v s naipaul
ভি এস নাইপল। ছবি সৌজন্যে দি ইন্ডিপেনডেন্ট
tapan-mallick-chowdhury
তপন মল্লিক চৌধুরী

ভি এস নাইপল মানে আফ্রিকা-বিদ্বেষ, ইসলাম বিরোধী মন্তব্য, ঔপনিবেশিক মানসিকতার শিকার বলে ভারতীয়দের তিরস্কার, তথাকথিত তৃতীয় বিশ্বের বুদ্ধিজীবীদের হেয় করা, বাঙালিকে অহংসর্বস্ব বলে ঠাট্টা করা, মহিলাদের অবজ্ঞা করা, সমসাময়িক লেখকদের সম্পর্কে বিতর্কিত মন্তব্য ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু কেন তিনি এমনটা করতেন, কেন তৃতীয় বিশ্বের সমালোচনায় এতটা উচ্চকণ্ঠ ছিলেন তিনি? সে কি তাঁর পারিবারিক পটভূমির জন্য? হতে পারে, আবার এ-ও হতে পারে, সব লেখকেরই তো সব কিছুকে দেখার একটা দৃষ্টিভঙ্গি থাকে, নাইপল সেই দৃষ্টিভঙ্গি দিয়েই কঠোর সমালোচনা করেছেন তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর।

তাঁর জীবনচরিত থেকেই দেখা যেতে পারে। জন্মেছিলেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের ত্রিনিদাদে, হিন্দু একটা পরিবারে। পিতামহ এসেছিলেন ভারতবর্ষ থেকে আখ-চাষের শ্রমিক হিসেবে। বাবা ছিলেন সাংবাদিক ও ছোটো গল্পের লেখক। নাইপল বাবার কাছ থেকেই পেয়েছিলেন কথাসাহিত্য লেখার প্রেরণা। ছেলেবেলার বেশিটাই কাটে পোর্ট অব স্পেনের চাগুয়ানাসে। এর পর কুইন্স রয়্যাল কলেজে পড়াশোনা শেষে পাড়ি জমান অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে, একটা বৃত্তি পেয়ে। অক্সফোর্ডে তাঁর পঠিত বিষয় ছিল ইংরেজি সাহিত্য। গ্র্যাজুয়েট হওয়ার পর ফ্রিল্যান্স লেখক আর বিবিসিতে কাজ। যুক্ত ছিলেন সাহিত্যপত্রিকা নিউ স্টেটসম্যানের সঙ্গেও। বাবার অনুপ্রেরণায় শৈশবের স্মৃতিচারণা দিয়ে শুরু করেন লেখালেখি। নানা ধরনের রচনায় হাত দেন।

আরও পড়ুন রবিবারের পড়া ২ / চিত্রকর বব ডিলান

সমালোচকেরা নাইপলের প্রথম দিকের উপন্যাস সম্পর্কে ইতিবাচক মন্তব্য করেছেন। কিন্তু ক্যারিবিয়া আর উন্নয়নশীল তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো সম্পর্কে যা লিখেছেন, সেগুলো পছন্দ করেননি। নাইপলের প্রথম তিনটি উপন্যাস ‘দ্য মিস্টিক ম্যাসেয়্যুর’ (১৯৫৭), ‘দ্য সাফরেজ অব এলভিরা’ (১৯৫৮) এবং ‘মিগুয়েল স্ট্রিট’ (১৯৫৭)। উপন্যাসগুলির বিষয়আশয় হল ত্রিনিদাদের ইস্ট-ইন্ডিয়ান জনমানুষের অলীক জীবনযাপন। চতুর্থ উপন্যাস ‘আ হাউজ ফর মিস্টার বিসওয়াস’ (১৯৬১) তাঁকে খ্যাতির আলো দেয়। আত্মজৈবনিক উপন্যাস বলা যায়। মিস্টার বিসওয়াস একজন সংবেদনশীল মানুষ। স্থানচ্যুতি, বিশৃঙ্খলা, নৈরাজ্য আর নৈঃসঙ্গ্যের মধ্য দিয়ে জীবন কাটাচ্ছেন। খুঁজে ফিরছেন আত্মপরিচয়। অনেকটা নাইপলের বাবার প্রতিচ্ছবি পাওয়া যায় এই উপন্যাসে। ওই বাড়িটিতে বিভিন্ন আত্মীয়স্বজনের মধ্যে যে উঁচু-নিচু অবস্থান তা ঔপনিবেশিক সম্পর্কেরই ছবি। নাইপলের অধিকাংশ উপন্যাসেরই বিষয় একাকিত্ব, নিঃসঙ্গতা, বিচ্ছিন্নতাবোধ। চরিত্রগুলি সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের টানাপোড়েনে ক্ষতবিক্ষত, রক্তাক্ত। এই দ্বন্দ্ব সাংস্কৃতিক। এই দ্বন্দ্ব দেশীয় মানুষদের, যার অন্তর্গত নাইপল নিজেও, সঙ্গে পশ্চিমী ঔপনিবেশিক শক্তির।

cover of 'a house for Mr. Biswas'
আ হাউজ ফর মিস্টার বিসওয়াস। ছবি সৌজন্যে দ্য স্টার অনলাইন

