official teaser of ek je chhilo raja
'এক যে ছিল রাজা'র অফিসিয়াল টিজার। সৌজন্যে রেডিওবাংলানেট।

সাহানা চক্রবর্তী

‘এক যে ছিল রাজা’। আর ছিল এক রানি।

সে সুয়োরানি না কি দুয়োরানি?

সেটাই তো গল্প!

সম্প্রতি একটি ছবি নিয়ে খুব আলোচনা চলছে। তা হল সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের ‘এক যে ছিল রাজা’। বাস্তবিকই, এক ছিল রাজা আর তার ছিল এক রানি। রানির ছিল এক ভাই, আর ছিল এক ধন্যি ডাক্তার, যার নিদেনেই বদলে গেল রাজার ভাগ্যি। রাজা হয়ে গেলেন সর্বহারা ছাই-ভস্ম মাখা এক সাধু!

ছবির মুক্তি পাওয়া ট্রেলারেও দেখা যাচ্ছে গায়ে ছাই-ভস্ম মাখা এক সাধু ঘুরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন এক বিশাল প্রাসাদের চারপাশে, আর তাঁকে ঘিরে বহু উৎসাহী জনতার ভিড়। ইতিমধ্যেই মুক্তি পেয়েছে ছবির আরও একটি ট্রেলার, যাতে দেখা যাচ্ছে একটি আদালতকক্ষে আইনজীবীদের সওয়াল-জবাব চলছে এক সন্ন্যাসীর আসল পরিচয়কে ঘিরে। এক পক্ষ বলছে সন্ন্যাসী জাল, আর অন্য পক্ষ সওয়াল করছে সন্ন্যাসির রাজ-পরিচয়ের স্বপক্ষে।

কিন্তু কে এই সন্ন্যাসী? মুক্তি পাওয়া পোস্টারেই রয়েছে তার ইঙ্গিত, ‘inspired by the bhowal sanyasi court case’। ভারতের ইতিহাসে দীর্ঘতম সময় ধরে চলা একটি মামলা।

আরও পড়ুন রবিবারের পড়া / প্রাচীন ভারতে গণিতচর্চা

বহু দিনের বহু চর্চিত ঘটনা। ১৯৭৫-এ একই ঘটনার ওপর ভিত্তি করে পীযূষ বসুর পরিচালনায় নির্মিত হয়েছে ‘সন্ন্যাসী রাজা’, যার কেন্দ্রীয় চরিত্রে ছিলেন উত্তম কুমার। তবু আরও এক বার এই কাহিনিকে ফিরে দেখার পিছনে কী কারণ থাকতে পারে, যে কারণে একবিংশ শতকের অতি-বাস্তবমুখী পরিচালক আরও একবার অতি-আধুনিক জনতা, বিশেষত তরুণ প্রজন্মকে ১০০ বছর আগের বাংলাদেশের এক ‘অভাগা’ রাজার অতীত দর্শন করাতে চাইছেন? কারণ নিহিত আছে রাজার জীবনকাহিনিতেই। আর সে জন্যই আমাদেরও ফিরে দেখা ১১০ বছর আগে ১৬ বছর ধরে চলা এক মামলার গভীরে।

ঘটনার শুরু ঊনিশ শতকের গোড়ায়। ১৯০৯ সাল, অবিভক্ত বাংলায় তখন ব্রিটিশের রাজত্ব। বাংলাদেশের বর্তমান রাজধানী ঢাকার পূর্ব দিকে বিস্তীর্ণ এলাকা, প্রায় ৫৭৯ বর্গ মাইল এলাকা জুড়ে ভাওয়াল রাজ্য। আর তারই উত্তরে এক ছোট্ট শহর জয়দেবপুর। শহরের এক কোণায় এক বিশাল প্রাসাদ, যা স্থানীয় লোকদের কাছে ‌‘জয়দেবপুর রাজবাড়ি’ নামেই অধিক পরিচিত। রাজবাড়ির তিন কুমার – রণেন্দ্রনারায়ণ, রমেন্দ্রনারায়ণ ও রবীন্দ্রনারায়ণ, তিন জনেই বিবাহিত। কুমারদের তিন বোন ইন্দুময়ী, জ্যোর্তির্ময়ী ও তারিণময়ী বিবাহিতা হলেও ছেলেমেয়ে এবং স্বামী-সহ থাকেন রাজবাড়িতেই।

