relationship, representational image
সম্পর্ক। প্রতীকী ছবি।
jahir raihan
জাহির রায়হান

বীরুণ বর্মনের সাথে দেখা প্রায় দেড় দশক পর। ভোররাত্রের আঁধারে নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনের যান্তব সিঁড়ির পাশে বাইক নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল বীরুণদা। বারণ করেছিলাম, বলেছিলাম ঠিকানা দিয়ে দাও, চলে যাব ঠিক। শোনেনি। ভেবেছিল, আমায় একা পেয়ে কোনো চালাক গাড়িওলা এনজেপি থেকে শিলিগুড়ি যেতেই শ’ তিনেক টাকা ঝেড়ে দেবে নিমেষে। তাই সুখশয্যা ত্যাগ করে ঘুমচোখে বাইক নিয়ে হাজির আমায় তুলে নিতে। মাথায় চুলের কমতি ছাড়া বীরুণ বর্মনের আন্তরিকতার ঘাটতি নেই। আছে আগের মতোই, সরল, সাদাসিধে, আবেগপ্রবণ। একই ছাত্রাবাসে থাকার দরুণ আমাদের হৃদ্যতা। বীরুণদা, জগবন্ধুদা, টুটুলদা, মনসুরদা ভ্রাতৃস্নেহে আগলে রাখত বরাবর। জীবনের চরকি পাকে আজ আমরা ছিটকে গিয়েছি নানা ভাবে, নানা স্থানে। আর খণ্ড- বিখণ্ড ছেঁড়া সুতো জোড়া লাগাতে এবং নতুন সুতোর সুলুকসন্ধানে আমার এ বারের বাড়ি পালানো।

আরও পড়া রবিবারের পড়া : প্রাচীন ভারতে গণিতচর্চা

বেড়াতে বেরোলে আমি কারও বাড়ি ওঠা পছন্দ করি না সচরাচর। কিন্তু এ বারের উদ্দেশ্য ভিন্ন, বেড়ানোর পাশাপাশি পুরোনো সম্পর্কের ঝালাই, ও আপাত অসম্ভব নতুন সম্পর্কের উন্মেষের সান্নিধ্য কল্পনায় আমার এই গৃহস্থ গৃহে যাত্রা, বীরুণ বর্মণ তার প্রথম কুশীলব। বিছানা করাই ছিল, এমনকি টাঙানো ছিল মশারিও। এক কাপ চা পানের পর দেহ রাখলাম সেই পেতে রাখা বিছানায়। ঘুম থেকে উঠে, ক্লান্তি কাটাতে প্রাতঃস্নান। দরজা খুলতেই দেখি কর্তা-গিন্নি মগ্ন চায়ের পেয়ালায়। সুজাতাবৌদির সাথে আমার আলাপ ছিল না, থাকার কথাও ছিল না। কিন্তু সে কথা মনে এল না, অবলীলায় চা চাইলাম, মুড়িও চেয়ে নিলাম। ছাপোষা লোক আমি, বৌদিও দেখলাম সাধারণ, স্বাভাবিক মানুষ, অসাধারণত্বের বহিঃপ্রকাশ শুধু তার আচারে, ব্যবহারে। বাকি থাকল দুই, ছেলে বীরুণদাকে ছাড়িয়ে গিয়েছে, মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী। মেয়ে রাভি পুঁচকি, তার সাথেও ভাব হয়ে গেল। বেলা বাড়তেই বোঝা গেল জড়তা ও সংকোচহীন সম্পর্কের সূতো টানটান হয়ে গিয়েছে আবার, আগের মতোই।

with biruda
বীরুণদার সঙ্গে সেলফি ।

দ্বিতীয় দিন সকালে নানান ভুজুংভাজুং দিয়ে বীরুণদার হাত থেকে ছাড় পাওয়া গেল, কখনও বলে জুতো রেখে যা, কখনও রাভিকে বলে, আঙ্কলকে তোমার জন্য চকোলেট আনতে বলো রাভি! বুঝি, এ সবই আসলে চাপের রাজনীতি, আমাকে আটকে রাখার সুচারু কৌশল। তবুও বেরোলাম, বললাম লাটাগুড়ি যাব, ডাঃ অনুপম ভট্টাচার্যের একটা প্রজেক্টের কাজ চলছে সেখানে, সেটা দেখতে যাব, এবং সেখানেই থাকব আজ রাত্রে, একা একা। যেটা বলিনি তা হল, লাটাগুড়ির কাজ সেরে ফালাকাটা যাব, ফালাকাটা যাব এক অজানা, অপরিচিত সম্পর্কের খোঁজে। শম্পা রাহা আমার লেখার একজন খ্যাপাটে পাঠিকা, আমার লেখায় সে নাকি নিজেকে খুঁজে পায়। ফেসবুকেই আলাপ, তার বহু দিনের ইচ্ছে সপরিবার অন্তত একবার তার আতিথ্য গ্রহণ করি। আমিও মজা লাগাই লাগাতার, পরিবার ছাড়ো, আমায় একা ডাকলে আমি যেতে পারি। নানান দ্বিধা, নানান দ্বন্দ্ব ও নানান সংশয় জয় করে সে নিমন্ত্রণ করে বসে। আমিও ভাবি তাই তো, চেনা নেই জানা নেই এত দূরেও বুঝি কোন সম্পর্ক তার সম্ভবনা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে? যে সময় ঘরে ঘরে অমিল, প্রতিবেশীর সঙ্গে কলহ, রাজনৈতিক দলাদলি, গোষ্ঠীসংঘর্ষ, দেশে দেশে বিবাদ, সে সময় এমন সম্পর্কও দানা বাঁধে? সুতরাং সেই অজানার পথে পাড়ি দিই। মুখোমুখি আলাপ হয় লেখক ও তার পাঠিকার। চা খেতে খেতে চোখ বড়ো বড়ো করে বলে, এই প্রথম আমি কোনো লেখককে সামনা সামনি দেখলাম। বলি, অত বড়ো চোখ কোরো না শম্পা, আমি অত বড়ো লেখক নই, মূলত কেরানি মানসিকতার লোক, যে বাঁধা গতের বাইরে হাঁটতে ভালোবাসে।

