lijjat papad
মহিলাদের উদ্যোগ লিজ্জত পাঁপড়। ছবি সৌজন্যে ফ্রি প্রেস জার্নাল।

সাহানা চক্রবর্তী

৯০-এর দশক!

তখনও ঘরে ঘরে রঙিন টিভি আসেনি। দূরদর্শনের জমানা। সপ্তাহান্তে একটি বাংলা ছবি আর একটি হিন্দি ছবিতেই অভ্যস্ত দর্শক। আর শনি-রবিবার দুপুরবেলায় কিছু আঞ্চলিক ছবি। মেগা সিরিয়ালের রমরমা তখনও শুরু হয়নি। দিনে এক বার বাংলা, উর্দু ও হিন্দি সংবাদ, চিচিংফাঁক, হরেকরকমবা, বুধবার চিত্রহার, বৃহস্পতিবারের চিত্রমালা আর রোববার সকালের রঙ্গোলি-তেই খুশি বাঙালি ও অবাঙালি দর্শকবৃন্দ। তার আগেই যাত্রা শুরু হয়ে গিয়েছে রেডিও আর টিভি বিজ্ঞাপনের। সংবাদ কিংবা ছায়াছবির মাঝখানে আধ ঘণ্টার বিজ্ঞাপন বিরতি। পছন্দের ছায়াছবির মাঝে দীর্ঘ বিজ্ঞাপন বিরতি বিরক্তিকর হলেও, সেই সব বিজ্ঞাপনের ‘জিঙ্গল’গুলি কিন্তু বেশ আকর্ষণীয় ছিল। ‘পানমশালা পানপরাগ’, নির্মা সাবানের ‘রঙ্গীন কপড়া ভি খিলি খিলি যায়ে’, ‘স্বাদ-সুগন্ধ কা রাজা বাদশা মশালা’র বিজ্ঞাপন-এর ‘জিঙ্গল’-এর কথা আজও ভোলেননি দর্শক।

আরও পড়া রবিবারের পড়া / প্রাচীন ভারতে গণিতচর্চা

এই প্রসঙ্গেই আরও একটি আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপনের কথা না বললেই নয়! তা হল লিজ্জত পাঁপড়। আকর্ষণ ছিল তার প্রেজেন্টেশনে। তখনও থ্রিডি-অ্যানিমেশনের জমানা আসেনি। বাচ্চাদের হাতে হাতে টেডিও ঘুরত না। কিন্তু সে যুগে বাচ্চাদের মুখে মুখে ফিরত লিজ্জত পাপড়ের ‘জিঙ্গল’ – ‘চায়ে কফি কে সঙ্গ ভাই/মেহমান কো খুশ কর যায়ে/যব জি চাহে শখ সে খায়ে/কুররম কুররম কররম কুররম/স্বাদ সোয়াদ মে মজেদার লিজ্জতদার/লিজ্জত পাপড়’। বাচ্চা-বড়ো সবারই বেশ পছন্দের ছিল লিজ্জত পাঁপড়ে কামড় দেওয়া ‘খরগোশ’-টি। আরও ক’বছর পর শ্বেতা তিওয়ারির মুখে ‘স্বাদি উৎসব ইয়া তেওহার/লিজ্জত পাঁপড় হো হরবার/মজেদার লিজ্জতদার/লিজ্জত পাঁপড়’-এর জিঙ্গল এখনও মনে রেখেছেন সে যুগের দর্শকবৃন্দ। দেশে যখন আর্থিক উদারীকরণ চলছে, সস্তার লিজ্জত পাঁপড় তখন পৌঁছে যাচ্ছে ঘরে ঘরে। ধীরে ধীরে লিজ্জত পাঁপড় পরিণত হল এক ‘ব্র্যান্ড’-এ।

মাত্র ৮০ টাকায় শুরু হয়েছিল এর পথচলা। ধীরে ধীরে যা পরিণত হয়েছে ৮০০ কোটি টাকার সাম্রাজ্যে। কিন্তু কী ভাবে সম্ভব হল তা?

লিজ্জত পাঁপড়ের জন্ম মুম্বইতে, সাত জন গুজরাতি মহিলার হাত ধরে। গুজরাতি ভাষায় ‘লিজ্জত’ কথার অর্থ হল স্বাদ।

১৯৫০ সাল নাগাদ মুম্বইয়ের গিরগাঁও এলাকার সাত জন গুজরাতি মহিলা স্বপ্ন দেখেছিলেন জীবনে কিছু করার। জসবন্তীবেন, যমুনাদাস পোপট, পার্বতীবেন রামদাস থোড়ানি, উজাম্বেন নারাণদাস কুণ্ডালিয়া, বানুবেন এন তান্না, লাগুবেন অমৃতলার গোকানি, জয়াবেন ভি ভিঠালানি প্রমুখ মিলে শুরু করলেন পাঁপড় বানানোর কাজ।

