিন মলুটিতে থাকার পর বামা সব ছেড়ে চলে আসেন তারাপীঠে তারামায়ের কাছে। কিন্তু তাঁর মা রাজকুমারী দেবী বামা ও তাঁর ভাইকে এ বার মামারবাড়ি পাঠান। সেখানে তাঁদের উপর চলে অকথ্য অত্যাচার। অত্যাচারের কথা জানতে পেরে রাজকুমারী দেবী তাঁদের আবার ফিরিয়ে আনেন।

এর পর বামা তারাপীঠের ব্রজবাসী কৈলাসপতির চোখে পড়েন। কৈলাসপতি ধীরে ধীরে তাঁকে মাতৃতত্ত্ব, শিবতত্ত্বে হাতেখড়ি দেন। একদিন বামা স্বপ্ন দেখলেন, মা তারা তাঁকে তারাপীঠে ডাকছেন। সেখানেই থাকতে বলছেন। তার পর থেকে বামার তারাপীঠে যাওয়া আরও বেড়ে গেল। ধীরে ধীরে আটলা গ্রামে থাকা কমে গেল বামার। তারাপীঠেই বেশি থাকতেন। নানান ঘটনার পরে অবশেষে বামা ১২৬৪ সালে তাঁদের কুলগুরুর কাছে দীক্ষা নেন এবং গেরুয়া পোশাক পরে সন্ন্যাস নেন।

এর পরে তাঁর জীবনে নানা লৌকিক-অলৌকিক ঘটনা আছে। সে সম্পর্কে অনেক বই পত্রও আছে। সে দিকে আর যাচ্ছি না।

যে সব বিখ্যাত ব্যাক্তি বামার সাহচর্যে এসেছেন তাঁদের মধ্যে একজন ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পিতৃদেব দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর। ১২৭৯ বঙ্গাব্দে তিনি বাম দর্শনে তারাপীঠ আসেন। বামা তাঁকে বলেছিলেন, “রায়পুরে সিংহবাড়ি যাওয়ার পথে আপনি একটা বিশাল ডাঙা দেখতে পাবেন। সেখানে একটি বিশাল ছাতিমগাছ আছে। ওই ছাতিমগাছের তলায় কিছুক্ষণ বসে ধ্যান করবেন। তা হলে আপনি অপার শান্তি পাবেন”।

বামদেবের কথা শুনে দেবেন্দ্রনাথ ওই ছাতিমগাছের তলায় বসে কিছুক্ষণ ধ্যান করেছিলেন এবং সত্যিই তিনি এক অপার, অনাবিল শান্তি পেয়েছিলেন। পরে ওই স্থান লিজ নিয়ে তিনি ১৮৭২ সালে একটি আশ্রম তৈরি করেন এবং ওই জায়গার নাম দেন শান্তিনিকেতন।

১২৮৯ বঙ্গাব্দে মাত্র ১৯ বছর বয়েসে বিএ পাঠরত নরেন্দ্রনাথ দত্ত (পরে স্বামী বিবেকানন্দ) সহপাঠী শরৎচন্দ্র চক্রবর্তীকে নিয়ে বামাদর্শনে আসেন। নরেনকে আশীর্বাদ করার সময় বামা দীর্ঘক্ষণ মুগ্ধ নয়নে তাঁর দিকে চেয়েছিলেন। পরে শরৎচন্দ্র এর কারণ জিজ্ঞাসা করায় বামা বলেছিলেন, ভবিষ্যতে এই যুবক হিন্দুধর্মের অনেক উন্নতি করবে। বাম দেবের এই কথা যে কতটা সঠিক সে তো আমরা সবাই জানি। এ ছাড়াও বামদেবের সান্নিধ্যে এসেছিলেন সাধক তারাখ্যাপা, কাশ্মীরের মহারাজা প্রমুখ ব্যাক্তিবর্গ।

১৩১৮ বঙ্গাব্দের ২রা শ্রাবণ মহান মাতৃ সাধক বামাক্ষ্যাপা অমৃতলোকে গমন করেন।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য দিন !
আপনার নাম লিখুন