আরও পড়ুন রবিবারের পড়া: সুবে বাংলার বেড়া উৎসব সম্প্রীতির এক অনন্য নজির

ভাওয়াল রাজ্যের প্রতিপত্তিও কিছু কম নয়। ভাওয়াল রাজারা ছিলেন ‘বারো ভুঁইয়া’দের একজন। প্রথমে এ রাজ্য শাসন করতেন মুসলমান গাজীরা। ১৭৩৮ সালে বলরাম রায় মুসলমান গাজীদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেন জমিদারি। ভাওয়াল রাজ্যের সব থেকে উল্লেখযোগ্য জমিদার হলেন কালীনারায়ণ রায়। জাতিতে ব্রাহ্মণ হলেও, ১৮৭৮ সালে ব্রিটিশদের কাছ থেকে রায় এবং রাজা উপাধি পেয়েছিলেন তিনি। যদিও তাঁদের আসল পদবি ছিল ‘ভাওয়াল’। প্রায় ২০০০টি গ্রাম এই জমিদারির অন্তর্গত। আদায়ীকৃত খাজনার পরিমাণও সেই আমলের তুলনায় বেশ ভালোই, বার্ষিক প্রায় সাড়ে ছ’লক্ষ। সব কিছু চলছিল ভালোই। মেজকুমার রমেন্দ্রনারায়ণই মূলত জমিদারির দেখভাল করেন। প্রজাবৎসল হলেও ছিলেন বিলাসী, গানবাজনা, মদ্যপান আর মেয়েমানুষে আসক্ত। শিকার ছিল তাঁর অন্যতম নেশা। একবার একটি বিশাল রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার শিকার করেছিলেন তিনি। শোনা যায়, মেয়েমানুষে আসক্ত ভাওয়ালের মেজকুমারের একটি হারেমও ছিল। এই কারণেই রাজার সঙ্গে রানি একটু দূরত্ব রেখে চলতেন। রাজার সঙ্গে দূরত্বের কারণেই তাঁর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে পারিবারিক চিকিৎসকের। ঘটনার যাবতীয় প্রেক্ষাপটে রয়েছে এই একটি কারণ, রানির সঙ্গে ডাক্তারের সম্পর্ক। জনশ্রুতি আছে, এক সময় পারিবারিক চিকিৎসকের সঙ্গে সম্পর্কের ফলে রানি বিভাবতী গর্ভবতী হয়ে পড়েন। আর সে জন্যই রাজাকে সরিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন হয় তাঁদের।

ramendranarayan as hunter
বাঘশিকারি রমেন্দ্রনারায়ণ।

ঘটনার তিন বছর আগেই (১৯০৫ নাগাদ) ধরা পড়েছিল সিফিলিস, আবার নতুন করে বাধিয়ে বসলেন আলসার। হাতে-পায়ে ছড়িয়ে পড়ল ক্ষত। আর রাজার শরীর ভালো করতে হাওয়া বদলের নিদেন দিলেন পারিবারিক চিকিৎসক আশুতোষ দাশগুপ্ত। গরমে হাওয়া্ বদলের জন্য পাহাড়ের থেকে আর ভাল জায়গা কী-ই বা হতে পারে? বিশেষত, শ্যালক সত্যেন্দ্রনাথ কিছু দিন আগেই ঘুরে এসেছিলেন দার্জিলিং। তাই হাওয়া বদলের উপযুক্ত জায়গা হিসেবে দার্জিলিংই ঠিক হল।

শ্যালক একটি বাড়িও ঠিক করে ফেললেন, যেখানে রাজা উঠবেন। স্ত্রী বিভাবতী, শ্যালক সত্যেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় আর পারিবারিক চিকিৎসককে নিয়ে মেজকুমার গেলেন দার্জিলিং। রাজা বলে কথা! চাকরবাকরের বহরও তাই বেশ বড়ো, এক্কেবারে ২১ জনের টিম। সব নিয়ে এপ্রিলের গরমে রেলগাড়িতে চড়ে রাজা চললেন পাহাড়ে, শরীর ভালো করতে! দু’ দিন পর পৌঁছোলেন গন্তব্যে। কয়েক দিন বেশ ভালোই কাটল। কিন্তু হঠাৎই রাজার শরীর খারাপ হয়ে গেল! এমন শরীর খারাপ, ঘনিয়ে এল মৃত্যু!