কিন্তু হঠাৎ পাঁপড় কেন? কারণ, অশিক্ষিত সাত জন মহিলা পাঁপড় বানানোর কাজেই সব থেকে বেশি দক্ষ ছিলেন। দক্ষতা থেকেই এল আত্মবিশ্বাস। পাঁপড় বানানোর কাজকেই পাথেয় করে ঘুরে দাঁড়ানোর কথা ভাবলেন তাঁরা। কিন্তু পুঁজি কোথায়? ব্যবসার জন্য টাকা কে দেবে? অবশেষে তাঁরা সাহায্যের জন্য দ্বারস্থ হলেন সমাজকর্মী ছগনলাল কমরসী পারেখের। ধার নিলেন ৮০ টাকা। ওই সামান্য টাকাতেই নিজেদের পায়ে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখলেন তাঁরা।

আরও পড়ুন রবিবারের পড়া : করমপুজোয় রয়েছে ধর্মে ও কর্মে মহান হওয়ার আদি নির্যাস

১৯৫৯-এর ১৫ মার্চ নিজেদের বাড়ির ছাদে জড়ো হয়ে মাত্র চার প্যাকেট পাঁপড় বানালেন। যথাযথ কোনো নাম ছাড়াই মুম্বইয়ের বিখ্যাত ভুলেশ্বর মার্কেটে বিকিয়ে গেল চার-চারটি প্যাকেটই। সেই থেকেই মুম্বইয়ের ভুলেশ্বর মার্কেটে জায়গা করে নিল তাঁদের বানানো পাপড়। সেই সময় দু’ রকমের পাঁপড় তৈরি করতেন এই মহিলারা। একটি সস্তা, আরেকটি দামি। কিন্তু শুভাকাঙ্খী ছগনলাল পারেখ ওরফে ছগনবাপা ওই মহিলাদের পরামর্শ দিলেন দামের জন্য ‘কোয়ালিটি’-র সঙ্গে সমঝোতা না করতে।ছগনবাপার পরামর্শ মেনে শুধু গুণগত মানের ওপরেই জোর দিতে লাগলেন তাঁরা, সস্তা দামের দিকে নয়! চাহিদা বাড়তে লাগল ক্রমেই। এখন আর সাত জনে মিলে কাজ চালালে হবে না। বাড়তে থাকা চাহিদার সঙ্গে তাল মেলাতে গেলে অনবরত জোগানের দরকার, না হলে বাজারে টিকে থাকা যাবে না।

সমবায় ব্যবস্থার মাধ্যমেই বাড়তে লাগল ব্যবসা। তিন মাসের মধ্যেই কারখানায় নিযুক্ত হলেন ২৫ জন মহিলা। গোড়ার দিকে কারখানায় যোগ দেওয়ার বয়সসীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছিল ১৮ বছরে। প্রথম বছর আয় হল মাত্র ছ’হাজার একশো ছিয়ানব্বই টাকা। পাঁপড়ের প্রচার বাড়তে লাগল। বিভিন্ন সংবাদপত্রে মহিলাদের এই অভিনব উদ্যোগের কথা লেখালেখি হতে লাগল। এ ছাড়াও প্রচারের অভিনব উপায় বার করলেন তাঁরা। ভেঙে যাওয়া পাঁপড়, যা বাজারে চলবে না, সেগুলি তাঁরা প্রতিবেশীদের মধ্যে বিলিয়ে দিতে লাগলেন। ধীরে ধীরে দেশের প্রত্যেকটি বাজারে জায়গা করে নিল এই পাঁপড়।

packet of lijjat papad
লিজ্জত পাঁপড়ের প্যাকেট। ছবি সৌজন্যে জনসত্তা।

কিন্তু প্রথম বছরে অনেক অসুবিধার সম্মুখীন হতে হল তাঁদের। বর্ষায় পাঁপড় শুকোতে অসুবিধা। তাই বর্ষার চার মাস পাঁপড় উৎপাদন বন্ধ রাখতে হল। কিন্তু দ্বিতীয় বছরে তাঁরা একটি খাটিয়া এবং একটি স্টোভ কিনে এই সমস্যার সমাধান করলেন। ফলে তুমুল বৃষ্টিতেও পাঁপড় শুকোতে অসুবিধে হল না। বৃষ্টিতে খাটিয়ার নীচে স্টোভ জ্বালিয়ে চলল পাঁপড় শুকোনোর কাজ। দ্বিতীয় বছর কারখানায় নিয়োগ করা হল ১০০ জন মহিলাকে। তৃতীয় বছরেই এর জনপ্রিয়তা এতটাই বেড়ে গেল যে চাহিদা মেটাতে কারখানায় নিযুক্ত হলেন ৩০০ জন মহিলা। এমন অবস্থা হল যে উদ্যোগকারিণী সাত জন মহিলার ছাদে আর পাঁপড় শুকোনোর জায়গা রইল না। অবশেষে কর্মচারীদের পাঁপড় তৈরির উপকরণ নিজেদের বাড়িতে নিয়ে যেতে বলা হত। আর ওজন করে প্যাকেটে ভরার জন্য মালকিনদের বাড়িতে শুকনো পাঁপড় নিয়ে আসা হত।

