murshidabad silk
মুর্শিদাবাদ সিল্ক। ছবি সৌজন্যে এক্সপোর্টারস ইন্ডিয়া।
jahir raihan
জাহির রায়হান

ময়ূরকণ্ঠী নীল জমিন আর তার সোনালি পাড়। কিংবা রানি রঙের ঢালে নিপুণ কালোর ছোঁয়া। আর তার আঁচল বেয়ে নেমে এসেছে রঙিন ঝুমকো, অথবা নির্ঝরা লতাপাতার আলংকারিক রূপটান। কটনের মাঝেই রেশমি সুতোর স্বভাবসিদ্ধ নিবিড় বুনন। কোনোটায় আবার রেশম সুতোর ভিড়ে সোনালি জরির ফুল-পাখি। আঁচল বেয়ে ঢালাও স্বর্ণালি জরির কারুকাজ। কিংবা অফ হোয়াইট শাড়িতে লাল-নীল-হলুদের বুটি-বাহার আর আঁচলের ধার বরাবর লতিয়ে উঠেছে হরেক ফুলের নকশা। এ সবই চিরন্তন মুর্শিদাবাদ সিল্ক সম্পর্কিত বর্ণনা যে সিল্ক ‘বুনোটের রানি’ বা ‘রানির বুনোট’ নামে খ্যাত, জগদ্বিখ্যাত।

মুর্শিদাবাদ সিল্কের খ্যাতি ভুবনময়, জগৎজোড়া। প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে চিনে প্রথম রেশম আবিষ্কৃত হয়। আবিষ্কারের পর দীর্ঘদিন চিন সন্তর্পণে রেশমচাষ ও উৎপাদনে গোপনীয়তা বজায় রাখে। পরবর্তী কালে সিল্ক রোড-এর মাধ্যমে চিনের বেজিং থেকে ভূমধ্যসাগরের উপকূল বেয়ে প্রথমে গ্রিস ও পরে রোমান সাম্রাজ্যে রেশম ব্যবসা প্রসার লাভ করে। তারও পরে দক্ষিণে ইয়েমেন, বর্মা ও ভারতবর্ষে সম্প্রসারিত হয় সিল্ক রুট। উপমহাদেশে প্রথম তিব্বত থেকে ভারতবর্ষের হিমালয়ের পাদদেশে রেশম চাষের বিস্তার ঘটে।

আরও পড়ুন রবিবারের পড়া: কোথায় হারিয়ে গেল পুজোর গান / ১

মুর্শিদকুলি খাঁয়ের হাত ধরে ঢাকা থেকে মুর্শিদাবাদে প্রবেশ করে বালুচরী। সে সময় রংবেরং সুতোর বুনানিতে বালুচরীর মসৃণ আঁচলে ফুটিয়ে তোলা হত নবাবি জীবনযাত্রা। অচিরেই এই শিল্প দিল্লির মোঘল শাসকদের হৃদয় হরণ করে। ষোড়শ ও সপ্তদশ শতাব্দীতে মোঘল সম্রাটদের সর্বাঙ্গীন পৃষ্ঠপোষকতায় তৎকালীন অবিভক্ত বাংলায় রেশমশিল্প ব্যাপকতায় উন্নীত হয়। অধুনা বাংলাদেশের রাজশাহী জেলা ও ভারতের মালদা ও মুর্শিদাবাদ বেঙ্গল সিল্কের প্রধান উৎপাদনস্থল হিসেবে হয় পরিগণিত।  রাজশাহী ও মালদা, সিল্ক ইতিহাসের সেই নজিরই বহন করে এখনও। রাজশাহীর রেশম ও রেশম শাড়ি তৈরির কারখানা ইতিহাসের সিল্ক যুগের কথা মনে করিয়ে দেয়। বেঙ্গল সিল্ক বলতে মূলত রাজশাহী, মালদা ও মুর্শিদাবাদের সিল্ককেই বোঝানো হত সে কালে।