ভাওয়াল রাজ্যে টেলিগ্রামে দুঃসংবাদ এসে পৌঁছোল। তাতে লেখা, ৮ মে রাজার মৃত্যু হয়েছে। আর কারণ হিসেবে বলা হয়, রক্ত আমাশয় এবং বমি শুরু হওয়ায় পরিস্থিতি এতটাই খারাপ হয়ে যায় যে রাজাকে আর বাঁচানো যায়নি। দার্জিলিংএই শেষকৃত্য (?) সম্পন্ন করে অবশেষে তিন দিন পর দার্জিলিং থেকে রানি-সহ গোটা দলই জয়দেবপুরে ফিরে এল। রাজার শ্রাদ্ধানুষ্ঠানও হল যথারীতি ১১ দিন পর, হিন্দুপ্রথা মেনে। কিন্তু বড়োই সাদামাটা ভাবে। ঠিক রাজার মতো করে নয়!

আরও পড়ুন রবিবারের পড়া : করমপুজোয় রয়েছে ধর্মে ও কর্মে মহান হওয়ার আদি নির্যাস

কিছু দিনের মধ্যেই রাজার শরীর খারাপ এবং শেষকৃত্য নিয়ে গুজব ছড়িয়ে পড়ল। যারা সঙ্গে গিয়েছিল, তাদের মধ্যেই একজন ছিলেন শরিফ খান। তিনি ফিরে এসে বললেন, অসুস্থ রাজার বিছানা সরানোর সময় মেজকুমার হঠাৎই বমি করতে শুরু করেন, আর তার কয়েক ফোঁটা শরিফের জামা-কাপড়ে পড়তেই তাতে গর্ত হয়ে যায়। অর্থাৎ কিনা এতটাই বিষাক্ত কিছু নির্গত হয়েছিল কুমারের বমির সঙ্গে। আবার কেউ বলল যে, রাজাকে দাহ করার জন্য শ্মশানে নিয়ে যাওয়া হলেও প্রচণ্ড শিলাবৃষ্টি শুরু হয়ে যাওয়ায় শেষ পর্যন্ত দাহ করা যায়নি। শ্মশানে শবদেহ ফেলে রেখেই যে যার প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে যায়, কিন্তু পরে ফিরে এলেও মৃতদেহ আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। এ রকমই নানা গল্প ছড়িয়ে পড়ল ভাওয়াল রাজ্যে। আর এখান থেকেই রোপিত হল নাটকের বীজ।

ইতিমধ্যেই রানির পক্ষে রাজ্যের কর্তৃত্ব হাতে নিলেন মৃত(?) কুমারের শ্যালক। কিন্তু প্রজাদের মনে মেজকুমারের মৃত্যু নিয়ে সন্দেহটা রয়েই গেল!