১৯৬২-তে পাঁপড়ের নাম হল ‘লিজ্জত পাঁপড়’।

আরও পড়ুন রবিবারের পড়া ২ : জঙ্গলমহলের ‘বাঘুৎ’-কে ঘিরে হাজারো লোক-বিশ্বাস

‘লিজ্জত’ নামকরণের ইতিহাসটিও বেশ চমৎকর! পাঁপড়ের উপযুক্ত নাম খোঁজার জন্য প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়, যার পুরস্কারমূল্য ছিল মাত্র ৫ টাকা। প্রতিযোগী ধীরজাবেন রূপারেল-এর বেছে দেওয়া ‘লিজ্জত’ নামটিই পছন্দ হয় উদ্যোগকারিণী মহিলাদের। সংস্থার নাম হল ‘শ্রী মহিলা গৃহ উদ্যোগ লিজ্জত পাঁপড়’। ১৯৬২-৬৩ সালের মধ্যেই এই সংস্থা প্রায় এক লক্ষ ৮২ হাজার টাকা আয় করে। ১৯৬৬-র জুলাই মাসে সোসাইটি রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্ট ১৮৬০ অনুযায়ী লিজ্জত সমবায় হিসেবে নিজেদের নথিভুক্ত করে। ওই মাসেই খাদি উন্নয়ন এবং গ্রামীণ শিল্পোদ্যোগ কমিশনের চেয়ারম্যান ইউ এন ধেবর ব্যক্তিগত ভাবে লিজ্জত-এর কারখানা পরিদর্শন করেন। ১৯৬৬-র সেপ্টেম্বর নাগাদ খাদি উন্নয়ন এবং গ্রামীণ শিল্পোদ্যোগ কমিশন খাদি এবং গ্রামীণ শিল্প আইন অনুযায়ী লিজ্জতকে ডাল-জাত উপকরণ তৈরির শিল্পসংস্থা হিসেবে মান্যতা দেয়। পাশাপাশি গ্রামীণ কুটির শিল্পেরও মর্যাদা পায় লিজ্জত সমবায়। সেই সঙ্গেই কমিশন ৮ লক্ষ টাকা মঞ্জুর করে লিজ্জতের উন্নয়নে। আয়করও মাফ করা হয়। ১৯৮৭ সাল নাগাদ মুম্বইয়ের বান্দ্রা এলাকায় কমল অ্যাপার্টমেন্টস-এ জায়গা নেয় লিজ্জত। ১৯৮৮ সালে সেখানেই নতুন দফতর স্থানান্তরিত হয়। ১৯৮৮-তে লিজ্জত পাঁপড়ের ব্যবসা ছাড়াও সাবানের ব্যবসা শুরু করে। সাসা ডিটারজেন্ট এবং সাবান লিজ্জতেরই প্রোডাক্ট, যার বার্ষিক আয় ৫০ কোটি। বিদেশেও লিজ্জতের ব্যবসা প্রসারিত হয়। ব্রিটেন, আমেরিকা, সিঙ্গাপুর, নেদারল্যান্ডস, থাইল্যান্ড-সহ অন্যান্য দেশেও লিজ্জত পাঁপড় জায়গা করে নেয়। ১৯৯৮-৯৯ এবং ২০০০-০১ সাল এবং ২০০৩ সালে মোট তিন বার সেরা গ্রামোদ্যোগ সংস্থা হিসেবে পুরস্কৃত হয় লিজ্জত। ২০০২ সালে সংস্থার বার্ষিক আয় ছিল ৩০০ কোটি। শেষ পাওয়া হিসেব অনুযায়ী সংস্থার বার্ষিক টার্নওভার ৮০০ কোটি।

বর্তমানে পাঁপড় ছাড়াও মশলা, ময়দা ছাড়াও বিভিন্ন বেকারি প্রোডাক্ট বিক্রি করে এই সংস্থা। ইয়াহু-র এক সমীক্ষা জানাচ্ছে, ২০১৫ সাল পর্যন্ত লিজ্জত পাঁপড় প্রায় ৪৩ হাজার মহিলাকে স্বনির্ভর করে তুলেছে। গোটা ভারতে এর ৮১টি শাখা এবং ২৭টি বিভাগ রয়েছে। ২০০৯ সালের ১৫ মার্চ সংস্থার ৫০ বর্ষপূর্তি অনুষ্ঠান পালন করে লিজ্জত।

মাত্র ৮০ টাকা থেকে ৮০০ কোটির এই যাত্রাপথ সব সময় মসৃণ ছিল না, তা বলাই বাহুল্য। কিন্তু আত্মবিশ্বাস আর পরিশ্রম, সেই সঙ্গে সঠিক ভাবনা যে সৎ প্রচেষ্টাকে সাফল্যমণ্ডিত করবেই, লিজ্জত-এর গড়ে ওঠার কাহিনি, সেই কথাকেই মান্যতা দেয়।