কথিত আছে, রেশমচাষের পদ্ধতি, সিল্কের কার্যক্রম ও ব্যবসায় হাতে-কলমে অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য টিপু সুলতান সুদূর মহীশুর থেকে শিক্ষানবিশ হিসেবে স্থানীয় তাঁতিদের পাঠিয়েছিলেন অবিভক্ত বাংলায়। বেঙ্গল সিল্কের টানে ভারতবর্ষের অন্য রাজা-মহারাজারাও বাংলায় পাইক-পেয়াদা-পণ্ডিত পাঠিয়ে রেশমচাষে দীক্ষা নিতেন। পরবর্তী সময়ে অনুকূল আবহাওয়ার কারণে সারা দক্ষিণ ভারত জুড়ে রেশমচাষ প্রসার লাভ করে এবং এই শিল্পের ব্যাপক উন্নতিসাধন হয়। বাংলা থেকেই উত্তর ও দক্ষিণ ভারতে গুটিপোকা তার জাল বিস্তার করে, রেশমচাষ বিস্তৃত হয় আসমুদ্র হিমাচল।

বলা যায়, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারতে আসে রেশমের টানে। রেশম-বাণিজ্যে দখলদারি থেকেই পরে তারা ঔপনিবেশিক দখলদারি কায়েম করে। যদিও বাংলায় রেশমের ইতিহাস আরও দীর্ঘ। ১৬৬০-এর দশকে মুর্শিদাবাদ একটি পরগনা সদর দফতর হিসেবে গণ্য হয়। এ সময়েই মুর্শিদাবাদের কাশিমবাজারে ইউরোপীয়রা কুঠি স্থাপন করে। কেননা সে সময় ইউরোপের বাজারে বেঙ্গল সিল্কের চাহিদা ছিল দুর্নিবার এবং এ অঞ্চল থেকে তখন প্রচুর পরিমাণে রেশম ও রেশমজাত দ্রব্য ইউরোপের বিভিন্ন দেশ নিয়মিত রফতানি হত। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ব্রিটেনে প্রচুর পরিমাণ বেঙ্গল সিল্ক রফতানি করে সপ্তদশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে।

silk worm
গুটিপোকা। ছবি সৌজন্যে উইকিপিডিয়া।

রেশম কাপড়ের সোনালি দিন আজ আর নেই সত্যি। নেই মসলিন, জামদানি, বালুচরী বা বুটিদারের রমরমা। কালের কঠোর নিয়মে হারিয়ে গিয়েছে বাংলার নবাব, দিল্লির সম্রাট, ইংরেজ বণিক অথবা কাশিমবাজার কুঠি। কিন্তু চারশো বছরে সব কিছুই কি একেবারেই হয়েছে বিলীন? হয়তো বা না। তাই মুর্শিদাবাদের গ্রামে গ্রামে আজও চাষ হয় তুঁত গাছ, চাষ হয় রেশমগুটি। খোসবাগ থেকে রোশনিবাগ যাওয়ার পথে এ রকম অনেক তুঁতখেত এখনও চোখে পড়ে। সচরাচর তুতঁগাছের সঙ্গে আমাদের পরিচয় নেই। তাই রাস্তার দু’ ধারে তুঁতগাছ দৃষ্টি আকর্ষণ করে স্বাভাবিক কৌতূহলে। খবর নিয়ে জানা যায়, কেজি প্রতি ৩১০-৪০০ টাকা দরে বিক্রি হয় তুঁতপাতা। খরচ বাদে লাভ মন্দ নয়। ব্যবসায়ীদের কাছে সরাসরি বিক্রি করার সুবিধা আছে বলে দামও ভালো। জেলা মুর্শিদাবাদে এ রকম ছোটোবড়ো বেশ কিছু তুঁতক্ষেত্র রয়েছে এখনও।