রানি আনুষ্ঠানিক ভাবে তাঁর বড়োভাই সত্যেন্দ্রকে নিজের অংশের সম্পত্তি দেখভালের জন্য নিয়োগ করলেন। কয়েক মাসের মধ্যেই তিনি মেজকুমারের অংশীদারিত্বের সম্পত্তির মূল্য জীবনবিমার কাছ থেকে ৩০,০০০ টাকা এবং সেই সঙ্গেই রাজ্যের কাছে মোটা অঙ্কের মাসোহারা দাবি করলেন। অবশেষে মাসিক ১,১০০ টাকা এবং জীবনবিমার অর্থ ছাড়াও ৩৫ হাজার টাকারও বেশি আদায় করে ভাওয়াল রাজ্য ছেড়ে পাকাপাকি ভাবে কলকাতায় চলে এলেন ভাইয়ের বাড়ি। ইতিমধ্যেই ১৯১০ সালে বড়োকুমার রণেন্দ্রনারায়ণের মৃত্যু হয়েছে। এমনকি ১৯১৩ সালে মৃত্যু হল তৃতীয় কুমারেরও। তিন কুমারের কারও কোনো সন্তান ছিল না, যদিও ছোটো রানি বিধবা হওয়ার ছ’ বছর পরে একটি পুত্রসন্তান দত্তক নিয়েছিলেন এবং স্বামীর মৃত্যুর পর তিনিও জয়দেবপুর ছেড়েছিলেন। ১৯১১ সালের কোনো একদিন বিভাবতীর ভাইয়ের কলকাতার ল্যান্সডাউন রোডের বাড়িতে এক চিঠি এসে পৌঁছোল ভাওয়াল রাজ্যের ব্রিটিশ ম্যানেজার এফ ডব্লিউ নিধামের কাছ থেকে। তাতে লেখা, খুব শীঘ্রই কোর্ট অব ওয়ার্ডস বিভাবতীর অংশের সম্পত্তির দখল নিতে চলেছে। ইতিমধ্যেই বড়োকুমার ও ছোটোকুমারের সম্পত্তির দখল নিয়ে নিয়েছে ব্রিটিশ সরকার। সে কালে যে সমস্ত সম্পত্তি দেখভালের কেউ থাকত না, ‘কোর্ট অব ওয়ার্ডস’-এর নামে তার দখল নিত ব্রিটিশ সরকার। এ ভাবেই প্রায় গোটা ভাওয়াল রাজ্য কোর্ট অব ওয়ার্ডস-এর আওতায় চলে আসে।

রাজার শেষকৃত্য নিয়ে সন্দেহ!

এ দিকে মেজকুমারের মৃত্যুর কিছু দিনের মধ্যেই ভাওয়াল রাজ্যে খবর ছড়িয়ে পড়ল যে, একদল সাধুর সঙ্গে ঠিক মেজকুমারের মতো দেখতে এক ‘নাগা সন্ন্যাসী’কে দেখা গিয়েছে। এই খবর ছড়িয়ে পড়তেই রাজার আত্মীয়রা খোঁজ শুরু করলেন। মেজবোন জ্যোতির্ময়ী দেবী বেনারসে গিয়েও খোঁজ করলেন, যদি কেউ এমন কোনো সাধুর খোঁজ দিতে পারে! কিন্তু নাঃ! এমন কোনো সাধুর সন্ধান পাওয়া গেল না। কিন্তু ১৯১৭ সালে জয়দেবপুরে এসে উপস্থিত হলেন এক মৌনীবাবা, যিনি মুখে কোনো কথা না বললেও, একটি কাগজে লিখে দিলেন ভাওয়ালের মেজকুমার জীবিত আছেন। এ ভাবেই কেটে গেল আরও তিনটে বছর। মেজকুমারের কোনো সন্ধান মিলল না। ভাওয়াল রাজবাড়িতে সেই সময় একাই বাস করছিলেন কুমারদের বৃদ্ধা ঠাকুমা রানি সত্যভামা। অবশেষে বর্ধমানের রাজাকে তিনি চিঠি লিখে জানতে চাইলেন, আট বছর আগে দার্জিলিং-এ মেজকুমারকে সত্য সত্যই দাহ করা হয়েছিল কিনা, এ সম্পর্কে তিনি কিছু খবর দিতে পারেন কিনা। কারণ, তিনি জানতে পেরেছেন ওই সময়ে বর্ধমানের মহারাজাও দার্জিলিং-এই ছিলেন। চিঠিতে বৃদ্ধা রানিমা আরও লিখলেন, তিনি জানতে পেরেছেন তাঁর নাতি সাধু-সন্ন্যাসীদের সঙ্গে পূর্ব এবং উত্তরবঙ্গে ঘুরে বেড়াচ্ছে। চিঠির উত্তরে বর্ধমানের রাজা লিখলেন, দার্জিলিং-এ অবস্থানকালে একদিন তিনি শুনেছিলেন, ভাওয়ালের মেজকুমারের মৃত্যু হয়েছে এবং শেষকৃত্যের জন্য প্রয়োজনীয় গঙ্গাজল এবং তুলসীপাতা তিনি তাঁর এক পরিচারককে দিয়ে আসতে বলেছিলেন। এর বেশি কিছু তিনি জানেন না। (চলবে)

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য দিন !
আপনার নাম লিখুন