with bhaskar
ভাস্করের সঙ্গে সেলফি।

ভাস্কর পাণ্ডে আলিপুরদুয়ারের বাসিন্দা, পেশায় রেলের কর্মচারী, নেশায় ফটোগ্রাফার। আলাপের মাধ্যম একই, ফেসবুক। মাসখানেক আগে হঠাৎ বার্তা পেলাম তাঁর থেকে, আমি বেলডাঙায়। তড়িঘড়ি প্রোফাইল চেক করে নিয়ে ফোন করেছিলাম। বেলডাঙা তাঁর আত্মীয় বাড়ি, তাই এসেছেন। দেখা করে আড্ডা দিয়েছিলেন অনেকক্ষণ। আড্ডা দিতে দিতে এক দারুণ বৈশিষ্ট্যের আভাস পেয়েছিলাম সে দিন, সামাজিক যে কোনো কাজে তিনি সাহায্যের হাত বাড়াতে প্রস্তুত, অন্যরা কী করবে তা নিয়ে তিনি ভাবিত নন। আড্ডা শেষে ওঠার সময় বলে গিয়েছিলেন, উত্তরবঙ্গ গেলে তিনি যেন খবর পান। তাই তাঁকেও খবর দিয়েছিলাম। এবং এখানেও সেই আন্তরিক আমন্ত্রণ। অগত্যা ফালাকাটা থেকে মাদারিহাট হয়ে আলিপুরদুয়ার। ভাস্করের মেয়ে রায়া’র বয়সি, মিষ্টি, ছোট্ট কুঁড়ির মতো। তার সাথে ভাব জমাতে দেরি হয়নি । বাড়িতে রয়েছেন ভাস্করের মা এবং স্ত্রী। ভাস্করের শ্বশুরবাড়ি এবং আমার মামারবাড়ি আবার একই স্থানে, মুর্শিদাবাদের কান্দী শহরে, সেটাও জানা গেল। নানা গল্প ও ভাস্করের সঙ্গদানে আরও একটা দিন কেটে গেল। জয়ন্তীর ‘উত্তরের পাঠশালা’র কচিকাঁচাদের জন্য ভাস্কর অনেক খাতা, পেন, পেনসিল ইত্যাদি কিনে রেখেছিল নিজ উদ্যোগে। দু’জন মিলে বাইক করে সেগুলো দিয়ে এলাম অয়ন ও রাজা নীল দত্তের হাতে।

এর মধ্যে বীরুণদা ফোন করেছে বার দশেক, দাদা সুলভ কন্ঠস্বরে জিজ্ঞেস করেছে, কোথায় আছিস? ঢেকে চেপে উত্তর দিয়েছি ধরাপড়ার ভয়ে। তার পর যখন নিশ্চিত হয়েছে যে এ যাত্রায় তার বাড়ি আর যাচ্ছি না, বলেছে ফেরার পথে এনজেপি আসব আমি, আর হ্যাঁ রাত্রের খাবারটা আমিই দেব। বারণ করলেও শোনেনি। ভাস্কর নিউ আলিপুরদুয়ার স্টেশনে ছেড়ে গিয়েছে, ট্রেন ফালাকাটা ছুঁয়ে নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনে ঢুকছে, তখন বূষ্টি নেমেছে আকাশ ভেঙে। আর সেই বৃষ্টি মাথায় করে নিজ হাতে রান্না করা পোলাও ও পনিরের তরকারি নিয়ে স্টেশনে হাজির হয়েছে মহানন্দা হাইস্কুলের ইংরাজির শিক্ষক, আমার ইউনির সিনিয়র, আমার ছাত্রাবাসের স্নেহপ্রবণ দাদা বীরুণ বর্মন। সম্পর্কের বৃত্ত নিজ হতেই সম্পূর্ণ হয়েছে তার এই বৃষ্টিমুখর আগমনে, বীরুণ বর্মন-শম্পা রাহা-ভাস্কর পাণ্ডের আন্তরিক আপ্যায়নে সাহস সঞ্চারিত হয়েছে হৃদয়ের মণিকোঠায়। মনে পড়ে গিয়েছে অকালে ঝরে ঝাওয়া মনসুরদার লেখা কবিতার শেষ লাইন দু’টি, ‘ভালো থাকা যায় না, ভালো থাকতে হয়’।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here