১৯৬০ আর ১৯৭০-এর দশকে তিনি ভ্রমণে বেরোলেন। ভ্রমণ করলেন উগান্ডা, আর্জেন্তিনা, ইরান, পাকিস্তান, মালয়েশিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্র। এই ভ্রমণ তাঁর লেখালেখিকে গতি দিল। লিখলেন ‘মিস্টার স্টোন অ্যান্ড দ্য নাইট্স্ কমপ্যানিয়ন’ (১৯৬৩)। পটভূমিতে প্রথম দেখা গেল না ত্রিনিদাদ বা ওয়েস্ট ইন্ডিজ।  অথচ প্রবল ভাবে স্থাননির্ভর সংস্কৃতিকেন্দ্রিক উপন্যাস। নাইপলের প্রথম দিককার উপন্যাসগুলোতে যে আবহ আর চিত্রায়ণ এই উপন্যাসটি তা থেকে সরে এসে হয়ে উঠেছে সাংস্কৃতিক আখ্যান। সত্তর দশকের শুরুতে প্রকাশিত হল ছোটোগল্প সংকলন ‘ইন আ ফ্রি স্টেট’ (১৯৭১)। তিনটি গল্প তিনটি দেশের পটভূমিতে লেখা। পেল বুকার প্রাইজ। এ ভাবে নাইপল ছোটো ছোটো উপন্যাস আর ভ্রমণপঞ্জির মধ্য দিয়ে ব্যক্তি আর সর্বজনীন স্বাধীনতাকে উপলব্ধি করতে চেয়েছেন। ক্যারিবিয়ার গণ-উত্থানকে বিষয় করে এর পর লিখলেন ‘আ বেন্ড ইন দ্য রিভার’ (১৯৭৯)। এটিকে জোসেফ কনরাডের ‘হার্ট অব ডার্কনেস’-এর সঙ্গে তুলনা করা হয়। এই উপন্যাসে নাইপল মধ্য-আফ্রিকার সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত দেশগুলোর অবস্থা কেমন চলছে, সেটা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখেছেন। এর পর ‘দ্য এনিগমা অব অ্যারাইভাল’ (১৯৭৯)। শুরু থেকেই নাইপলের ঝোঁক ছিল আত্মজৈবনিক আখ্যানে। এই উপন্যাসও নিজের জীবনের অভিজ্ঞতার কাহিনিরূপ। প্রাধান্য পেল নৃতাত্ত্বিক অনুষঙ্গ। এখনকার সমালোচনার ভাষায় উপন্যাসটাকে ‘ডায়াসপোরিক’ বলেও ভাবা যায়। সমালোচকদের অভিযোগ, তৃতীয় বিশ্বের কঠোর সমালোচনা করেছেন তিনি। এটা ঠিক, তৃতীয় বিশ্ব সম্পর্কে তিনি হতাশ ছিলেন। তাঁর সমালোচনাও ছিল কঠোর এবং নির্মম। বিশেষ করে ভারত সম্পর্কে লেখা ‘অ্যান এরিয়া অব ডার্কনেস’ (১৯৬৪) এবং ‘দি ইন্ডিয়া: আ উন্ডেড সিভিলাইজেশন’ (১৯৭৭)। দু’টিতেই তৃতীয় বিশ্বের যে ছবি এঁকেছেন, তাতে ওই হতাশার কথা বেশ স্পষ্ট। তবে তৃতীয় বার ভারত ভ্রমণ করে যাওয়ার পর ‘ইন্ডিয়া: আ মিলিয়ন মিউটিনিজ নাউ’ (১৯৯০)-তে ছবিটা কিছুটা অন্য। তবে আবার তার কঠোর সমালোচনার মুখে পড়ল তৃতীয় বিশ্বের মুসলিম দেশগুলো ‘অ্যামং দ্য বিলিভার্স: অ্যান ইসলামিক জার্নি’ (১৯৮৯)।