জিয়াগঞ্জ মুর্শিদাবাদ জেলার আরেকটি শহর। শহর জিয়াগঞ্জ পার হয়ে একটু এগোলেই রয়েছে তাঁতিপাড়া। এখানে তৈরি হয় সিল্কের শাড়ি। লোকে একে সিল্ক সিটিও বলে। নামে যদিও তাঁতিপাড়া, কিন্তু এখানে তাঁতি পরিবার রয়েছে হাতে গোনা, মাত্র খান ছয়েক। কারখানার মালিকরাই এগুলো পরিচালনা করেন। মালিক-পরিবারের সদস্যরাই এখানে সর্বক্ষণের কর্মচারী। আলাদা করে কর্মচারী নিয়োগে লাভ থাকে না। ব্যবসায়ীদের জন্য সরকারি কোনো সহায়তা নেই, তাই হতাশা সর্বত্রই। সরকার খাদির জন্য অনুদান দেয়, সিল্কের জন্য না। শাড়ি ভেদে আটশো টাকা থেকে বারোশো টাকা পর্যন্ত কারখানা মালিকরা মজুরি পান। অনেক সময় মহাজন সুতো দেয়, সে ক্ষেত্রে হেরফের হয় মজুরি। তখন লাভ হয় ন্যূনতম। ‘তবুও বাপ-দাদার পেশা’ প্রাণে ধরে ছাড়তে পারে না তারা। তাঁতিপাড়ার সবারই প্রায় একই কথা। তাদের মতে, বড়ো জোর আর বছর দশেক, তার পরই হয়ত শেষ হয়ে যাবে মুর্শিদাবাদ সিল্কের বর্তমান অধ্যায়। রেশমশিল্পের আদানপ্রদানের কল্যাণে এ পাড়ার অধিকাংশেরই কোনো না কোনো যোগসূত্র রয়েছে বাংলাদেশের সঙ্গে। কারো বাপ-ঠাকুরদাদার ভিটেমাটি বাংলাদেশে, কেউ হয়তো শৈশবে এসেছেন। তার পর কেটে গিয়েছে বহু যুগ, কালের নিয়মে জীবনযাত্রার বাধ্যবাধকতায় তাঁরাও থিতু হয়েছেন এখানেই।

আরও পড়ুন রবিবারের পড়া: কোথায় হারিয়ে গেল পুজোর গান/শেষ পর্ব

বর্ধিষ্ণু গ্রাম মির্জাপুরে সহস্রাধিক পরিবারের বাস। এখানকার সংখ্যাগরিষ্ঠ বাসিন্দারই এক সময় প্রধান জীবিকা ছিল তাঁত বোনা। শ’ছয়েক তাঁত ছিল গ্রামে। এখন যা প্রায় অর্ধেক। কেননা মির্জাপুরে যে গুণমানের গরদ সিল্ক তৈরি হয় সেই তুলনায় তার বাজার ও প্রচার প্রায় নেই বললেই চলে। অথচ বাণিজ্য বাড়াতে এ যুগে প্রচারটাই সর্বাপেক্ষা জরুরি বিষয়। সেটারই বিশেষ অভাব মির্জাপুরের। ডিজিটাল বিপ্লবের যুগে যেখানে অনলাইন শপিং ক্রমবর্ধায়মান তখন মির্জাপুর পড়ে আছে জেলার মধ্যেই সেই তিমিরেই। এ কথা জোর দিয়ে বলা যায়, সঠিক প্রচার কৌশল ও যথাযথ বিপণনব্যবস্থা গড়ে উঠলে মুর্শিদাবাদ সিল্ক আবার তার হৃতগৌরব ফিরে পাবে।

মির্জাপুর মূলত গরদ-সিল্কের জন্য খ্যাত। আগে গরদের শাড়ি দখল করত সীতাহরণ, জটায়ু বধ বা শকুন্তলা। এখন পুরাণ সরিয়ে ছোঁয়াচ লেগেছে আধুনিকতার। সাদা সিল্কের সুতোকে বিভিন্ন রঙে রাঙিয়ে, তা দিয়েই তৈরি হচ্ছে রঙিন জাকার্ড শাড়ি। কোনোটা সিঙ্গল জাকার্ড তো কোনোটা ডাবল। তার সঙ্গে এখন যুক্ত হয়েছে থার্ড জাকার্ডের তাঁতের ছোঁয়া। মির্জাপুরে সিল্কের কদর বাড়িয়ে শাড়ির বাজারের অনেকটাই দখল করে নিয়েছে জাকার্ড ব্রোকেট অলমিনার। সঙ্গে রয়েছে স্বর্ণচরী ব্রোকেট, স্বর্ণচরী ঘিচা, স্বর্ণচরী স্ট্রাইপ, স্বর্ণচরী ট্রাডিশনাল কিংবা স্বর্ণচরী সিল্কের উপর জাকার্ড মেসিনের ব্রোকেটের কাজ। তাতে আবার জরির নকশা করা। আগে এ কাজ বাইরে থেকে করিয়ে আনতে হত। এখন জাকার্ড মেশিনের সাহায্যে প্রায় সবটাই তৈরি হচ্ছে এই অঞ্চলেই। মূল্য পাঁচ হাজার থেকে আট হাজার টাকার মধ্যে। দামটা একটু বেশি বলে কিছুটা দ্বিধান্বিত ছিলেন মির্জাপুরের রেশম ব্যবসায়ীরা। কিন্তু দুশ্চিন্তা দূর করে বাজারে রমরমিয়ে বিকোচ্ছে সিল্কের উপর সোনালি জরির নকশা।

murshidabad silk
মুর্শিদাবাদ সিল্ক। ছবি সৌজন্যে উৎসবপিডিয়া।

আধুনিক তাঁতশিল্পীদের মতে, গুণমানসম্পন্ন উৎকৃষ্ট মানের শাড়িতে হাতের কাজ যতটা ভালো ভাবে ফুটিয়ে তোলা যায়, অপেক্ষাকৃত কমদামি শাড়িতে সেটা সম্ভব হয় না। কোরিয়ালের সাদা শরীরের দুই দিকে ৫ থেকে ৭ ইঞ্চির পাড়। বুনতে লাগে দিন সাতেক মতো। রঙিন জাকার্ডেও দিন আষ্টেক সময় প্রয়োজন। ফলে দামটা কিঞ্চিৎ বেশি পড়ে সর্বদা। তবে আশার কথা মানুষ এখন আর সস্তার শাড়ি চাইছেন না। আবার এরই মধ্যে অনেকের আক্ষেপ, বর্তমানের ই-যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে অন-লাইন বিপণনে সড়গড় হতে পারলে জেলা ছাড়িয়ে দেশ বিদেশের বাজারেও সমানে টেক্কা দিত মুর্শিদাবাদি সিল্ক, অতীতের মতোই।

এক সময় মুর্শিদাবাদ খ্যাতি লাভ করেছিল পূর্ব ভারতের ‘সিল্ক মক্কা’ হিসেবে। মুর্শিদাবাদ সিল্কের কদর ছিল দেশ-বিদেশে। এখনও ভিন্ন দেশীয় মানুষের মধ্যে সিল্কের সেই চাহিদা রয়েছে, রয়েছে ভালোবাসাও। কিন্তু উৎপাদন কমে যাওয়ায় বাজারে সে ভাবে মেলে না উঁচু দরের মুর্শিদাবাদ সিল্ক। সিল্কশিল্পে জড়িত কারিগরদের আক্ষেপ, প্রশাসনিক উদাসীনতার কারণে আজ মুর্শিদাবাদ সিল্কের এই দৈন্যদশা। কারিগরদের জন্যও যেমন কিছু ভাবা হয়নি, তেমনই বাজার ধরে রাখতেও চোখে পড়েনি সরকারি উদ্যোগ। যে সিল্কের খ্যাতি বিশ্বজনীন সেই সিল্কেরই কারিগরেরা এখন অস্তিত্বের সংকটে। অনিশ্চিত এই পেশা থেকে মুখ ফেরাতে শুরু করেছেন বহু শিল্পী। কেউ কেউ অন্য পেশার সঙ্গে এখনও ধরে রেখেছেন এই শিল্পকে। কিন্তু, কত দিন এই পেশায় থাকতে পারবেন তা নিয়ে রয়েছে যথেষ্ট সংশয়। তাই প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন অনেকেই, ফলে অবশ্যম্ভাবী সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে ঐতিহ্যবাহী মুর্শিদাবাদ সিল্ক আজ বিপন্ন।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here