India: A Million Munities now
ইন্ডিয়া: আ মিলিয়ন মিউটিনিজ নাউ

ক্যারিবীয় দ্বীপ ইসাবেলা আর ইংল্যান্ডের পটভূমিতে লেখা ‘দ্য মিমিক মেন’ (১৯৬৭) উপন্যাসটিতে নাইপল ব্যক্তি-কর্তৃত্ব, রাজনীতি, মনস্তত্ত্ব ইত্যাদি প্রসঙ্গে কথা বলেছেন। ‘দ্য লস অব এলডোরাডো’তে (১৯৭০) তুলে ধরলেন ত্রিনিদাদের ঔপনিবেশিক মানুষের মর্মন্তুদ ইতিহাস। এর পর ইংল্যান্ডে ফিরে গিয়ে আরও বই লিখলেন, যেগুলোতে উপন্যাস, ইতিহাস আর ভ্রমণের সীমারেখাগুলো মুছে হয়ে উঠল মিশ্ররীতির আখ্যান। ফিকশন থেকে সরে গিয়ে আরও সহজ ভঙ্গিতে মানুষের জীবনকথা ধরলেন। নাইপল নিজেই এই সহজ মর্মস্পর্শী ভঙ্গির বিশদ ব্যাখ্যা দিয়েছেন ‘রিডিং অ্যান্ড রাইটিং: আ পারসোনাল অ্যাকাউন্ট’ (২০০০)-এ। লিখেছেন, ‘ব্যক্তি-পরিসর ছাড়িয়ে আমার পৃথিবী যত প্রসারিত হয়েছে, আমার ধারণা, আমার জীবন তত সংহত হয়েছে। সাহিত্যের রীতিপ্রকরণের সীমারেখা গিয়েছে ঘুচে। একটা রীতি হয়ে উঠেছে আরেকটা রীতির পরিপূরক। এখন কোন ফর্মের তুলনায় কোন ফর্মটা বড়ো, বলতে পারছি না’। অর্থাৎ  উপন্যাস, গল্প বা অন্য ধরনের রচনার মধ্যে কোনো পার্থক্য করেননি নাইপল, অবশ্য শেষ দিকে। তাঁর ‘আ ওয়ে ইন দ্য ওয়ার্ল্ড’ বইটিতে দেখা যাচ্ছে, বাখতিন যাকে বলেছিলেন ‘বহুস্বর’ অর্থাৎ ইতিহাস, গল্প, স্মৃতি, নানা দলিলপত্র অবিমিশ্র হয়ে গেছে এই লেখায়। ৯টি ভিন্ন ভিন্ন গল্প, কিন্তু এক সূত্রে গাঁথা। তাতে কী স্থান পেল? স্থান পেল ব্যক্তি-ইতিহাস আর সামাজিক-রাজনৈতিক প্রসঙ্গ। সাহিত্যের নানা রীতি, যেমন উপন্যাস, গল্প, ভ্রমণকাহিনি মিলে মিশে একাকার। কিন্তু তাঁর সব লেখার কেন্দ্রে আছে সেই একাকিত্ব, বিচ্ছিন্নতা, অবিশ্বাস আর আত্ম-অবমাননার কথা। জীবনের প্রথম ও মধ্য পর্বে ছিলেন প্রচণ্ড হতাশ, কঠোর সমালোচক; শেষ দিকে এসে হলেন কিছুটা শান্ত, সমাহিত। এই কারণেই হয়তো ২০০১ সালে পেয়ে গেলেন নোবেল পুরস্কার। বলা হল, ‘আধুনিক দর্শনের উদ্ভাস ঘটেছে তাঁর রচনায়। শুরু করেছিলেন ঐতিহ্যের অনুসন্ধান দিয়ে, তার পর পৌঁছেছেন সমাহিত ব্যক্তির ধ্যানে। উপনিবেশের যত ধরনের ইতিহাস আছে, তার সবই তুলে ধরেছেন তাঁর লেখায়।

আরও পড়ুন রবিবারের পড়া : সেই সব লেখক আর সেই সব প্রকাশক

নাইপলের বিশ্ব, তিনি নিজেই বলেছেন, তিন ভাগে বিভক্ত ছিল: ভারত, ত্রিনিদাদ ও পরিবার। যে সবই হল তাঁর নির্বাসন। ঔপনিবেশিক মানুষের স্থানচ্যুতির গল্পই লিখেছেন তিনি। ‘দ্য বেন্ড ইন দ্য রিভার’-এ সেলিম নিজের অবস্থানের কথা বলতে গিয়ে বলে, ‘আমি এমন একজন মানুষ, যে আসলে কোনো দিকেই নেই। উপনিবেশের মধ্যেই আমার থাকা না-থাকা। আমি একটা বিদেশি বিভ্রমের মধ্যে আছি।’ ‘ইন আ ফ্রি স্টেট’-এও এ রকম একটা চরিত্র আছে, যে লন্ডনে এসেও থিতু হতে পারছে না। পরে তার টাকাপয়সা নিঃশেষ হয়ে গেল, শারীরিক শক্তিক্ষয় হলে, সব কিছু হারিয়ে তীব্র ঘৃণার চোখে চার পাশে তাকিয়ে প্রতিশোধস্পৃহায় বলে উঠল, “বলো, কাকে আমি খুন করব?” নাইপলের প্রথম দিকের উপন্যাসে ছিল ত্রিনিদাদে ছড়িয়ে থাকা কৌতুককর অন্ধকার জীবনের কথা। সে সব লেখা ছিল আত্মজৈবনিক। পরে বিশ্বপরিব্রাজক হিসেবে আর ইংল্যান্ডে বসবাসের সূত্রে দেখেছেন সমগ্র বিশ্বকে। ত্রিনিদাদে থাকুন আর ইংল্যান্ডে, ঔপনিবেশিক শক্তিই তাঁর সমগ্র জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করেছে। তিনিও হয়ে উঠেছেন এই উপনিবেশেরই বহুমাত্রিক কথাশিল্পী।

 

1 মন্তব্য

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য দিন !
আপনার নাম লিখুন